খুঁটি

বুধবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জসীম আল ফাহিম

সমবয়েসী দুটো চারাগাছের মধ্যে কথা হচ্ছিল। এদের একটি খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা। অন্যটি খুঁটি ছাড়াই দাঁড়ানো। খুঁটিঅলা গাছ বিড়বিড় করে বলল- আমি একদিন অনেক বড় বৃক্ষ হব। সুবিস্তৃত হবে আমার ডালপালা, শাখা-প্রশাখা। বিচিত্র পাখপাখালি উড়ে এসে বসবে আমার ডালে। পাখিরা কিচিরমিচির গান করবে। আর আমি মুগ্ধ হয়ে সেই গান শুনব।

খুঁটিঅলা গাছের কথা শুনে খুঁটিবিহীন গাছ মিটিমিটি হাসল। হেসে হেসেই বলল- তুমি যে অনেক বড় বৃক্ষ হবে কী করে বুঝলে?

খুঁটিঅলা গাছ বলল- কেন! আমার খুঁটিটা দেখতে পাচ্ছ না? খুঁটি যখন আছে, বড় একদিন আমি হবই হব।

ওর এমন কথা শুনে খুঁটিবিহীন গাছ বলল- তোমার আত্মবিশ্বাস দেখে আমি অবাক হচ্ছি। আত্মবিশ্বাস থাকা অবশ্য মন্দ নয়। আত্মবিশ্বাস জীবনে সাফল্য বয়ে আনে।

খুঁটিবিহীন গাছের কথা শুনে খুঁটিঅলা গাছ বলল- তোমাকে অনেক ধন্যবাদ! কারণ তুমি আমার বিষয়টা বুঝতে পেরেছ। আমার আসলেই অনেক আত্মবিশ্বাস।

খুঁটিঅলা গাছের কথা শুনে খুঁটিবিহীন গাছ আবারো মৃদু হাসল। তারপর হাসি থামিয়ে বলল- তোমার খুঁটি আছে বলে যে তোমার আত্মবিশ্বাসও আছে এ কথা কিন্তু ঠিক নয়।

খুঁটিঅলা গাছ বলল- কেন ঠিক নয়? অবশ্যই ঠিক। কারণ খুঁটি আছে বলেই তো আমি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। খুঁটিই আমার ভরসা। আমার শক্তি। আমার জোর। আমার সবকিছু।

খুঁটিঅলা গাছের কথা শুনে খুঁটিবিহীন গাছ মিটিমিটি হেসে বলল- খুঁটিকেই বলছ তোমার সব! কিন্তু খুঁটির জোর তো বেশিদিন টিকে না। খুঁটি না থাকলে তোমার অবস্থা কী হবে একবার ভেবে দেখেছ?

খুঁটিবিহীন গাছের এমন কথা শুনে খুঁটিঅলা গাছের মনটাই খারাপ হয়ে গেল। মন খারাপ হলে আবার তার মাথামুণ্ডু ঠিক থাকে না। তখন সে মুখে যা আসে তা-ই বলে যায়। খুঁটিঅলা গাছ রেগে গিয়ে বলল- কী বুঝো তুমি, হ্যাঁ? ছাই বুঝো। কচু বুঝো। আমার খুঁটি চিরকাল অটুট থাকবে। আর আমিও খুঁটিকে পুঁজি করে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠব। একদিন বিরাট বৃক্ষে পরিণত হব।

খুঁটিবিহীন গাছ এবার কণ্ঠ নামিয়ে বলল- মিছে রাগ করছ কেন ভাই? আমি তো তোমার ভালোর জন্যই কথাগুলো বললাম।

খুঁটিঅলা গাছ বলল- রাগ করব না তো কী করব? আজেবাজে সব কথা বলো তুমি।

খুঁটিবিহীন গাছ বলল- আজেবাজে কথা বলছি না ভাই। কথা আমি ঠিকই বলছি। সময় থাকতে তুমি সাবধান হয়ে যাও। নিজের ক্ষমতা দিয়ে বড় হওয়ার চেষ্টা করো। নইলে শেষে বিপদে পড়বে। অন্যের সাহায্য নিয়ে বড় হওয়া যেমন নিরাপদ নয়, তেমনি সম্মানেরও নয়।

ওর কথা শুনে খুঁটিঅলা গাছ আরো রেগে গেল। রাগত স্বরে বলল- আমাকে তুমি সাবধান করতে এসো না। তোমার সাবধানতা আমার দরকার নেই। নিজের তো খুঁটি নেই। তাই আমারটা দেখে তোমার খুব হিংসে হচ্ছে। আমি তা ভালো করেই বুঝতে পারছি।

খুঁটিঅলা গাছের কথা শুনে খুঁটিবিহীন গাছটি বুঝল; ওকে বোঝানোর চেষ্টা করা বৃথা। পরে সে বলল- আমার খুঁটি নেই এ কথা সত্যি। খুঁটি আমার দরকারও নেই। আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। দেখো, নিজের পায়েই আমি একদিন দাঁড়িয়ে যাব। আমার সম্পর্কে তোমার ধারণা ভুল। কারণ তোমার খুঁটি দেখে হিংসে করে আমি কথাগুলো বলিনি। তবে এ কথা সত্যি যে, খুঁটিঅলাদেরও কেউ কেউ জীবনে সফলতার মুখ দেখে। তারা বড়ই সৌভাগ্যবান। এমন সৌভাগ্য যে তোমারও আছে, নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারবে?

খুঁটিবিহীন গাছের কথা শুনে খুঁটিঅলা গাছ আরো রেগে গেল। বলল- তোমার সঙ্গে আমি আর কোনো কথাই বলব না। আজ থেকে তোমার সঙ্গে আমার আড়ি।

সেই থেকে অনেক দিন যাবৎ গাছ দুটোর মধ্যে কোনো কথাবার্তা নেই। একে অন্যের দিকে ফিরেও তাকায় না। এভাবেই যাচ্ছিল দিন। এরই মধ্যে একদিন ঈশান কোণে মেঘ জমা হলো। ঘন কালো মেঘ। গুড়–ম গুড়–ম বাজ ডাকতে শুরু করল। কালবোশেখি ঝড়ের আভাস বোঝা গেল। কালবোশেখির ঝড়ো হাওয়াও বইতে লাগল। সেই ঝড়ে অনেক সংযম সাধনা করে খুঁটিবিহীন গাছটি কোনোরকম টিকে রইল। কালবোশেখি ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে সে অনেকবার নুয়ে পড়েছে। কিন্তু হার মানেনি। শেষ পর্যন্ত কী করে যেন বেচারা টিকেই গেল।

আর খুঁটিঅলা গাছের খুঁটিটি কালবোশেখি ঝড়ের প্রথম ধাক্কাতেই ধড়াস্ শব্দে ভেঙে পড়ল। ভাঙা খুঁটির কিছু অংশ গাছের সঙ্গে ঝুলে রইল। ফলে যে খুঁটি তাকে বাঁচানোর কথা, সেই খুঁটিই তার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াল।

একদিকে কালবোশেখি ঝড়ের প্রচণ্ড দাপট, অন্যদিকে ভাঙা খুঁটির ভার; দুয়ে মিলে গাছটিকে একেবারে নাজেহাল করে ছাড়ল। এভাবে কিছু সময় সংগ্রাম করার পর সহসা মট্ করে গাছটিই গোড়া থেকে ভেঙে পড়ল। ভেঙে একবারে ভূপতিত হলো। এতদিন সে যে খুঁটিকে নিয়ে খুব গর্ব করত, সেই খুঁটি আজ তাকে প্রাণে বাঁচাতে পারল না।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj