আওয়ামী লীগের নির্বাচনযাত্রা এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ

সোমবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হুইসেল বেজে উঠেছে। সময় একবারেই দুয়ারে এসে কড়া নাড়ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে চাইছে। তাদের এই ইচ্ছার কথা তারা কোনোভাবেই গোপন করছে না। দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আবার নৌকা মার্কায় ভোট চাইছেন শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা একজন যোগ্য সরকারপ্রধান হিসেবে স্বীকৃত। তার পরচিতি ও জনপ্রিয়তা বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। সম্প্রতি একটি আমেরিকান সংস্থার জরিপেও এটা দেখা গেছে যে, জনপ্রিয়তায় শেখ হাসিনা অনেক এগিয়ে। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে নতুন উচ্চতা ও মর্যাদা পেয়েছে। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ইতিহাস তৈরি করে আবারো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের অপেক্ষায় আছেন- এটা আর কোনো স্বপ্ন কল্পনা নয়।

তবে যত সহজভাবে কথাগুলো বলা হলো ঘটনাগুলো তত সহজে ঘটবে না। না ঘটাটাই স্বভাবিক। বাংলাদেশের রাজনীতির কতগুলো বাস্তবতা আছে। এখানে নেতিবাচক রাজনীতি প্রবল। এই দেশটা আন্দোলন-সংগ্রামের দেশ। এখানকার মানুষ হ্যাঁর চেয়ে না বলতে বেশি পছন্দ করে। মানি না, মানব না হলো বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধ্বনি। এখানকার প্রকৃতি-পরিবেশ, জলবায়ু মানুষগুলোকেও কোমলে-কঠোরে তৈরি করছে। মানুষ রাজনীতিতেও পরিবর্তনের পক্ষে।

তবে অনেক দেখে, অনেক আন্দোলন-সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়ে মানুষের রাজনৈতিক পরিপক্বতা যে বেড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষ আবেগতাড়িত না হয়ে যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। কাজেই একবার এ দল সরকার গঠন করলে পরেরবার বি দলের সরকার গঠন নিশ্চিত- এই মিথটিও ভেঙে পড়তে শুরু করছে। আওয়ামী লীগ টানা দুই মেয়াদে সরকার চালিয়ে এর মধ্যেই নতুন রাজনৈতিক রেকর্ড করে ফেলেছে। এবার তাদের টার্গেট পরপর তৃতীয়বাবের মতো সরকার গঠন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারো কারো ধারণা, টানা ক্ষমতায় থাকার ক্ষতি এবার আওয়ামী লীগকে ভোগাবে। আওয়ামী লীগ এখন কতটুকু জনপ্রিয় আছে, রাজনীতিতে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দিক দিয়ে আওয়ামী লীগ এখনো বিএনপির চেয়ে এগিয়ে আছে। বিএনপি সমর্থকও হয়তো দেশে বেশি কিন্তু সংগঠিত কর্মীর সংখ্যা আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির যে কম এটা মানতেই হবে। সে জন্য আন্দোলনের ডাক দিলে মানুষ সাড়া দেয় না। তবে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশে মানুষ উপস্থিত হয়।

নির্বাচনের আগে আমাদের দেশে কৌশলে একটি কথা প্রচার করা হয় যে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হলে বিএনপি জিতবে। এ ধরনের প্রচারণার কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে বলে মনে হয় না। মানুষ কেন বিএনপিকে ভোট দেবে? শেখ হাসিনার চেয়ে কোনোদিক দিয়েই কি শাসক হিসেবে খালেদা জিয়াকে এগিয়ে রাখা যাবে? শেখ হাসিনা পরিশ্রমী এবং উদ্যমী। তিনি সৃষ্টিশীল, দেশ নিয়ে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা-পরিকল্পনা আছে। খালেদা জিয়া ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগহীন, রুটিন কাজের বাইরে তিনি কিছু করতে পারেন বলে শোনা যায় না। তিনি ব্যক্তিগত সহকারীদের ওপর নির্ভরশীল। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তার নিজস্ব কোনো স্বপ্ন-পরিকল্পনার কথা শোনা যায় না। তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার সময়ের বিশেষ কোনো পরিকল্পনার কথা কেউ শুনেছেন? সবচেয়ে বড় কথা শারীরিক সক্ষমতা। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এখন বয়সের ভারে এবং অসুস্থতার কারণে দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যথেষ্ট ‘ফিট’ নন। এগুলো কোনো বিরুদ্ধ পক্ষের অপপ্রচার নয়। তার দলের নেতারাই তার প্রায় পঙ্গুত্বের উদ্বেগজনক খবর দেশের মানুষকে জানাচ্ছেন।

তাহলে শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে মানুষ খালেদা জিয়াকে কেন সমর্থন করতে যাবে? আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-এমপি-মন্ত্রীর দুর্নীতি-অনিয়ম-স্বজনপ্রীতির অভিযোগ শোনা যায়। ঘুষ আমাদের দেশে একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হয়ে দেখা দিয়েছে। এটা ক্ষমতার রাজনীতির ধারাবাহিক দুর্বৃত্তায়নের ফল। বিএনপি আমলেও এসব ছিল এবং প্রবলভাবেই ছিল। বিএনপির সময় বরং তারেক রহমানের নেতৃত্বে ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’ গড়ে উঠেছিল। কত ধরনের অপরাধ প্রবণতা দেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলের কত উৎকট আয়োজন শুরু হয়েছিল। শেখ হাসিনার জনসভায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রেনেড হামলার মতো মারাত্মক অপরাধও অবাধে সংঘটিত হয়েছে। কাজেই দুর্নীতি-দুঃশাসন বিবেচনা করলেও বিএনপিকে যারা ভোটে এগিয়ে রাখতে চান তারা শুধু একদেশদর্শী নন, চরমভাবে পক্ষপাতমূলক।

বিএনপির রাজনীতি হলো সুবিধাবাদিতার রাজনীতি, নীতিহীনতার রাজনীতি। ক্ষমতায় না থাকলে এক রকম, থাকলে অন্য রকম। আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় এসে দেশ থেকে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি নির্মূলে শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু নীতিগতভাবে আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমর্থক নয়। কিন্তু বিএনপি দলীয়ভাবেই সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে। তারা সংখ্যালঘু স্বার্থবিরোধী। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে চাকরি-বাকরিতে নিয়োগ-পদোন্নতি-পদায়নের ক্ষেত্রে চরম সাম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ আর বিএনপিকে যারা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ মনে করেন, তাদের আসলে মুদ্রা চেনার ক্ষমতাই তৈরি হয়নি।

নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে বিএনপি এখনো অবস্থান স্পষ্ট করেনি। তাদের এখন প্রধান লক্ষ্য খালেদা জিয়ার মুক্তি। খালেদা জিয়াকে নিয়েই বিএনপি নির্বাচনে যেতে চায়। তাদের আশা পূরণ হোক- সেটাই আমরা চাইব। তবে বিএনপি যদি দাবির ফর্দ কেবল বাড়াতে থাকে তাহলে ফল ভালো নাও হতে পারে! লেবুর স্বাদ পাওয়ার জন্য বেশি না কচলানোই উত্তম।

ওদিকে বাংলাদেশের রাজনীতির আরেক ঘোড়েল প্লেয়ার হু মু এরশাদ গোঁফে তা দিতে শুরু করেছেন। বিএনপি যদি নির্বাচন করে তাহলে এক রকম, বিএনপি না করলে এরশাদের অবস্থান হবে অন্য রকম! এরশাদ ক্ষমতার মই বা সিঁড়ি হতে চান না, কিন্তু সিঁড়ি না হয়ে তার কোনো উপায়ও নেই। তিনি এখন রাজনীতির প্রধান খাদ্য নন, বড়জোর উপাদেয় চাটনি। কিন্তু দেখার বিষয় হলো, ডিগবাজবিশারদ এরশাদ এবার ডিগবাজি খান, নাকি এক কথার মানুষ হিসেবে এবার নিজেকে প্রমাণ করেন।

রাজনীতির নির্বাচনী ট্রেনযাত্রা শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টির কিছু নির্বাচনী প্রস্তুতির কথাও শোনা যাচ্ছে। কামাল হোসেন, বি. চৌধুরীরা গোপন শলাপরামর্শে ব্যস্ত। সিপিবি-বাম ঘরানা আওয়ামী লীগ হটানোর বুদ্ধি বের করার জন্য কিতাবের পাতা ঘাঁটছে। তারা আওয়ামী লীগকে অসহ্য মনে করলেও বিএনপিকে সহনীয় মনে করছেন। খালেদা জিয়ার জেল যন্ত্রণায় বেজায় কাতর সিপিবি। তারা ভুলে গেছেন, বয়োবৃদ্ধ জননেতা কমরেড মণি সিংহকে জেলে নিতে এতটুকু বিবেকের জ্বালাবোধ করেননি। এখন হয়তো বলবেন, জিয়া ছিলেন মিলিটারি শাসক, তিনি যা করেছেন শেখ হাসিনা কেন তা করবেন?

এই হলো আমাদের গণতান্ত্রিক উদারতার সমস্যা। শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা দোষের নয়, কিন্তু খালেদা জিয়াকে মামলায় শাস্তি দেয়া বিরাট অন্যায়, অগণাতান্ত্রিক!

আগামী নির্বাচনে এ বিষয়গুলো যদি সামনে আসে, ভোটারদের বিবেচনায় আসে তাহলে মন্দ হবে না বলেই আমার ধারণা।

বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj