বন্যাজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা ও স্বাস্থ্যগত সতর্কতা

শুক্রবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বর্ষা এবং বন্যা বাংলাদেশের ঋতু বৈচিত্র্যের বেশ উপভোগ্য অংশ হলেও এ সময়ে দেখা দিতে পারে বেশ কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি। তাই এ সময়ে সবার প্রয়োজন বিশেষ স্বাস্থ্যগত সতর্কতা।

পানির সঙ্গে স্বাস্থ্য নিবিড়ভাবে জড়িত। বন্যাকবলিত এলাকায় মানুষের জন্য নিরাপদ পানির সরবরাহ ব্যবস্থা বিনষ্ট হয়। এ সময় বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবসহ নানাবিধ পানিবাহিত রোগব্যাধি দেখা দেয়। দূষিত পানির মাধ্যমে ডায়রিয়া, জন্ডিস বিশেষ করে ভাইরাল হেপাটাইটিস এ এবং ই, পোলিওমাইলাইটিস, কলেরা, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, বিভিন্ন ধরনের আমাশয়, কৃমি এবং চর্মরোগ ছড়ায়। কীটপতঙ্গ যেমন মশা, মাছির বিস্তার লাভ করে এবং রোগ জীবাণু ছড়ায়। সময়মতো ব্যবস্থা নিতে না পারলে কিংবা পূর্ব সতর্কতা অবলম্বন না করলে কোনো কোনো রোগ মহামারির আকার ধারণ করতে পারে। তাই বন্যাকালীন পানীয় হিসেবে এবং ব্যবহারের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

যেসব টিউবওয়েল পানিতে ডুবে যায়নি সেগুলো থেকে পানি সংগ্রহ করতে হবে। সে রকম কোনো পানির উৎস না পাওয়া গেলে পানিকে ফুটিয়ে কিংবা ক্লোরিন ট্যাবলেটের মাধ্যমে পরিশোধিত করে নিতে হবে। প্রথমে সংগৃহীত পানিকে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ছেঁকে নিতে হবে। তারপর ছেঁকে নেয়া পানিকে ফুটাতে হবে। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে পানি ফুটতে শুরু করার পর থেকে অন্তত ১০ মিনিট ধরে ফুটাতে হবে। এতে পানি সব ধরনের জীবাণু থেকে মুক্ত হবে। ফুটানো পানিকে একই পাত্রে সংরক্ষণ করে পান করতে হবে। ফুটানো পানির স্বাদের কিছুটা পরিবর্তন হলেও তা ক্ষতিকর নয়।

বন্যার সময় পানি বিশুদ্ধ করার আরেকটি উপায় হচ্ছে ক্লোরিন ট্যাবলেট। আমাদের দেশে হ্যালোজেন নামে ০.৫ গ্রাম বা ৫০০ মিলিগ্রামের ক্লোরিন ট্যাবলেট পাওয়া যায়। বন্যায় সময় সরকারি ব্যবস্থাপনায় এ ট্যাবলেট সরবরাহ করা হয়। প্রথমে সংগৃহীত পানিকে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ছেঁকে একটি পরিষ্কার পাত্রে নিতে হবে। পরে তাতে ক্লোরিন ট্যাবলেট দিয়ে আধ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। ০.৫ গ্রামের একটি ক্লোরিন ট্যাবলেট ২০ লিটার পানিকে বিশুদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট। মনে রাখতে হবে শুধু পানীয় হিসেবে নয় অন্যান্য কাজের জন্যও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে হবে। এ সময় ব্যক্তিগত ও পারিপার্শ্বিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। বন্যাদুর্গতদের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে হবে এবং পয়ঃনিষ্কাশনের সুবিধাদি নিশ্চিত করতে হবে।

বন্যার সময় আমাদের দেশে সাপের কামড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়। সাপের কামড়ের বিষয় বিবেচনার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে সাপের কামড়ের বিপদ সম্পর্কে মাত্রাতিরিক্ত ভীতির সঞ্চার হয়ে থাকে। তাকে আশ^স্ত করার মাধ্যমে এ ভীতি দূর করতে হবে। এ পৃথিবীতে যত ধরনের সাপ আছে তার শতকরা ৮০ ভাগই বিষহীন। আমাদের দেশের বিষধর সাপের মধ্যে গোখরো ও কোবরা উল্লেখযোগ্য। যাদের বিষধর সাপ কামড়ায় তাদের অর্ধেকের শরীরেই বিষ প্রবেশ না করার কারণে বিষক্রিয়ার কোনো লক্ষণ থাকে না। বিষধর সাপ কামড় দিলে ১ ঘণ্টার মধ্যে সাধারণত পরবর্তী সময়ে উল্লিখিত উপসর্গগুলো দেখা যেতে পারে। কামড়ের জায়গায় ব্যথা হতে পারে, বমি বা বমি বমি ভাব হতে পারে, অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে, খুব বেশি পিপাসা লাগতে পারে, কারো কারো নাড়ির গতি কমে যেতে পারে এবং রক্তচাপ কমে যেতে পারে। শরীরের ত্বকের নিচে রক্তপাতের চিহ্ন দেখা যেতে পারে। কেউ কেউ অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। বিষধর সাপের কামড় সন্দেহ করলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নড়াচড়া না করে শান্তভাবে থাকতে দিতে হবে। কামড়ের উপরের অংশে ভাঁজকরা কাপড় কিংবা সরু ফাঁপা রাবারের নল দিয়ে দ্রুত বেঁধে দিতে হবে। ক্ষতস্থান দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিষ্কার করে কিছুটা রক্ত বের করে দিতে হবে। রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পাঠিয়ে দিতে হবে।

কেউ পানিতে ডুবে গেলে প্রথমেই নাক, মুখ ও গলা পরিষ্কার করতে হবে। তারপর দেখতে হবে শ্বাস-প্রশ্বাস চলে কি না, হৃৎপিণ্ড ও নাড়ির গতি স্বাভাবিক কি না। হৃৎপিণ্ড চালু থাকলে আর শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ থাকলে রোগীর মাথার দিক নিচু করে এবং ঘাড় এক দিকে কাত করে পেটের নাভির উপরের অংশে চাপ দিয়ে পাকস্থলি থেকে পানি বের করতে হবে। তারপর সাহায্যকারী ব্যক্তির মুখ থেকে ডুবে যাওয়া ব্যক্তির মুখে শ্বাস-প্রশ্বাস দিয়ে শ্বাস ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পাঠিয়ে দিতে হবে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে মুখ থেকে মুখে শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে।

বন্যাদুর্গতদের পুষ্টি ঘাটতি এড়ানোর জন্য যথাযথ খাবার সরবরাহ করতে হবে। এ সময় শিশু, গর্ভবতী মহিলা ও বৃদ্ধদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি বন্যার সময় কারো কারো মানসিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে সবার সহমর্মিতা একান্ত প্রয়োজন। বন্যাদুর্গত এলাকায় স্বাভাবিক টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে। কোনো রোগব্যাধি বিস্তার লাভ করার আগেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বন্যা-পরবর্তী সময়ে যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ডা. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান খান

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রভাষক

কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj