সিডর

শনিবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

অরূপ রতন মণ্ডল

প্রতি সন্ধ্যার মতো আজো অপু হারিকেনের আলোয় পড়তে বসেছে। পাশের চৌকিতে বসে আছেন শৈলেন বাবু।

স্কুলের পড়া। প্রথমে বাংলা, ইংরেজি পড়া শেষ করে সামাজিক বিজ্ঞান নিয়ে বসেছে অপু। পাশের ঘরে অপুর মা রান্না করছে। পড়তে পড়তে হঠাৎ অপুর প্রশ্ন- দাদু, সমাজ বইতে লিখেছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের জন্ম হয়। কীভাবে জন্ম হয় বাংলাদেশের?

অপুর প্রশ্ন শুনে শৈলেন বাবুর একাত্তর সালের স্মৃতি মনে পড়ে গেল। তিনি মুক্তিযোদ্ধা। তাজা রক্ত, বুলেট, বুট, লাশ, রেডিওতে ভাষণ-সংবাদ, মিছিল, মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন; স্মৃতির পাতায় সবই ভেসে উঠতে লাগল। গ্রামের রমিজউদ্দীন, মেছের আলী, রণজিত একসঙ্গে যুদ্ধ করেছে তারা। মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তাদের নাম নেই। পাশের গ্রামের শহর আলী ছিল পাকিস্তানি সৈন্যদের স্থানীয় সোর্স। অথচ মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তার নাম আছে। যুদ্ধে আহত বাল্যবন্ধু লিয়াকত ভিক্ষা করে সংসার চালায়।

অপুর প্রশ্নের জবাব কি হবে? আট বছরের ছোট্ট শিশু অপু। অপু কি করে বুঝবে স্বাধীনতার ইতিহাস।

তবু শৈলেন বাবুর উত্তর- মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়, বাংলাদেশের জন্ম হয়। সেসব এখন ইতিহাস।

– দাদু, বাবাও তো তাহলে ইতিহাস।

– কেন?

– বাবা নাকি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিল। আর সে জন্যই নাকি তুমি বাবার নাম রেখেছিলে ‘বিজয়’।

বিজয়ের নামটা শুনতেই শৈলেন বাবু কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে গেলেন। হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে মরণ ছোবল ‘সিডর’-এ মারা গেছে বিজয়। শৈলেন বাবুর মতো কত পরিবার শূন্য হয়েছে এ ঝড়ে। স্বামী আছে স্ত্রী নেই, মা আছে সন্তান নেই, বাবা আছে ছেলে নেই। কত বুক খালি হয়েছে এই ঝড়ে। অপু তার ছেলের ছেলে। মাঝখানে একটা বিন্দু এখন ফাঁকা।

শৈলেন বাবু মনে মনে চিন্তা করছেন, ‘স্বাধীনতা’ আর ‘সিডর’। যুদ্ধের ক্ষত আর ঝড়ের ক্ষত। অনেক রক্ত, অনেক মৃত্যু, অনেক ধ্বংসের পরও মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু ‘সিডর’? সর্বস্বান্ত করে দিয়ে গেছে সবাইকে।

চারদিকে এখন শুধু হাহাকার। বিজয়? সৃষ্টির একটা ইতিহাসে যার জন্ম, ধ্বংসের একটা ইতিহাসে সে মিশে গেল। যে স্বাধীনতার জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি, তা কি পেয়েছি আমরা? বিজয়ের মতো বাংলাদেশও এখন যৌবনে। দেশের কর্তাব্যক্তিরা যৌবনপ্রাপ্ত এই বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ কি দিতে পেরেছেন? গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান- দেশটাকে নিয়ে যেন টানাহেঁচড়া করছে সবাই।

দাদু, কি ভাবছ?

কিছু না।

দাদু, ‘সিডর’ তাহলে বুঝি ইতিহাস হয়ে যাবে।

কোন ‘সিডর’?

-তুমি দেখোনি? ঘূর্ণিঝড়ের পর আমাদের স্কুলের যে রুমটা স্যাররা টিন দিয়ে অফিস রুম করেছেন ওই রুমে আমি একটা ক্যালেন্ডার লাগানো দেখেছি। স্যাররা বলেছেন, ওই ক্যালেন্ডারে আমাদের ও পাড়ার সিডর আর ওর মায়ের ছবি ছাপা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের রাতে ওর জন্ম। ওই ঝড়ের নামের সঙ্গে ওর নাম রেখেছে ‘সিডর’। বাংলাদেশ জন্মের মতো ওর জন্মও এখন ইতিহাস। কারা নাকি ওই রাতে ওর ছবি তুলেছিল।

শৈলেন বাবু প্রাইমারির রিটায়ার্ড শিক্ষক। ঝড়ে বিজয়কে হারিয়েছেন। ঘরখানাও উড়ে গিয়েছিল ঝড়ে। এ বছর মাঠের সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। একটা বেসরকারি সংস্থা থেকে সুদমুক্ত ঋণ নিয়ে মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই করেছেন।

অন্য সবার মতো ত্রাণের লাইনেও দাঁড়াতে সংকোচ হয় তার। অথচ বারবার ত্রাণ পাওয়া সত্ত্বেও গ্রামের কিছুসংখ্যক লোক বলছে তারা নাকি কোনো ত্রাণ পায়নি। বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছে ত্রাণের সঙ্গে জড়িত সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

মাঝে মাঝে পাশের বাজারে পরিচিত একটা ওষুধের দোকানে গিয়ে বসেন শৈলেন বাবু। বছরের প্রথম দিন ওই দোকানে দৈনিক সংবাদপত্রের ভেতর একটা ক্যালেন্ডার দেখেছিলেন তিনি। মা ও নবজাত শিশুর ছবি ছিল ওই ক্যালেন্ডারের ওপরে। কি মিষ্টি হাসি দুজনের! মহাপ্রলয়ের খলনায়ক সিডরকে বরণ করে নিচ্ছে মা ও সন্তান।

একদিকে সর্বনাশা ঝড়ে প্রাণ সংহার অন্যদিকে ধরণীতে নতুন প্রাণের স্পন্দন। ধ্বংসের আনন্দে উন্মত্ত যখন ধরণী, সৃষ্টির আনন্দে মৃত্যুভয়সহ সবকিছু তুচ্ছ করে প্রসব বেদনা ভুলে নবজাতক এক শিশুর সঙ্গে বিজয়ের হাসি হাসছে আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই নেয়া জন্মদাত্রী এক মা। অপূর্ব খেলা প্রকৃতির!

মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরলে বিজয়ের মা শেফালী বলেছিল, বিজয়ও নাকি জন্মের পর মিটিমিটি হাসত। শৈলেন বাবু তখন ভাবতেন, যুদ্ধ জয়ের হাসি বিজয়ের মুখে এসে লেগেছে। ক্যালেন্ডারের ওই ছবিটা দেখে শৈলেন বাবুর বিজয় আর ওর মায়ের কথা মনে হচ্ছিল।

মরে গিয়ে ভালো করেছে শেফালী। বিজয়ের মরণ তো ওকে দেখতে হয়নি। দুচোখ ভরে শৈলেন বাবু দেখেছেন বিজয়ের লাশ।

ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ বা ঘূর্ণিঝড় যাই হোক, এভাবেই হাজার বিজয় প্রতিনিয়ত বিদায় নিচ্ছে আবার হাজার সিডর স্বাগত জানাচ্ছে পৃথিবীকে। কালের চাকা এভাবেই ঘুরছে। সময়ের প্রতিটি কণা তাই মূল্যবান।

ধ্বংস আছে বলেই তো সৃষ্টি এত আনন্দের। সব বেদনা ভুলে যাই তাই সৃষ্টির আনন্দে।

শৈলেন বাবু ভাবছেন, বৌমা, অপু ওদের এখন কি হবে? স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে বেশিদূর লেখাপড়াও করতে পারেনি বিজয়। সরকারি কোনো চাকরিও ছিল না। নিজের পেনশনের টাকা যা পেয়েছিলেন তা দিয়ে বিজয়ের মায়ের চিকিৎসা ও বিজয়ের জন্য মাছ ধরার একটা ভালো ট্রলার ও জাল তৈরিতে সব শেষ করেছেন তিনি। শেফালী মারা গেছে বছর দুই আগে। ঘূর্ণিঝড় সিডর বিজয়ের মতো ট্রলার, জাল সব নিয়ে গেছে। আয় করার এখন আর কেউ নেই সংসারে।

ঝড়ের রাতে বিজয়ের ফিরতে দেরি দেখে শৈলেন বাবু অপুকে বলেছিলেন, রাত গভীর হলো বিজয় এখনো ফিরল না। একটু পরেই তো সকাল হয়ে যাবে। অপু তার জবাবে বলেছিল, রাত গভীর হলে সকাল কাছে আসে দাদু।

ছেলে মানুষ, ওকি জানে গভীর রাত আর সকালের দূরত্ব? এখন শৈলেন বাবুর সংসারে কেমন করে সকাল হবে সে হিসেব মেলাতে পারছেন না তিনি।

হঠাৎ অপুর মা অপুকে ডাকল, অপু, দাদুকে নিয়ে খেতে এসো।

ভাত খেতে খেতে অপু দাদুকে বলল, দাদু, এখন থেকে রোজ সকালে তোমার সঙ্গে আমিও নদীর ক‚লে যাব। নদীর ওই ভাঙন পাড়ে দাঁড়িয়ে প্রথম আলোয় ভরা নতুন বাংলাদেশকে আমি দেখব প্রতিদিন।

অপু আরো বলল, মা, দাদু- তোমরা দেখে নিও আমিও ইতিহাস হবো।

সদ্য পিতৃহারা ছেলের কথায় স্বামীহারা রিনার চোখ দুটি জলে ভরে গেল। পাছে শ্বশুর দেখে ফেলে তাই উঠে গিয়ে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল।

রিনার বেশভূষায় এখন আর চাকচিক্য নেই। সাদামাটা হয়ে গেছে তার জীবন। সে এখন বিধবা আবার পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কি হবে তার আগামী সন্তানের পিতৃপরিচয়?

বাঙালি নারীর পরম সম্পদ তার স্বামী। ‘সিডর’ রিনার সে সম্পদ ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। এক দুঃস্বপ্ন, যন্ত্রণা রাতে তাকে নির্ঘুম করে দেয়। সে এখন ক‚লহারা। তার গন্তব্য সে জানে না। অন্ধকারাচ্ছন্ন উত্তাল সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে রিনার জীবন ও সংসার।

অপুকে ভর্তি করতে একদিন স্কুলে গিয়েছিল রিনা। ক্যালেন্ডারের ওই ছবিটা রিনাও দেখেছে। মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করেছে- যে ঝড় তার স্বামীকে খেয়েছে, সেই ঝড়ের নামেই রিনা তার আগামী সন্তানের নাম রাখবে ‘সিডর’।

স্বামীর স্মৃতিকে সাক্ষী করে রাখতে, স্বামীর রক্ত নিংড়ানো নির্যাস ‘সিডর’ নামেই বড় হবে পৃথিবীতে।

অভিশপ্ত খলনায়ক ‘সিডর’ মহানায়ক হয়ে যায় রিনার দুচোখে। দীপ্ত শপথে আঁধারেও তার চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে ওঠে।

অপুর ডাকে স্বাভাবিক হয় রিনা। চোখ মুছে অপুর পাশে এসে বসে সে।

ঘুমোতে গিয়ে শৈলেন বাবু ভাবলেন- একটা ক্যালেন্ডার, একটা ছবি একটা সুন্দর স্বপ্ন তৈরি করতে পারে। কোনো কোনো মনে দাগ কাটতে পারে। আমার অপুও তাই।

শৈলেন বাবু বিড়বিড় করে বললেন, সিডর, অপু প্রার্থনা করি- তোমরা বড় হও।

:: বটিয়াঘাটা, খুলনা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj