বাংলাদেশ ও বদ্বীপ পরিকল্পনা

রবিবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

অতিসম্প্রতি একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ ও পাস করা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় বন্যা, নদীভাঙন, নদী শাসন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ বা ডেল্টা প্লান-২১০০ নামে পরিচিতি পাচ্ছে। যদিও আগামী ১০০ বছরের পরিকল্পনা এটি। আপাতত ২০৩০ সাল নাগাদ ৮০টি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এতে খরচ হবে ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। বর্তমান বাজার দরে টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বাড়তি দেড় শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। আগামী ১০০ বছরে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনা এটি।

বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ছয়টি এলাকাকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এগুলো হলো উপক‚লীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নদীবিধৌত অঞ্চল ও নগর এলাকা। এ ছাড়া বদ্বীপ পরিকল্পনায় বৃহৎ পরিসরে তিনটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো- ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য দূর করা, ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা অর্জন। বদ্বীপ পরিকল্পনা হলো দীর্ঘমেয়াদি, একক এবং সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা। দীর্ঘমেয়াদি বলতে পরিকল্পনার লক্ষ্য ২১০০। একক হলো দেশের সব পরিকল্পনার আন্তঃযোগাযোগের মাধ্যমে একক ডেল্টা। সমন্বিত বলতে পানি সম্পর্কিত সব খাতকে একটি পরিকল্পনায় নিয়ে আসা। বদ্বীপ পরিকল্পনা কৌশলসমূহের টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে ডেল্টা ভিশনে পৌঁছাতে সাহায্য করে। সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন-সম্পর্কিত বিপর্যয় থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত, পানি ব্যবহারে অধিকতর দক্ষতা আনয়ন, সমন্বিত ও টেকসই নদী এবং নদী মোহনা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং তাদের যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত, আন্তঃ ও আন্তঃদেশীয় পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও ন্যায়সঙ্গত সুশাসন গড়ে তোলা এবং ভূমি ও পানিসম্পদের সর্বোত্তম সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় সর্বাধিক গুরুত্বের দাবিদার।

বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুতবর্ধনশীল। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া, স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করার চ্যালেঞ্জ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এ জন্যই কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, মৎস্য, শিল্প, বনায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, স্যানিটেশনসহ সব খাত বিবেচনায় রেখে সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ একান্ত জরুরি ছিল। বদ্বীপ পরিকল্পনায় অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের উন্নয়ন প্রাধিকারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। যে কোনো দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুশাসন ও সহায়ক কার্যকরী প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো তৈরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব হ্রাস করে জলবায়ু পরিবর্তন বিবেচনায় রেখে কৃষি, পানিসম্পদ, ভূমি, শিল্প, বনায়ন, মৎস্যসম্পদ প্রভৃতিকে গুরুত্ব প্রদানপূর্বক সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুষ্ঠু পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি (৫০ থেকে ১০০ বছর) একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের কর্মকৌশল নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের প্রতিটি ধাপে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, একাডেমিক, পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলোকে স্থানীয় মৎস্য ও কৃষিজীবী মানুষের জীবনধারার সঙ্গে সমন্বয় করার প্লান করতে হবে। উপক‚লীয় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে বিশেষ নজর দিতে হবে। শহর রক্ষা বাঁধ, সড়ক, রাস্তা, বাজার, আবাসন, স্যানিটেশন, স্কুল, বিদ্যুৎ, জ্বালানির টেকসই পরিকল্পনা ইত্যাদির বিষয়ে কঠোর হতে হবে। স্যালাইন সহনীয় কৃষি ফসল, সার বীজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরো ভাবতে হবে এবং শহর রক্ষা, ড্যাম, বন্য নিয়ন্ত্রণের ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল কাজগুলো রিনিউএবল এনার্জি সোর্সের সমন্বয়ে আনতে হবে। উপক‚লীয় মানুষের জ্বালানি চাহিদাগুলো মিটানো যায়! সুন্দরবনে জীবিকা নির্বাহী লোকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা করতে হবে। বর্ষায় ভারত বড় বড় আন্তর্জাতিক নদীগুলোর উজানে দেয়া বাঁধের সøুইস গেট ছেড়ে দিয়ে অতি স্বল্প সময়ে ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাড তৈরি করে, দীর্ঘস্থায়ী বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করে কিংবা বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি করে। ডেল্টা প্লানে এই মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং ভারতের ছেড়ে দেয়া পানির প্রবাহকে কীভাবে সমন্বিত করে দেশের বর্ষাকালীন ফলন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ঠিক রাখা যাবে সেগুলো গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ ও প্রাণীর জীবন-জীবিকা, পরিবেশ ও প্রতিবেশের গুরুত্ব দিতে হবে। এগুলো আছে এ মহাপরিকল্পনায়। তবে সরকারকে কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে।

বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ গুরুত্বপূর্ণ মহাপরিকল্পনা; যা সমন্বিত, সর্বজনীন ও বাস্তবতার নিরিখে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল। দেশের স্থিতিশীল আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এটি হবে ভবিষ্যতের কার্যকরী দীর্ঘমেয়াদি গাইড লাইন। জাতিসংঘ প্রণীত টেকসই উন্নয়নের সতেরোটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে হলে বদ্বীপ পরিকল্পনার উদ্যোগ সফলভাবে পরিচালিত করতে হবে এবং এই পরিকল্পনাকে আরো সুপরিকল্পিতভাবে সমন্বিত করতে হবে। সরকারি এবং বেসরকারি সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।

আবু আফজাল সালেহ : উপপরিচালক (বিআরডিবি) লালমনিরহাট।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj