আইডিএলসি নাট্যোৎসব নিয়ে বিতর্ক

শনিবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

শাহনাজ জাহান : রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ জাতীয় নাট্যশালায় ‘আইডিএলসি’ নামের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে চলছে পাঁচ দিনব্যাপী নাট্যোৎসব। ‘তারণ্যের জয়গানে আসুন আনন্দের মঞ্চে’- ¯েøাগান নিয়ে এই উৎসব শুরু হয়েছে গত ৪ সেপ্টেম্বর, চলবে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই নাট্যোৎসবে অনলাইন নিবন্ধন করে নাটক দেখার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শক। অন্যদিকে নাট্যকর্মীদের অনেকেই অভিযোগ করছেন এভাবে ফ্রি নাট্যোৎসব আয়োজন, নাট্যাঙ্গনের জন্য ইতিবাচক নয়। ৪৬ বছর ধরে যেখানে টিকেটের বিনিময়ে নাট্যচর্চার দর্শক তৈরি হয়েছে। সেখানে হুট করে একটা কর্পোরেট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের এই আয়োজন নাট্যাঙ্গনের জন্য নেতিবাচক বার্তা নিয়েই আসবে। আবার মঞ্চনাটকে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন অনেকে। উৎসব আয়োজকদের দাবি মঞ্চনাটকের সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ত করতেই এই নাট্যোৎসব আয়োজন করা হচ্ছে। এদিকে মঞ্চনাটকের পৃষ্ঠপোষকতায় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর এগিয়ে আসা ইতিবাচক বলে মনে করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তিনি বলেন, ‘মঞ্চনাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জীবিকা নির্বাহের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভাবতে পারে কিনা? একটা পদ্ধতি চালু করতে পারে কিনা? যেটা দিয়ে বার্ষিক হলেও শিল্পীদের একটা সম্মানী দিতে পারে।’ এই নাট্যোৎসব নিয়ে আইডিএলসির প্রধান নির্বাহী আরিফ খান বলেন, ‘এই আয়োজন নিঃসন্দেহে মঞ্চনাটকের প্রতি তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে এবং এ দেশের মঞ্চনাটকে নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের আরো অনুপ্রাণিত করবে।’

আইডিএলসি নাট্যোৎসবে মঞ্চস্থ হচ্ছে প্রাঙ্গণেমোর প্রযোজিত নাটক ‘হাছনজানের রাজা’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের নাটক ‘দ্য লোয়ার ডেপথস’, ঢাকা পদাতিকের নাটক ‘ট্রায়াল অব সূর্যসেন’, পালাকার থিয়েটারের নাটক ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, বটতলার নাটক ‘ক্রাচের কর্নেল’, ঢাকা থিয়েটারের নাটক ‘পঞ্চনারী আখ্যান’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের নাটক ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’, থিয়েটারের নাটক ‘মুক্তি’, প্রাচ্যনাটের নাটক ‘সার্কাস সার্কাস’ এবং নাগরিক নাট্য স¤প্রদায়ের নাটক ‘ওপেন কাপল’। উৎসবে অংশ নেয়া নাটকগুলোর নির্দেশকেরা কথা বলেছেন বিষয়টি নিয়ে। ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ নাটকের নির্দেশক ও দেশের অগ্রজ নাট্য ব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা তো স্পন্সর নিয়ে নাটক করছি। সেই জায়গা থেকে এই উদ্যোগটা মন্দ না। তা ছাড়া কিছু লোককে ফ্রি টিকেট দেয়া মানে এই না যে তারা চাইলেই ঢুকতে পারছেন। বরং তাদের একটা পক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এটা ফ্রি না। দর্শকের টাকাটা আইডিএলসি দিয়ে দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় অনেক বেশি দর্শক হচ্ছে। এটি এক ধরনের অনুপ্রেরণা হিসেবে ধরা যেতে পারে।’ ‘হাছনজানের রাজা’ নাটকের নির্দেশক অনন্ত হিরা বলেন, ‘প্রথমত আমরা বিনা টিকিটে নাটক দেখাইনি। এই বিষয়টি নিয়ে একটু ভুল বোঝাবুঝি আছে। তবে মঞ্চনাটকের পৃষ্ঠপোষকতায় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসা ইতিবাচক। একটা নতুন নাটক মঞ্চে আনার পর সেই নাটকের প্রদর্শনীর জন্য সরকার আমাদের অনুদান দেয় না। তাই আমাদের একটি শো যদি তারা অর্থের বিনিময়ে কিনে নিয়ে তাদের কোম্পানির লোকজন বা পরিচিত জনকে দেখায় সেটা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। সেটা এক ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা বলেই আমি মনে করি।’

‘ক্রাচের কর্নেল’ নাটকের নির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দার বলেন, ‘বিনা টিকেটে নাটক দেখানোর পক্ষে আমি একদমই না। আমি বিনা টিকেটে কাউকে নাটক দেখাই না বা দেখাতে চাইও না। কারণ একটি নাটক মঞ্চে আনতে থিয়েটারের কর্মীরা যে পরিশ্রম করে বা যে পরিমাণ খরচ হয় সেটি একজন সাধারণ দর্শক কখনো দেখে না।’ ‘ট্রায়াল অব সূর্যসেন’ নাটকের নির্দেশক মাসুম আজিজ বলেন, আমি বলবো প্রথমত এটা ফ্রি না। এই উৎসবের খরচ অন্যান্য উৎসবের চাইতে অনেকগুণ বেশি। যারা ফ্রি বলে বিতর্ক তুলেছেন তারা হয়তো বিষয়টা ভালো করে না জেনেই বিতর্কে জড়াচ্ছেন। আর যদি ফ্রি হয়েও থাকে তাহলে সেটা খারাপ কি? বেঙ্গল ক্লাসিক্যাল ফেস্টও তো ফ্রি, সেটা নিয়েতো কোনো বিতর্ক হচ্ছে না। আইডিএলসি এই উদ্যোগটা নিয়েছে এতে খারাপের কি আছে?’

‘পঞ্চনারী আখ্যান’ নাটকের নির্দেশক শহিদুজ্জামান সেলিম বলেন, ‘আমি আসলে এখানে বিতর্কের কিছু দেখছি না। একটা প্রতিষ্ঠান যদি আর্থিকভাবে আমাদের সাহায্য করে থাকে তাহলে সেটা খারাপ কি? আমরা তো নতুন নাটক করতে গেলে স্পন্সর খুঁজি। এখানে তারা নিজে থেকে দিচ্ছে। এতে করে আপত্তি কোথায় আমি বুঝতে পারছি না।’

‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ নাটকের নির্দেশক রেজা আরিফ বলেন, ‘এটা নিয়ে আমার এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি আছে। আমরা যখন প্রস্তাব পেয়েছি উৎসবে নাটকটি করার জন্য, তখন আমরা জানতাম না এটি ফ্রি টিকেটের মাধ্যমে দেখানো হবে। সেই তথ্যটা আমরা অনেক পরে জেনেছি। এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে হবে। সেটা এভাবে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে এটুকু বলতে পারি আমাদের জানা ছিল না বিষয়টা আসলে কি?’

‘দ্য লোয়ার ডেপথস’ নাটকের নির্দেশক নাহিদ তানভীর বলেন, ‘দর্শনীর বিনিময়ে নাট্যচর্চা নিয়ে একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। আমার মতে নাটক হওয়া উচিত টিকেটের বিনিময়েই, সেটা উৎসব হোক কিংবা নিয়মিত প্রদর্শনী। তবে এটাও ঠিক যে থিয়েটারে পৃষ্ঠপোষকতার দরকার আছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে থিয়েটারের পৃষ্ঠপোষক আছে। কিন্তু বাংলাদেশে এর ঘাটতি আছে। সেখানে আইডিএলসি কিন্তু এক ধরনের পারিশ্রমিক বা অনুদান দিয়েছে। এটা এক ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা।’

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj