ভুলের উপলব্ধি

শনিবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সুজন সাজু

ঘরের রেলিং ধরে আনমনা দাঁড়িয়ে আছে চৈতি। বাইরে মেঘলা আকাশ। সূর্যটাও হয়তো আজকে ছুটিতে আছে। তাই দেখা মেলা ভার। ঘড়ির কাঁটা বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যার দিকে ছুটছে। মেঘের যা অবস্থা, নীরব রজনীতে নেমে আসার সম্ভাবনা প্রবল বৃষ্টির। আকাশে মেঘের অবস্থা যেমন চৈতির মনের অবস্থাও তথৈবচ। গতকালের কলেজের একটি ঘটনা বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কেন যে এমন মানুষের হৃদয়, তা উপলব্ধিতে আসছে না।

সময়টা আসলে এমনি।

দুনিয়াটা যেন ভূগোলের উল্টো দিকে ঘুরছে? না হলে মানুষ ক্যামনে তার স্বকীয়তা বলতে কিছু রাখে না। নিজের স্বার্থ ছাড়া যেন সবই তুচ্ছ, ভাবতে অবাক লাগে।

চৈতির স্কুল জীবন থেকেই সজীবের সঙ্গে বন্ধুত্ব। রাগ অনুরাগের কোনো বিষয় সামনে এলে দুজনেই হাসি তামাশার ছলে মোকাবেলা করে মিটিয়ে ফেলত।

কিন্তু গতকালের সামান্য তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে অন্য বান্ধবীদের সম্মুখে এভাবে হেয় করে সজীব যে ভাষাগুলো ব্যবহার করেছে, তাতে চৈতি ভীষণ অপমানিত বোধ করছে। অথচ এ ধরনের ভাষা শুনতে চৈতি অভ্যস্ত নয়।

যদিও একান্ত বলার ইচ্ছে থাকত, তাহলে কোনো নির্জনে ডেকে নিয়ে বলতে পারত সজীব। বান্ধবীদের সামনে লজ্জা পেতে হতো না তাকে। এটাই যেন ভাবাচ্ছে বারবার। কেন না ঘটনাটির সঙ্গে চৈতির বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই। কোথাকার আবর্জনা কোথায় এনে ঢালছে সজীব এটাই মাথায় আসছে না চৈতির।

চৈতি নিজেও জানে না ঘটনার সূত্রপাত কোত্থেকে, কেনই বা ঘটল। অথচ ভুল বুঝে ঘটনার পুরো দায়ভার ছাপিয়ে দিচ্ছে চৈতির ওপর। সজীব বুঝতেই চাইনি এতে চৈতির যোগসূত্র আসলেই রয়েছে কিনা?

শুধু শুধু অন্ধের ন্যায় ঢিল ছুড়ে দিল সব দোষ যেন চৈতির। প্রতিটা মানুষের উচিত কারো ওপর ক্ষ্যাপার আগে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা। যাচাই না করে ক্ষ্যাপার মানে অতি অন্যায় স্বরূপ। এমন ভুল প্রায় লোকে করে থাকে হর হামেশা। যখন নিজের ভুল নিজের উপলব্ধিতে ধরা দেয়, তখন গড়িয়ে যায় অনেক কাদা পানি। যেই কাদায় দাগ পড়ে যায় মন নামক বস্তুটির ওপর।

পরবর্তী হাজারো সার্ফ এক্সেল দিয়েও পরিষ্কার করা দুরূহ হয়ে ওঠে। এখন চৈতির মনে যে দাগটা সজীব এঁকে দিল, অই দাগের নীল বিষেই পোড়াচ্ছে চৈতিকে। কীভাবে তাড়াবে লেগে থাকা মনের দাগটি, অহর্নিশ ভাবনায় মশগুল চৈতি। পন্থা তাকে বের করতেই হবে, এই প্রতিজ্ঞায় অনড় চৈতি। সেই চাইলে সজীকেও অপমান করতে পারত। কিন্তু করেনি।

বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার সহজ সরল মনটি। যার ভুল সেই হয়তো একদিন বুঝবে। এরই মধ্যে দিন কয়েক গত হয়ে গেল। বিষটির নিখুঁত কাহিনী আগে জানতে হবে। তারপরই মুখোমুখি হবে সজীবের। অনেক কান কথা ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে, তাতে কর্ণপাত করছে না চৈতি।

কলেজে যাচ্ছে ঠিকই। আগের মতো বান্ধবীদের সঙ্গে হাসি ঠাট্টা এড়িয়ে চলছে চৈতি। বিষয়টা নিজের অনুভূতির মধ্যে আবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট। বান্ধবীরা বিষয়টা জানলেও পুনরায় কারো সঙ্গে শেয়ার করার মন মানসিকতা নেই। তবে ধীরে ধীরে বিষয়টার মূলোৎপাটন করার বাসনা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে মনের গহিনে।

বান্ধবীরা আগের চঞ্চলতা সময়ের ফেরে এখন দেখতে পায় না চৈতির চালচলনে। কেমন যেন গাম্ভীর্য ভাব মনে প্রাণে। ভাবছে অতি বিশ্বাসের ফল কি সজীব এভাবে দিল? এখানে হয়তো কারো কোনো ইশারা কাজ করেছে। না হলে সজীব এমন আচরণ করার মতো ছেলে নয়। ঘটনার পর থেকে সজীব ও চৈতি সামনা সামনি হয়নি একবারো।

তাহলে সজীব কি নিজের ভুল বুঝতে পারছে? ভুল বুঝতে পারলে কেন চৈতির সামনে এসে অনুশোচনা প্রকাশ করছে না? একদিন কলেজ থেকে ফেরার সময় সীমা নামের বান্ধবী পেছন থেকে ডাক দেয়, থমকে দাঁড়ায় চৈতি। কাছে আসতেই সীমা জানালো তোকে খবরটা দিতে ডাকলাম, কী খবর জানতে চায় চৈতি? না, সজীব ভাই তোর সঙ্গে পুনরায় কথা বলতে চায়।

তুই কখন সময় দিবি বল? সজীব ভাইকে জানাতে হবে খবরটা। চৈতি ভাবনায় পড়ে গেল। তাহলে সজীব ভুল বুঝতে পারল। ঠিক আছে পরে জানাব বলে নির্দিষ্ট সময় জানায়নি। যদিও সীমা খুব করে চাইল সময়টা জানতে।

ভাবনায় ঘুরপাক খাচ্ছে চৈতির মন। সত্যি কী সজীব অনুশোচনা করবে, নাকি কাহিনীর ডালপালা আরো ছড়াবে, এটাই ভাবছে চৈতি। দেখা করার আগে চৈতিরও কিছু প্রশ্নের উত্তর জেনে নিতে হবে, কেননা সজীব যদি উল্টো প্রশ্ন করে বসে তাহলে উত্তরগুলো দেয়া যাবে তখন।

পরদিন বান্ধবীর সঙ্গে দেখা হলে চৈতি জানতে চায়, কেন সজীব দেখা করতে আগ্রহী, কোন মতলবে? বান্ধবী জানায় তোমার সঙ্গে অইদিন যা করেছে সজীব ভুল করেছে, তা নিয়েই নিজের কাছে অপরাধী বলে উপলব্ধি করতে পেরেছে। হয়তো তোমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করবে। এমন সময় উল্টো দিক থেকে মোটরসাইকেলযোগে দুই বান্ধবীর সামনে এসে দাঁড়াল সজীব।

অনুশোচনার সুরে বলল, চৈতি আমি যা করেছি ভুল করেছি, বন্ধু হিসেবে আমি তোমার কাছে ভীষণ লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী। আসলে অন্যের কথায় তোমাকে ভুল বুঝেছি। যাতে তোমার কোনো সংশ্লিষ্ট ছিল না। চৈতি মুখে কিছু না বললেও মাথা নেড়ে সম্মতি সূচক জবাব দিল। যাক সজীব নিজের ভুল বুঝতে পারল। এতেই সান্ত¡না খুঁজে নিল চৈতি।

:: বোয়ালখালী

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj