বিবাহবিচ্ছেদের বিরূপ প্রভাব…

সোমবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বিবাহিত নর-নারীর জীবিত অবস্থায় আইনগত বিবাহ সম্পর্কের পরিসমাপ্তিই ডিভোর্স বা বিবাহবিচ্ছেদ। শত শত বছর ধরে বিবাহকে অভঙ্গনীয় মনে করা হলেও বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বিবাহবিচ্ছেদকে অনুমোদন করে। গত কয়েক দশকে বিশ্বব্যাপী বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। গত এক দশকে দ্বিগুণ হারে বিবাহবিচ্ছেদ বেড়েছে। বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৬ সালে বাংলাদেশের প্রতি হাজারে বিচ্ছেদের হার ছিল দশমিক ৬। বর্তমানে এ হার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে এক দশমিক এক। বিচ্ছেদের আবেদনকারীদের মধ্যে হাজারে এক দশমিক সাত জন রয়েছেন উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা। শুধু ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকাতেই দিনে ৫০টির বেশি বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ছে। সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় বিচ্ছেদের নোটিস পাঠানো হয়েছে ২৪ হাজার ৯১২টি। এর মধ্যে পুরুষের পাঠানো আবেদনের সংখ্যা ৮ হাজার ৯৬টি। অর্থাৎ নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ। ২০১৬ সালে রাজধানী বাসিন্দাদের মোট ৪ হাজার ৮৪৭টি বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে পুরুষের ১ হাজার ৪২১টি এবং নারীদের ৩ হাজার ৪২৬টি। ঢাকার বাইরে বরিশাল বিভাগে বর্তমানে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫টি বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। গত পাঁচ বছরে খুলনা মহানগরীতে মোট বিচ্ছেদ হয়েছে ৬ হাজার ৫৮৭টি। অন্যান্য বিভাগের মতো চট্টগ্রামেও বিবাহবিচ্ছদের হিড়িক পড়েছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তথ্য মতে, প্রতি মাসে গড়ে ৩৩৮টি বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।এখন প্রশ্ন হলো, কেন বিবাহবিচ্ছেদ এত উচ্চহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে? আমরা যতই সামনে এগিয়ে যাচ্ছি সামাজিক জটিলতা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এর প্রভাবে বেড়ে যাচ্ছে বিবাহবিচ্ছেদের হার। তবে সামাজিক জটিলতা ও ডিভোর্সের ধরন বিশ্লেষণ করলে এর কিছু কারণ চিহ্নিত করা যায়। শিল্পায়নের ফলে পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন হচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হচ্ছে, স্বামী-স্ত্রীর আত্মকেন্দ্রিকতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতারণার সুযোগ বেড়ে যাওয়া, নৈতিক স্খলন, প্রবাসী সমস্যাসহ আরো অনেক কারণ আছে। আমাদের পরিবার কাঠামো পরিবর্তিত হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তিত হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞনীরা বলছেন, আগে মানুষ ছিল পরিবার কেন্দ্রিক, কিন্তু এখন মানুষ দিন দিন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ পূর্বে মানুষ ধারণা করত ব্যক্তি পরিবারের জন্য আর এখন ধারণা করা হয় পরিবার ব্যক্তির জন্য। আবার নারীরা এখন শিক্ষিত এবং কর্মজীবী হওয়ায় একসময়ের গৎবাঁধা ধারণা ‘নারীরা একা জীবনধারণ করতে সক্ষম নয়’- এ ধারণারও পরিবর্তন হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতারণার যেসব সম্পর্ক গড়ে উঠছে তা খুব সহজেই বিচ্ছেদের দিকে যাচ্ছে। আবার প্রবাসীদের ক্ষেত্রে অবিশ্বাস, সন্দেহ, পরকীয়া বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।

বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। এর জন্য তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিই এক প্রকারে দায়ী। শিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়নের কারণে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবার বা স্বামীর মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে না। আগে নারীরা স্বামী ও স্বামীর পরিবারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল। যার ফলে অনেক কিছু মেনে নিয়ে চলত। নিজে তেমন কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারত না। এখন এ হার অনেক কমে গেছে। আর্থসামাজিক নিশ্চয়তা থাকার কারণে পরিবারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করছে। ফলে বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীদের পক্ষ থেকে সাড়া বেশি পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত কলহ-বিদ্রোহের ভেতরে থাকার চেয়ে অনেকে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। যে কোনো কারণেই হোক ডিভোর্সের হার বাড়ছে এটা সত্য। কিন্তু বিচ্ছেদের বিরূপ প্রভাব পড়ছে সন্তান-সন্ততির ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে, বিচ্ছেদের পর সংশ্লিষ্ট পরিবারের ছেলেমেয়েরা ব্যাপক মানসিক উদ্বেগে ভোগে। এসব পরিবারের ছেলেমেয়েরা হতচকিত ও ভীত হয়ে পড়ে এবং বিচ্ছেদের জন্য নিজেদের দায়ী ভাবতে শুরু করে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তাই তাদের জন্য কল্যাণমূলক ব্যবস্থাদি ও গৃহসংস্থান, শিশু পরিষেবার সুযোগ বৃদ্ধি করা দরকার যাতে তারা অকালে ঝরে না পড়ে।

জসীম উদ্দীন

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj