হরিজনদের আবাসন এবং রাষ্ট্রের মানবিক আচরণ

বুধবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান সব মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু দিনাজপুরের হেলা ও বাঁশফোর সমাজসহ দলিত হরিজন জনগোষ্ঠী এ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে অনাদিকাল ধরে। এই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব মালিকানার জায়গা নেই। তারা বসবাস করেন পৌরসভার জায়গা, হাসপাতালের জায়গা, রেলের জায়গাসহ বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জায়গায় অথবা সরকারি জায়গায়। কিন্তু প্রতিনিয়ত তাদের থাকতে হয় হয়রানি ও উচ্ছেদ আশঙ্কায়।

দিনাজপুর শহরের ভেতরে বসবাসরত হরিজনদের বেশিরভাগ থাকেন বালুবাড়ি সুইপার কলোনিতে। জায়গাটি মহারাজা কর্তৃক দিনাজপুর পৌরসভাকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল শুধু সুইপার বা হরিজনদের বসবাসের জন্য। কিন্তু গত দেড়শ বছরে সুইপারদের পরিবার-পরিজন বৃদ্ধির কারণে এবং অনেকের দখলদারিত্বের কারণে ওই জায়গা ক্রমাগতভাবে সংকীর্ণ হয়ে বসবাসের জন্য অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছে ৪-৫ দশক আগেই। এমতাবস্থায় বিগত ৪-৫ দশক ধরেই হরিজনদের কিছু অংশ রেলের জায়গা এবং কিছু অংশ দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতালের জায়গায় থাকেন। কিন্তু দিনাজপুর সদর হাসপাতালের পেছনে হরিজন বাঁশফোর সমাজের প্রায় ৩০টি পরিবারকে এখন উচ্ছেদের নোটিস দেয়া হচ্ছে। ৩০টি পরিবারে প্রায় দেড়শ শিশু, নারী, পুরুষের মধ্যে এখন উচ্ছেদের আশঙ্কায় অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।

রঙলাল বাঁশফোর, পিতা মৃত বাসুদেব বাঁশফোর এই হাসপাতালের ভেতরে বসবাস করছেন দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। হতচকিত হয়েছেন নোটিস পেয়ে। তিনি বলেন, আমাদের পূূর্ব পুরুষদের সময়কাল থেকে আমরা হাসপাতালের পেছনের ঘাগড়া ক্যানেলের কিনার ঘেঁষে বসবাস করছিলাম। তখন হাসপাতালের কোনো বাউন্ডারি ছিল না। স্বাধীনতার অনেক পরে হাসপাতালের বাউন্ডারি দেয়ার সময় আমাদের বলা হলো, আমাদের জায়গাটাও ঘিরে নেবে আর আমাদের বাউন্ডারির ভেতরে থাকতে দেবে। তাতে আমাদেরও সুবিধা হবে, হাসপাতালেরও সুবিধা হবে। তখন সে কথা মেনে নিয়ে আমরা প্রাচীর করতে দিয়েছি। প্রাচীর হওয়ার পর আমরা প্রাচীরের ভেতরে এসেছি। নিজের টাকা খরচ করে ঘরবাড়ি করেছি। তখন হাসপাতালের কর্মকর্তারা আমাদের ভেতরে নিল আর এখন বলছে আমরা অবৈধ। কিন্তু আমরা যাব কোথায়? আমরা তো সারা জীবন এখানেই ছিলাম।

এনএনএমসির নেটওয়ার্কিং ফর ইনক্লুশান এন্ড এমপাওয়ারমেন্ট অব দলিত’স এন্ড নৃ-তাত্তি¡ক ইন দ্য নর্থ-ওয়েস্ট অব বাংলাদেশ প্রকল্পের দিনাজপুর জেলা এডভোকেসি প্লাটফর্ম হরিজনদের সমস্যাগুলো শোনার পর জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সঙ্গে তাদের নিয়ে বসেন এবং উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে একটি স্মারকলিপি দেন। হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি আপাতত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গৃহীত উদ্যোগ স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আপাতত উচ্ছেদ প্রক্রিয়া স্থগিত থাকলেও ভবিষ্যতে বিষয়টি কোন প্রক্রিয়ায় যাবে তা নিয়ে সংশয় ও উৎকণ্ঠা রয়েই গেছে। এর ফলে হরিজনদের স্থায়ী আবাস নির্মাণ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের আইন ও সংবিধান অনুযায়ী হরিজনদের নিজস্ব ও স্থায়ী বাড়িঘর পাওয়ার অধিকার আছে। বাংলাদেশ হরিজন সম্প্রদায়ের মৌলিক দাবি-দাওয়া প্রসঙ্গে প্রদত্ত স্মারকলিপির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মে প্রধানমন্ত্রী সব সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ঝাড়–দার, ক্লিনার, সুইপার পদে ৮০ ভাগ নিয়োগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও শিক্ষিত দলিত-হরিজনের চাকরির ক্ষেত্রে যথাযথ কোটা নিশ্চিত করা এবং বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিএফ-ভিজিডি কার্ড প্রাপ্তিতে দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘হরিজন সম্প্রদায়কে ফেয়ার প্রেইস কার্ড দেয়া যায়। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন কর্তৃক হরিজন ও দলিত শ্রেণির জন্য বাসস্থান নির্মাণ করে দেয়া একান্ত প্রয়োজন। তারা খুবই মানবেতর জীবনযাপন করে থাকেন।’

প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা অনুযায়ী হরিজনদের ঘরবাড়ি পাওয়ার অধিকার আছে। এটা সাংবিধানিকভাবে মৌলিক অধিকারও। তাই হাসপাতালের পেছনে অর্ধশতক ধরে বসবাসরত হরিজনদের সরে যাওয়ার নোটিসটি প্রত্যাহার করে নেয়া উচিত। নোটিসের কার্যকারিতা এখন স্থগিত থাকলেও ভবিষ্যতে কি হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। প্রশ্ন হলো এভাবে কতদিন চলবে? কতদিন পর্যন্ত হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ, দলিত জনগোষ্ঠীর লোক আবাসনের সমস্যায় জর্জরিত থাকবে? কেনই বা তারা কোথাও থাকলে এক পর্যায়ে তা অবৈধ বলে গণ্য করা হবে?

আজহারুল আজাদ জুয়েল
পাটুয়াপাড়া, দিনাজপুর সদর।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj