অপারেশন জ্যাকপট নিয়ে ইতিহাস বিকৃত কেন?

মঙ্গলবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

একাত্তরের ১৪ আগস্ট পরিচালিত অপারেশন জ্যাকপটে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আমিও একজন। চট্টগ্রাম বন্দর ছিল অপারেশন এলাকা। এ ছাড়াও মোংলা, নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুরেও অপারেশন জ্যাকপট পরিচালিত হয়। অপারেশন জ্যাকপটে চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যাপক শোডাউন হয়েছে। এতে বড় কোনো জাহাজ ধ্বংস না হলেও বেশ কিছু ছোট নৌযান ধ্বংস করে আমরা পাকবাহিনীর ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলাম। এ অপারেশন সারাবিশে^ তোলপাড় হয়। অপারেশন জ্যাকপটে পাকবাহিনী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধে অ্যাভলুজসহ ছয়টি সফল নৌ অপারেশন করেছি। অ্যাভলুজ ছিল তৃতীয় অপারেশন। প্রথম অপারেশন ১৪ আগস্টের অপারেশন জ্যাকপট, দ্বিতীয় অপারেশন আউটার অ্যাঙ্কর। অ্যাভলুজের পর ৬ ডিসেম্বর বুড়িগঙ্গা-ধলেশ^রী মোহনায় এমভি তুরাগ ধ্বংস করি। বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা মোহনায় এমভি তুরাগ ধ্বংস করার ফলে ঢাকার সঙ্গে সারাদেশের যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ বিশ^ গোডাউনের সামনে জাতিসংঘের রসদবাহী জাহাজ মিনি লেডি ও মিনি লায়ন ধ্বংস করি ৮ ডিসেম্বর। এই অপারেশনে আমার সঙ্গী ছিলেন নৌকমান্ডো আবু তাহের। নৌযুদ্ধে আমাদের সফলতায় বিদেশি জাহাজগুলো এ দেশে আসা বন্ধ করে দেয়। সে কারণে পাকবাহিনীর রসদ আনা-নেয়া বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় তারা জাতিসংঘের জাহাজ ব্যবহার শুরু করে। আমরা খবরটি নিশ্চিত হয়ে পাকবাহিনীর রসদবাহী জাহাজ মিনি লায়ন ও মিনি লেডি ধ্বংস করে দিই। এতে পাকবাহিনীর মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে।

১০ ডিসেম্বর আমি, নৌকমান্ডো তাহের এবং নৌকমান্ডো মতি মিলে কাঁচপুর ফেরিঘাট অপারেশনে ফেরি ও পন্টুন উড়িয়ে দিই। এ অপারেশন সফল হওয়ায় ঢাকার সঙ্গে কুমিল্লার ময়নামতি ও চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে পাকবাহিনীর মনোবল আরো ভেঙে পড়ে। ওদিকে ঢাকার সঙ্গে অন্যান্য সংযোগ পথ বন্ধ করে দেয় মিত্র বাহিনী ও কাদেরিয়া বাহিনী। তারপরই পাকবাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়।

আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে আমার অপারেশনগুলো। মুক্তিযুদ্ধে এত অবদান রাখা সত্ত্বেও কি কারণে খেতাব পাইনি তার হিসাব মেলাতে পারিনি। অথচ অনেকেই পানিতে না নেমে নৌকমান্ডো হিসেবে খেতাব পেয়েছেন। সংক্ষিপ্ত এবং পূর্ণ নামে পৃথক দুটি খেতাব পাওয়া লোকও আছেন আমাদের মধ্যে। এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ পেয়েছি- এটাই আমার প্রশান্তি। আমার সন্তানরা স্বাধীন দেশের নাগরিক।

চলতি বছরের শুরুর দিকে সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পারলাম অপারেশন জ্যাকপট নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে। বিষয়টির জানান দিয়ে তারা একটি সংবাদ সম্মেলনও করেন। সেখানে অপারেশন জ্যাকপটের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে বলা হয়েছে, এতে এমভি হরমুজ ও এমভি আব্বাস নামে দুটি জাহাজ ধ্বংস হয়। বিষয়টি দেখে আমার খটকা লাগে। ভাবলাম এ অপারেশনে তো আমিও ছিলাম। এখনো আমার চোখে ভাসছে সেদিনের দৃশ্য। ওইদিন তো এমভি হরমুজ ও এমভি আব্বাস নামে কোনো জাহাজ ধ্বংস হয়নি। অপারেশন জ্যাকপট বিশ^ময় তোলপাড় তুললেও বড় কোনো জাহাজ ধ্বংস হয়নি। যা হয়েছে, বার্জ, ফেরি, পন্টুন ও টাগ। চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার বুকেও হরমুজ, আব্বাসের নাম উল্লেখ নেই।

অপারেশন জ্যাকপট নিয়ে ছবি নির্মাণের খবর শুনে পুলকিত হই। আমার জানার আগ্রহ বাড়ে ছবির কাহিনী, চিত্রনাট্য নিয়ে। চলচ্চিত্রটি নিয়ে খবরাখবর নিতে থাকি। যা খবর পেলাম তাতে উদ্বিগ্ন হতে হয়েছে। নিশ্চিত হই বিকৃত ইতিহাসে ছবি নির্মিত হচ্ছে। চলচ্চিত্রে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ জানিয়ে গত ৯ মে প্রধানমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী ও নৌপরিবহনমন্ত্রীর কাছে পৃথকভাবে আবেদন করি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, আমার আবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এ বিষয়ে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য। দীর্ঘদিন পার হলেও আমার আবেদনের বিষয়ে সাড়া না দেখে আমি বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমসহ কয়েকটি মিডিয়ায় যোগাযোগ করি।

গত ২৮ আগস্ট বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম পরিবেশিত সংবাদে জানতে পারলাম চলচ্চিত্রটির বাজেট ৩০ কোটি টাকা। যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ বাজেট। ২৯ আগস্ট আমার অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে বিডিনিউজ একটি পূর্ণাঙ্গ সংবাদ প্রকাশ করে ‘অপারেশন জ্যাকপটে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ নৌকমান্ডোর’ শিরোনামে। আমি উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছি আমার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ছবির পরিচালক ও চিত্র নাট্যকার গিয়াস উদ্দিন সেলিম যে বক্তব্য উত্থাপন করেছেন তা রীতিমতো ধৃষ্টতা। তিনি বক্তব্যে এমনভাব দেখিয়েছেন, আমি যেন কেউ না। মন্তব্য দেখে মনে হয়েছে, তিনি নিজেই পক্ষপাতপুষ্ট হয়ে ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন।

ইতিহাস বলে, একাত্তরে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড্ডয়ন করা হয়েছে। আমি জেনেছি অপারেশন জ্যাকপট ছবির চিত্রনাট্যে মাদারীপুরের একদল নৌকমান্ডোর যুদ্ধে অংশ নেয়ার বিবরণ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো, মাদারীপুরের নৌকমান্ডোদের কী এমন বিশেষত্ব আছে যে ছবিতে তাদের বাড়ি থেকে যাত্রা শুরুর বিপদ, কষ্ট, ভারতের ক্যাম্পে অভুক্ত থাকা, গোসল করতে না পারা, প্রশিক্ষণকালীন ঝুঁকি- এ সবকে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে হবে। এখানে চট্টগ্রাম তথা দেশের অন্য অঞ্চলের যোদ্ধাদের অংশ নেয়ার বিবরণ কেন আনা হবে না। যদিও মাদারীপুরে অপারেশন জ্যাকপটের কোনো অপারেশনই হয়নি।

চলচ্চিত্রে ব্যয় করা হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর তহবিলের ২৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। ১৯৭৬ সালের চিটাগং পোর্ট অর্ডিন্যান্স অ্যাজ অ্যামেন্ড্যাট আপটু ডেট-এর আওতায় চট্টগ্রাম বন্দরের কাজ, কাজের আওতা সুনির্দিষ্ট করা আছে। এতে চলচ্চিত্র নির্মাণের মতো কোনো কাজ চট্টগ্রাম বন্দরের নেই। চট্টগ্রাম বন্দর ম্যানুয়ালেও এ ধরনের কাজের উল্লেখ নেই। তারপরও কেন তারা এ কাজে হাত দিল। তা ছাড়াও পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রেগুলেশন) এবং পিপিএ (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট)- এ ক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হয়েছে। এ চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান না করায় পিপিআর ও পিপিএর লঙ্ঘন হয়েছে। যা লঙ্ঘনের অধিকার কারো নেই। পরিচালক গিয়াস উদ্দিন সেলিম নির্মিতব্য অপারেশন জ্যাকপটের জন্য ৩০ কোটি টাকার বাজেটকে ‘গরিবি বাজেট’ বলে উল্লেখ করেছেন (২৮ আগস্ট, বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম)। জানতে চাই, গিয়াস উদ্দিন সেলিম এর আগে সর্বোচ্চ কত টাকার বাজেটের ছবি বানিয়েছেন। তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে কয়টা মুক্তিযুদ্ধের ছবি আছে।

এ প্রসঙ্গে আরো বলতে চাই, তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে যে চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে সেটাতে পরিচালক হিসেবে নেয়া হয়েছে ভারতের বিখ্যাত পরিচালক শ্যাম বেনেগালকে। যিনি এর আগে ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী ও নেতাজি সুভাষ বসুর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। অপারেশন জ্যাকপটের ক্ষেত্রে কেন এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হলো না? এটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র যদি সরকারি উদ্যোগে করতে হয়, সে ক্ষেত্রে সরকারের মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এমনকি তথ্য মন্ত্রণালয় রয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাণের বিষয়টি সেসব মন্ত্রণালয়ের আওতায়ও পড়ে। অপারেশন জ্যাকপট বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এটি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ একটি মহৎ উদ্যোগ। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে এ তিন মন্ত্রণালয়ের একটিকে বাছাই করা যেত। সেটা না করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন জড়ানো হলো। যা তার কাজের আওতায় নেই। আমি চাই চলচ্চিত্র বা যে কোনো মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরা হোক নির্মোহভাবে, সঠিক ইতিহাসের আলোকে। ইতিহাস বিকৃত হলে আমাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।

আবু মুসা চৌধুরী : মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবাসী লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj