এক যে ছিল ইঁদুর ছানা

শনিবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মূল গল্প : পল চ’য়ে

অনুবাদ : আল ফাতাহ মামুন

এক দেশে ছিল এক ছোট্ট ইঁদুর। একটি গাছ। গাছের নিচে ছোট্ট একটি গর্ত। এ গর্তেই ইঁদুর ছানার জন্ম। শৈশবের দিনগুলো হেসে-খেলে নেচে-গেয়ে এ গর্তেই কাটিয়ে দেয় সে।

একদিন হঠাৎ ইঁদুর ছানার মনে প্রশ্ন জাগে, আমি কে? আমি কী? কেন আমি এ পৃথিবীতে এসেছি? এই ছোট্ট গর্তে ধুঁকে ধুঁকে মরার জন্যই কী আমার জন্ম হয়েছে? না। না। এভাবে তো জীবন চলে না। আমাকে বড় হতে হবে। বড়দের সঙ্গে মিশতে হবে। ঘুরে দেখতে হবে বিশাল এই পৃথিবীকে।

যেই ভাবা সেই কাজ। সঙ্গে সঙ্গে একটি ছোট্ট ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রওনা হয়েছে পৃথিবী ভ্রমণে।

মিশন বড় হওয়া।

এর আগে কখনো গর্ত থেকে বেরোয়নি ইঁদুর ছানা। এই প্রথম খোলা আকাশের নিচে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার পর মনে হলো- বাহ! পৃথিবী তো দারুণ সুন্দর। ইশ! কেন যে আরো আগে বেরোলাম না। তাহলে তো আরো আগেই পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে পেতাম।

সকাল থেকে সন্ধ্যা।

সন্ধ্যা থেকে আবার সকাল।

টুক টুক করে হেঁটে চলছে ইঁদুর ছানা।

কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ইঁদুর ছানার হেঁটে চলার দৃশ্য যদি তুমি দেখতে, তাহলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে। কী যে ভালো দেখাচ্ছিল না ইঁদুর বাবুটিকে- বলে বোঝাতে পারব না।

আরো দু’দিন বিরতিহীন হাঁটার পর একটি চিরিয়াখানার সামনে এসে থামল ইঁদুর ছানা।

সুড়–ৎ করে চিড়িয়াখানার বাগানে ঢুকে পড়ল। কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে হালকা নাস্তা করে নেয়। এবার শুরু হলো মিশন চিরিয়াখানা দেখা।

এ বাবা! এত বড় চিড়িয়াখানা? ইয়া বড় বড় পশু-পাখি। আমি তো ওদের মতোই হতে চাই। ওই যে দাড়িঅলা পশুটি, কেমন ঘো ঘো করছে; তার কাছেই যাই।

হ্যালো মিস্টার…

আই এম লায়ন। দ্য কিং অব ফরেস্ট। বনের রাজা সিংহ আমি।

ইঁদুর ছানা একটু ভয় পেয়ে যাই। মনে মনে বলে, যা ব্বাবাহ! প্রথমেই রাজা মশায়ের সামনে এসে পড়লাম! তাতে কী? আমি তো বড় হতে চাই। না হয় রাজা মশায়ের মতোই বড় হলাম।

মহারাজা! আমার একটি ইচ্ছা আছে।

কী ইচ্ছে বলো বৎস।

দূর থেকে দেখছিলাম কী গর্জনই না আপনি দিচ্ছেন। ভয়ে আপনার আশপাশেও ভিড়তে সাহস পায় না কেউ।

হ্যাঁ! তুমি ঠিকই দেখেছ। বনে থাকার সময় আমার গর্জন শুনে থর থর করে কাঁপেনি এমন একটি প্রাণীও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আমি আপনার মতো বড় হতে চাই। ঘো ঘো করে গর্জন করে কাঁপন ধরিয়ে দিতে চাই সবার মনে। এক দমে বলে ফেলে ছোট্ট ইঁদুর।

হা হা হা। হো হো হো। তুমি আমার মতো বড় হতে চাও। আমার মতো আকাশ ফাটানো গর্জন তুলতে চাও? তোমার গলা থেকে তো চিঁ চিঁ ছাড়া আর কোনো আওয়াজই বেরোয় না। আমার মতো ভয়ঙ্কর চেহারা ও মাসল বডি কোথায় পাবে তুমি? বৎস! তুমি বোধহয় পাগল হয়ে গেছো? জানে বাঁচতে চাইলে এখনই পালাও। নয়তো জলখাবারটা তোমাকে দিয়েই সারব।

এবার সত্যি ভয় পেয়ে যায় ইঁদুর ছানা। কোনো মতে পালিয়ে বাঁচে। ছোট্ট ইঁদুর শুনতে পায়, সিংহ রাজা এখনো হাসছে। নিজেকে নিজেই শাসাল। বলল, কী বোকামিটাই না করে ফেললাম। সিংহের মতো বড় হতে চেয়েছি। এটা কী সম্ভব? কোথায় রাজামশাই আর কোথায় আমি!

২.

ঘুরতে ঘুরতে চলে এল জিরাফের কাছে। ইয়া লম্বা গলা। যেন গলা দিয়েই আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে। হ্যাঁ! আমি জিরাফের মতো বড় হতে চাই। বলল ইঁদুর ছানা।

হ্যালো জিরাফ আংকেল!

হায় ইঁদুর ছানা! কেমন আছো খোকা!

বেশ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো আংকেল।

আমিও খুব ভালো আছি। আংকেল! তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে?

কী বিষয়ে বল তো?

আমি তোমার মতো বড় হতে চাই। ইয়া লম্বা গলা দিয়ে আকাশের মেঘ ছোঁব।

ইঁদুর ছানার কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য থমকে যায় জিরাফ। ছোকড়াটা বলে কী? আমার মতো গলা চায়? বড় হতে চায়?

কিন্তু খোকা! তুমি তো অতি ক্ষুদ্র একটা প্রাণী। আমার মতো বড় হবে কী করে- বলল জিরাফ।

এই যে দেখুন না আমার গলাটাও কত্ত বড়- বলেই যতটা সম্ভব ঘাড় থেকে টেনে গলাকে লম্বা করা চেষ্টা করল।

এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না জিরাফ। হো হো হো করে হেসে ফেলল। কী ভয়ঙ্কর হাসি। হাসি শুনেই ইঁদুর ছানা বুঝে ফেলল- এটাও সম্ভব নয়।

দারুণ মন খারাপ নিয়ে ইঁদুর ছানা এল ঈগলের কাছে।

হায় ঈগল আন্টি!

হায় বাবুটি।

আন্টি আমি তোমার মতো উড়তে চাই। সিংহ রাজা আর জিরাফ আংকেল বলেছে আমি নাকি তাদের মতো বড় হতে পারব না। তুমি কিন্তু ওদের মতো আমাকে না করতে পারবে না।

তুমি উড়তে চাও বাবু?

হ্যাঁ! এই দেখ না আমি উড়তে পারি- বলেই দু হাত দুদিকে মেলে একবার ডানে একবার বামে লাফাতে শুরু করল ইঁদুর ছানা।

এবার সত্যিই অসম্ভব হাসি পেল ঈগলের। ঈগলের হাসি দেখে ইঁদুর ছানা বুঝে গেল, নাহ, সে ঈগরের মতোও বড় হতে পারবে না। পারবে না বিশাল আকাশে ডানা মেলে ভেসে থাকতে।

চরম কষ্ট নিয়ে পরম অপমান হয়ে ইঁদুর ছানা ফিরে এল চিরিয়াখানার বাগানে। নিজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখনো সিংহ রাজা, জিরাফ আংকেল আর ঈগল আন্টি আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে হেসেই যাচ্ছে।

এমন সময় চিরিয়াখানায় ঢুকল একদল মানুষ। তারা ইয়া বড় বড় যন্ত্র দিয়ে গপাগপ করে সিংহ, জিরাফ আর ঈগল পাখিকে বন্দি করে ফেলল।

খাঁচায় ঢুকিয়ে বড় বড় তালা ঝুলিয়ে দিল গেট আটকে।

ইঁদুর ছানা একজনকে জিজ্ঞেস করল- ওদের খাঁচায় পুরলে কেন?

লোকটি বলল, এখন চিরিয়াখানা বন্ধ করে দেব।

একটু পরই সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমে আসবে। আর রাতে পশুদের বাইরে থাকার নিয়ম নেই।

ইঁদুর ছানা দেখল, সবার চোখে-মুখে দারুণ বিরক্তির ছাপ। যেন খাঁচায় বন্দি হয়ে খুশি নয় পশু-পাখিরা।

তাহলে আমাকেও খাঁচায় ঢোকাও- ইঁদুর ছানা বলল লোকটিকে।

আমাদের খাঁচা শুধু বড়দের জন্য। তোমার মতো ছোট প্রাণীদের জন্য নয়।

বলেই লোকটি চলে গেল।

ইঁদুরও যাওয়ার জন্য টুক টুক পায়ে এগিয়ে চলল। ইঁদুরের মন খারাপ চেহারা দেখে খাঁচার ভেতর থেকে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সবাই। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়া অবস্থা। এ ওর গায়ে পড়ে। ও এর গায়ে পড়ে।

কী হচ্ছে ভালো করে দেখার জন্য থমকে দাঁড়ায় ইদুর ছানা। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা নিচে নামিয়ে রাখে। তখনো হেসেই চলছে সবাই।

এবার ইঁদুর ছানা হো হো হো করে হেসে তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে শুরু করল। একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে সুড়–ৎ করে দৌড় দেয়।

সিংহের খাঁচায় ঢুকে আবার পড়িমড়ি করে জিরাফের খাঁচায় দৌড়। চোখের পলকেই ঢুকে যায় ঈগলের খাঁচায়।

ইঁদুর ছানার হঠাৎ দৌড়-খেলা দেখে সবাই তো অবাক। হাসি বন্ধ করে হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে ইঁদুর ছানার দিকে।

অনেকক্ষণ পর ইঁদুর ছানা কাঁধে ব্যাগ ঝোলাতে ঝোলাতে বলল- শুনে রাখো! আমি ছোট বলে তোমরা সবাই হাসাহাসি করছিলে।

দেখ, ছোট বলেই আজ আমাকে তোমাদের মতো খাঁচায় বন্দি থাকতে হয়নি। যখন-তখন যেখানে খুশি যেতে পারি। তাই আমার এই ছোট্ট আমাকে নিয়েই আমি মহাসুখী। বলেই বাড়ির পথে হাঁটা ধরল ইঁদুর ছানা।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj