দক্ষ জনশক্তি ও রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে

রবিবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম রেমিটেন্স। তবে এখনো পর্যন্ত অল্প কয়েকটি দেশ থেকেই আসছে সিংহভাগ রেমিটেন্স। কাতার, ওমান, বাহরাইন, যুক্তরাজ্য, হংকং, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের রেমিটেন্সের অন্যতম উৎস বলে বিবেচিত। সরকার বিভিন্নভাবে এমন অবস্থা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও তা পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বেশি রেমিটেন্স এসেছে। তবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও কুয়েত থেকে দেশের মোট রেমিটেন্সের ৫৫ শতাংশ এসেছে। এ সময়ে বরাবরের মতো সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এসেছে। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে দিন দিন জনশক্তি রপ্তানি কমে যাচ্ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে তিন লাখ ৯২ হাজার ২৫০ জন। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম। আগের বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাঁচ লাখ ২০ হাজার ৪৯০ জনশক্তি পাঠানো হয়। বাংলাদেশ থেকে যত জনশক্তি রপ্তানি হয় তার বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানিতে আস্থার প্রতীক ছিল উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থাভুক্ত জিসিসির ছয়টি দেশ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভিসা জটিলতা, ক‚টনৈতিক ব্যর্থতাসহ নানা প্রতিক‚লতার কারণে ক্রমে সংকুচিত হয়ে এসেছে এ শ্রমবাজার। ফলে প্রতি বছর কমছে জনশক্তি রপ্তানি। সৌদি আরবের নতুন আইন, নানা চেষ্টা সত্ত্বেও আরব আমিরাতের বন্ধ শ্রমবাজার খুলতে না পারা ভাবিয়ে তুলেছে প্রবাসীদের। একমাত্র আশার আলো জ্বালিয়ে রাখা মালয়েশিয়ায়ও তৈরি হয়েছে নতুন আশঙ্কা। এত কিছুর পরও থেমে নেই জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে এজেন্সিগুলোর নিজেদের মধ্যে দ্ব›দ্ব-হানাহানি আর বিদেশ গমনেচ্ছুদের সঙ্গে প্রতারণা।

এক সময় কুয়েত ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাজার। অথচ এখন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বাজারটি। এ ছাড়া ছোট হয়ে এসেছে সৌদি আরবের শ্রমবাজার। লিবিয়ার দুয়ারও বন্ধ। ইরাকও প্রায় বন্ধের মতোই। অথচ জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনাময় এই খাত থেকে অতীতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। শেষে একমাত্র মালয়েশিয়ার বাজার ছিল চাঙ্গা। কিন্তু প্রতিদ্ব›িদ্বতার নামে কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির অহেতুক শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব, আরেক পক্ষের বাজার কুক্ষিগত রাখার ইচ্ছা প্রায় নষ্ট করে ফেলেছে এই শ্রমবাজারকে। কোনো ধরনের প্রতারণার ঘটনা না ঘটিয়ে জি টু জি প্লাস পদ্ধতিতে যখন গতি বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল, তখন বায়রার দুপক্ষের হানাহানিতে জি টু জি প্লাস পদ্ধতিই বন্ধ হয়ে গেল। এখন পুরনো পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় গিয়ে আবার প্রতারিত হয়ে বাংলাদেশিদের রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রাণভোমরার ভূমিকা পালনকারী এই খাতে প্রাণসঞ্চার করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হলেও কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোর দুয়ার বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য এখন কার্যত বন্ধ।

সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় নতুন বাজার খোঁজা হচ্ছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে নতুন কোনো স্থায়ী বাজার সৃষ্টি করতে পারেনি বাংলাদেশ। এই দীর্ঘসময়ে পুরনো বাজারগুলোও স্বাভাবিক করতে পারেনি সরকার। ফলে বিরাট ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে আমাদের জনশক্তি রপ্তানি খাত। অনিয়মিতভাবে কিছু কর্মী গেলেই সেটিকে বাজার বলা যায় না। এটা সত্যি যে, অতীতের তুলনায় এখন বিদেশে কর্মী যাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে। আগে যত দেশে এখান থেকে লোক যেত এখন তার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি দেশে কর্মী যাচ্ছে। রেমিটেন্সও দ্বিগুণ আসছে।

দেশে রেমিটেন্স প্রবাহ যত বাড়বে আমাদের অর্থনীতি তত বেশি চাঙ্গা হবে। কিন্তু বিদেশ থেকে দেশে রেমিটেন্স পাঠানোর ক্ষেত্রে নানা প্রতিক‚লতা বিদ্যমান এখনো। ব্যাংক কিংবা এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে বৈধ চ্যানেলে দেশে রেমিটেন্স প্রেরণের ব্যাপারে প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া তেমন জোরদার হয়ে ওঠেনি এখানে। দায়সারা কিছু প্রচারণার মাধ্যমে প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈধ পথে রেমিটেন্স পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানা অভিযোগ রয়েছে এ ক্ষেত্রে। প্রথমত, আমাদের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এবং এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর রেমিটেন্স ফি বা খরচ তুলনামূলকভাবে আঞ্চলিক, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে এটা কিছুটা হ্রাস করা হয়েছে বটে তবে অনেক প্রবাসীকে তার উপার্জিত অর্থের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অর্থ দেশে রেমিটেন্স পাঠাতে খরচ হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে এখনো নানা দীর্ঘসূত্রিতা, ঝুঁকি, বিলম্বে বেনিফিশিয়ারির রেমিটেন্স প্রাপ্তি বিষয়গুলো দারুণ পীড়াদায়ক হয়ে আছে। ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো এ খাত থেকে বেশ মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করছে এ কারণে তারা রেমিটেন্স ফি যৌক্তিকভাবে আরো কমিয়ে আনতে পারে। এর ফলে রেমিটেন্স প্রবাহ আগের তুলনায় বেড়ে গিয়ে তাদের আয়ের পরিমাণও অনেক বৃদ্ধি পেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ব্যাংকগুলোর রেমিটেন্স ফি কমিয়ে আনতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারে রেমিটেন্স ফি না নিয়ে ফ্ল্যাট ফি নিতে পারে। বিদেশে অনেক পরিশ্রম করে অনেক ঘাম ঝরিয়ে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠাতে গিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ হলে স্বদেশে রেমিটেন্স পাঠাতে অনুৎসাহিত হন। প্রবাসীরা তারা তখন অবৈধ উপায়ে অবলম্বন করে হুন্ডির আশ্রয় গ্রহণ করেন। যার মাধ্যমে সন্ত্রাস, অপরাধ, মাদক পাচার, চোরাচালানের মতো অনাকাক্সিক্ষত কর্মকাণ্ড চাঙ্গা হয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি ব্যাংকের যেসব শাখা রয়েছে সেখানে কর্মরত কর্মকর্তারা যদি আগত রেমিটেন্স প্রেরণকারীদের যথাযথভাবে গাইড করেন, প্রয়োজনে তাদের কর্মস্থলে গিয়ে কিংবা বাসায় বাসায় গিয়ে এ সম্পর্কে উৎসাহিত করেন এবং দেশে প্রিয়জনের কাছে অর্থ প্রেরণ প্রক্রিয়াকে সহজসাধ্য করে তোলেন তাহলে রেমিটেন্স পাঠানোর পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ ক্ষেত্রে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে রেমিটেন্স প্রেরণকারী প্রবাসীদের উৎসাহিত করতে পারেন। বাংলাদেশে প্রবাসীদের অর্থ ব্যাংকে এবং সঞ্চয় ব্যুরোতে নির্দিষ্ট মেয়াদে জমা রাখার লক্ষ্যে ওয়েজ আর্নার বন্ড চালু রয়েছে। এগুলো সম্পর্কে বেশিরভাগ প্রবাসী তেমন ভালোভাবে অবহিত নন। প্রবাসীদের বেশি বেশি পরিমাণে রেমিটেন্স পাঠানোর ব্যাপারে উৎসাহী করতে আরো আকর্ষণীয় প্যাকেজ স্কিম চালু করতে হবে বিভিন্ন ব্যাংকে। জমাকৃত আমানতের বিপরীতে ঋণ সুবিধা প্রাপ্তির ব্যাপারটিকে সহজসাধ্য করতে হবে আরো। বিদেশে গিয়ে অদক্ষ আধা দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কম বেতনে যেন চাকরি করতে না হয়, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে যাওয়া দক্ষ অভিজ্ঞ শ্রমিকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি বেতনের চাকরি যাতে পেতে পারেন- তেমন যোগ্যতা নিয়ে বিদেশে যেতে হবে। দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের মাধ্যমে রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ানো সম্ভব। এ লক্ষ্যে সরকার এখন অনেকটাই মনোযোগী হয়েছে। বিদেশ গমনেচ্ছু শ্রমিকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ যোগ্য অভিজ্ঞ করে তোলার লক্ষ্যে এখন বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রবাসীদের রেমিটেন্স প্রবাহ আরো বেগবান করতে তাদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এ জন্য সরকারকে দ্রুত এবং কঠোরভাবে সব অনিয়ম দুর্নীতি রোধ করতে হবে।

রেজাউল করিম খোকন : লেখক ও ব্যাংকার।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj