রাজনীতিতে কে আসে, কে যায়

শনিবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮


ইদানীং বাংলাদেশের রাজনীতিতে গরম কথাবার্তা একটু বেশি বলাবলি হচ্ছে। তা রাজনীতিতে নরম-গরম কথাবার্তা তো হয়েই থাকে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময়টায়। ন্যূনতম শালীনতা এবং রাজনীতির ব্যাকরণ মেনে কথাবার্তা বললে আপত্তির কোনো হেতু নেই। বলা যেতেই পারে। রাজনীতি তাতে বরং প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং রাজনীতির পক্ষ-প্রতিপক্ষ যেমনই হোক, জনগণ তাতে উপকৃত হয়।

কিন্তু ইদানীং রাজনীতিতে বলাবলি যা হচ্ছে তা মোটেও রাজনীতিসম্মত নয়। উদাহরণ হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজার প্রসঙ্গ টানা যেতে পারে। অল্প সময়ের জন্য তিনি পার্লামেন্ট কর্তৃক রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তারপর দেখা গেল ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং পার্লামেন্টে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপি, দুই-ই রেগেমেগে রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজাকে পার্লামেন্টে অভিশংসিত করলেন। ব্যস, হয়ে গেল! বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি থেকে হয়ে গেলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি।

ভেতরে একটা মুখরোচক গল্প যে আছে তা বলাই বাহুল্য। তবে সেদিকে আর যেতে চাই না। শুধু বলতে চাই, যে দলটি পার্লামেন্টে রাষ্ট্রপতি পদে তাকে না জায়েজ করে দিয়েছিল, সেই দলটির সঙ্গে ঐক্যবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য তার এখন আপ্রাণ চেষ্টা চলছে।

চলুক। তাতে গাছের একটা পাতাও কাঁপবে না। তার রাজনীতি অন্তপ্রাণ এক পুত্র আছেন, কিন্তু রাজনীতিতে যা জরুরি সেই রাজনৈতিক সংগঠন প্রায় শূন্য অবস্থায় আছে। হেল-দোল নেই। এহেন রাজনৈতিক সংগঠন দিয়ে একটা শেয়ালও মারা যাবে না, নির্বাচনে জেতা তো দূর অস্ত। সেই স্বল্প স্থায়ী, সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেন কিনা এটাই ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের শেষ বছর।

এ ধরনের কথা বলার পেছনে সত্য না থাকুক, একটা রাজনৈতিক চালবাজি যে আছে তা অনেকটা নিশ্চিত করে বলা যায়। নির্বাচনে কে হারবে কে জিতবে তা বুঝা যায় রাজনীতিতে দলগত অর্জন দেখে। যে দলটি সাড়ে ন’বছর থেকে ক্ষমতায় আছে, বলতে গেলে দরিদ্র ও নানাবিধ সমস্যার একটা দেশকে এলডিসির পর্যায় থেকে নি¤œ-মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করেছে, নির্বাচনে সেই দলটি জনগণের সমর্থন পাবে না, জনগণের সমর্থন পাবে বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি চালু করা, হত্যা ও দুর্নীতির শিরোমণি একটি দল, তা বিশ^াসযোগ্য উক্তি নয়।

হ্যাঁ, বদরুদ্দোজা ও ড. কামাল হোসেন দেশে ‘হারানো গণতন্ত্র’ আকার ফিরিয়ে আনতে চান। ড. কামাল হোসেন দেশের জনগণ গণতন্ত্র চায় বলে জাতির বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। জাতির বিবেক হওয়ারও একটি যোগ্যতা আছে। ড. কামাল হোসেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন আইনজীবী বটে। সেটা তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা। দেশের রাজনীতিতে তার এমন কোনো অবদান নেই যাতে তাকে জাতির বিবেক বলা দূরে থাক, জাতীয় নেতার স্বীকৃতি দেয়া যায়। তাকে কেউ কেউ বলেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা। সংবিধান প্রণয়নে যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, তিনি সেই কমিটিতে ছিলেন বটে, সংবিধান প্রণয়নে তার অবদান অনস্বীকার্য। তবে সংবিধান কমিটিতে আরো যারা ছিলেন, যেমন অর্থনীতিবিদ ড. আনিসুর রহমান, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখ ব্যক্তিদের সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা কি কিছু গৌণ ছিল? ড. কামাল হোসেন আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেকের চেয়ে এগিয়ে আছেন। এই যোগাযোগ রাষ্ট্রের উত্তরণে যেমন ভূমিকা রাখতে পারে, রাষ্ট্র পতনের ষড়যন্ত্রেও ব্যবহার করা যায়। তবে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের ট্র্যাকে উঠে গেছে। ক্রমে ক্রমে অগ্রসর হচ্ছে মধ্যম আয়ের দেশে। সারা বিশে^ শেখ হাসিনার ইমেজ এখন উজ্জ্বল। বহুদলীয় এবং সফল রাষ্ট্রনেতা হিসেবে তার স্বীকৃতি এখন বিশ^ময়।

যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভেতরে ও বাইরে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, বাংলাদেশের নির্বাচন ঠেকাতে নানামুখী কর্মতৎপরতায় লিপ্ত। তবে ওয়াকেবহাল মহলের মতে শেষ পর্যন্ত ধরা খাবেন তারাই। ধরা খাবেন এজন্য যে তারা না জাতির বিবেক, না গণতন্ত্রী! জাতীয় ঐক্য নিয়েও নানা রকম কর্মতৎপরতা চলছে। যেসব দল বিএনপি আহূত এই ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনীতির এক ধরনের জুয়াখেলা খেলছে, সেসব দলের নেতা বেশি, সংগঠন প্রায় নেই বললে হয়। অনুমান করা যায়, দুজন বড় নেতা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে খুব বলবেন, বলবেন দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নেই, সরকার স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ চালাচ্ছে- এরকম হতে দেয়া যায় না- ইত্যাদি ইত্যাদি। সভা-সমাবেশে এ ধরনের বক্তৃতা দিয়ে কিছু হাততালি তো পাওয়াই যাবে। সন্দেহ নেই।

তবে বিএনপি কিংবা ঐক্য চিহ্নিত বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও কামাল হোসেন আন্দোলনের দল বা ব্যক্তি নন। ১৪ দল তার প্রতিপক্ষকে আন্দোলন কীভাবে করতে হয় তা শেখাতে পারে। নির্বাচন ঠেকাতে প্রাণপণ চেষ্টা করতে পারে বিএনপি এবং ঐক্য প্রক্রিয়ার ছোট দলগুলো। মুখে গণতন্ত্র, বগলে ইট। বিএনপি ও ঐক্য দলের কাছে নাশকতাই আন্দোলন। গ্রেনেড হামলাই গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা। স্বাধীনতা পক্ষের শক্তিকে এখানেই সঠিক মোকাবেলার নানামুখী প্রস্তুতি রাখতে হবে।

বিএনপি এবং অবশ্যই ঐক্য প্রক্রিয়ার দুই নেতা মনে করেন বিএনপি-জামায়াত তথা ২০ দলীয় জোট যাতে জিততে পারে, সম্ভাব্য সংলাপে সেই চেষ্টা করতে হবে। আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল ওবায়দুল কাদের অবশ্য স্পষ্ট করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, নির্বাচনের আগে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে সংলাপে বসার কোনো সুযোগ-অবকাশ নেই। ওবায়দুল কাদের আরো বলেছেন, নির্বাচনে কারা আসবেন, কারা আসবেন না, নির্বাচন বয়কট করবেন, সেই দল বা জোট-বিশেষের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে যথাসময় সংবিধান মোতাবেক। এতে কোনো হেরফের হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বিএনপির হাতে এক সময় অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হওয়া- বর্তমানে বিএনপির মহাহিতৈষী ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, দশ বছর তো ক্ষমতায় থাকলেন, আর কত? এবার বিদেয় হোন।

কথাটা শুনে খুব একটা বিস্মিত হইনি। ডাক্তার চৌধুরী রাজনৈতিক পরিবারের লোক বটে। তবে তার রাজনীতি তো বরাবর স্বৈরাচারীদের সঙ্গে বিএনপির জন্মদাতা জিয়াউর রহমানের কাছে তার রাজনীতির শিক্ষা-দীক্ষা। বিএনপির প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল বটে। তিনি যে রাজনীতি নিয়ে অরাজনৈতিকসুলভ কথাবার্তা বলবেন, এতে খুব একটা বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। দেশ শাসন কারা বা কোন দল করবে, সংবিধান মোতাবেক অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে তা জনগণ নির্ধারণ করবেন। ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী কোন দল বা জোট কতদিন দেশ শাসন করবে, তা বলার কে? এই ধরনের বক্তব্য তার স্বৈরাচারী মানসিকতাই তুলে ধরে। আবার তিনি বলেন, ক্ষমতায় এটাই আওয়ামী লীগের শেষ বছর!

আওয়ামী লীগ ক্যু বা ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতায় আসেনি। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিয়ে যারা বড় বড় কথা বলেন, তাদের তো জানা থাকার কথা যে কী প্রতিক‚ল পরিবেশের মধ্যে মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল। ছদ্মবেশী গণতন্ত্রীরা কি জানেন না ছ’দফার সঙ্গে সামান্য কমপ্রোমাইজ করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন? কিন্তু বঙ্গবন্ধু জনগণের সঙ্গে কোনোদিন বিশ্বাস ঘাতকতা করেননি। জীবনের প্রায় অর্ধেকটা সময় জেলে কাটিয়েছেন। আওয়ামী লীগকে জনগণের দলে পরিণত করেছিলেন তিনি এবং তার দলের নেতারা। সেই দল দেশ শাসনের দায়িত্বে থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সাত শতাংশেরও বেশি উন্নয়ন-প্রবৃদ্ধি নিয়ে দ্রুত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। দেশের গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষ সেটা জানে। ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী, স্বৈরাচারের সেক্রেটারি জেনারেল আওয়ামী লীগকে বিদায়ের রাস্তা দেখিয়ে দেয়ার কে?

তার মনে রাখা উচিত আওয়ামী লীগ বিএনপি নয়। দল হিসেবে বিএনপিও আওয়ামী লীগ নয়। নির্বাচনে জিতে বিএনপি ক্ষমতায় যায়। আর নির্বাচন জিতে আওয়ামী লীগ পায় দেশ পরিচালনার দায়িত্ব। এই পার্থক্যটা দুই দলের মধ্যে ছিল, আছে এবং হয়তো থাকবে।

আর গণতন্ত্র নিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, কখনো কখনো সংবিধানের দোহাই দিয়ে যা বলা হচ্ছে, তা এক ধরনের মিথ্যাচার বললেও বোধহয় বেশি বলা হয় না। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার গত সাড়ে ন’বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট যতœবান। দুষ্কৃতকারী যে দলেরই হোক, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার বা তাদের ওপর আইনের প্রয়োগ হচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত কিংবা অন্য আমলে আমরা এটা দেখিনি। মির্জা ফখরুল ইসলাম প্রায়ই বলেন, রাষ্ট্রীয় এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বর্তমান সরকার নাকি নির্বিবাদে ভেঙে ফেলছে। রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ পূর্ণতা ও কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে হয়তো আগামীতে যথেষ্ট সময় লাগবে। তবে ভাঙার কাজটা করতে শুরু করেছিল বিএনপি-জামায়াত, আওয়ামী লীগ নয়। মির্জা ফখরুল কথাটা প্রায় ঠিকই বলেছিলেন, শুধু নিজেদের কাণ্ড-কীর্তি আড়াল করাটা স্বীকার করেননি।

আমরা জানি বিএনপি-জামায়াত এবং বিএনপি ভাবাপন্ন লোকজন মনে করেন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কিংবা অন্য কৌশলে বিএনপির ক্ষমতায় আসার অর্থ গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন। গণতন্ত্রের জয়। কথাটা সত্য নয়। বরং রাজনীতির যত দূরে হবে বিএনপির অবস্থান, দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য ততই মঙ্গল।

রাহাত খান : প্রবীণ সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj