ডায়াবেটিক রোগীর মানসিক স্বাস্থ্য

শুক্রবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮

শরীর ও মন উভয়ের ওপর স্বল্প কিংবা দীর্ঘমেয়াদে নানা নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টিকারী এক অন্যতম প্রধান রোগ ডায়াবেটিস। এক জরিপে দেখা যায় সারা পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। বর্তমানে বাংলাদেশে এই সংখ্যা প্রায় ৫.১ মিলিয়ন। স্বল্প কিংবা দীর্ঘমেয়াদে মানব শরীরে নানা জটিলতা সৃষ্টির পাশাপাশি মানব মনের ওপর রয়েছে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা যায় প্রতি চারজনে একজন ডায়াবেটিক রোগী হতাশায় আক্রান্ত। শতকরা ১৯.৫ ভাগ ডায়াবেটিক রোগী বিভিন্ন প্রকার উদ্বিগ্নতাজনিত সমস্যায় ভুগে থাকে।

দীর্ঘদিন সুস্থ থাকার পর হঠাৎ জীবনে ডায়াবেটিসের আবির্ভাব অনেকেই সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। স্বল্পমেয়াদে দেখা দেয় উদ্বেগ, নিরাশা। লোপ পেতে থাকে জীবনের সব কৌতূহল প্রবণতা। নিজের বিবেকের কাঠগড়ায় নিজেকে মনে হয় দোষী। মাথায় ভর করে রাজ্যের দুশ্চিন্তা। দীর্ঘমেয়াদে এই সব উপসর্গ যখন মানব মনে বাসা বাঁধে তখন দেখা দিতে পারে কোনো ঘটনা বা অবস্থা মেনে না নেয়াজনিত মানসিক সমস্যা। অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিজঅর্ডার কিংবা কোনো ক্ষেত্রে রোগ সম্পর্কে হঠাৎ তীব্র মানসিক চাপ বা উদ্বেগের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারে জীবনের সব সাজানো বাগান। রোগজনিত মানসিক আঘাত পরবর্তী সময় হঠাৎ হঠাৎ কালবৈশাখীর মতো মনোচাপ বা বেদনার আবির্ভাবে ফিকে হতে থাকে জীবনের সব রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধের অনুভূতি। ডায়াবেটিস কিংবা এর ওষুধ বিশেষত ইনসুলিন অথবা ডায়াবেটিসের স্বল্প কিংবা দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিলতা সম্পর্কে এক অজানা ভয়, রোগের চিকিৎসায় খাদ্যাভ্যাস কিংবা কাজে-কর্মে কঠোর নিয়ন্ত্রণ সর্বোপরি নিজের রোগ নিয়ন্ত্রণে নিজের দায়িত্বশীলতা প্রভৃতি কারণে দেখা দিতে পারে সার্বক্ষণিক কিংবা হঠাৎ ভীতিজনিত উদ্বেগ। কিংবা দেখা দিতে পারে ডায়াবেটিস কিংবা ইনসুলিনের প্রতি তীব্র ফোবিয়া। ডায়াবেটিসের ফলে তীব্র মনো-সামাজিক সমস্যা, এর ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকা, রোগের জটিলতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া, পুরুষদের ক্ষেত্রে ধ্বজভঙ্গতা কিংবা মহিলাদের পুনঃপুনঃ গর্ভপাত কিংবা জন্মগত ত্রুটিজনিত সন্তান প্রসব প্রভৃতি কারণে জীবনে হতাশা নেমে আসতে পারে ঘোর অমানিশার অন্ধকার হয়ে। ক্ষেত্রবিশেষে মনে হতে পারে আত্মবলিদানই এর একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত। বিরল নয় আত্মবলিদানের ঘটনাও।

নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি তীব্র আকর্ষণ কিংবা নিয়ম না মানার মানব প্রবৃত্তির এক অন্তর্নিহিত পরিণাম দৈনিক খাদ্য গ্রহণে যথাযথ নিয়ম না মানা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস কিংবা থেকে থেকে হঠাৎ অতিভোজন কিংবা অতিভোজন পরবর্তী ওজন নিয়ন্ত্রণকল্পে কঠোর প্রয়াস প্রভৃতি ডায়াবেটিস রোগীদের এক অতি সাধারণ ব্যাপার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণে দেখা দিতে পারে অতিরিক্ত খুতখুতে ভাব। চরম পর্যায়ে যার পরিণতি হতে পারে সুচিবাই গ্রস্ততা। থেকে থেকে ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে হঠাৎ গøুকোজের অতিরিক্ত হ্রাস কিংবা বৃদ্ধিতে দেখা দিতে পারে চিত্তবিভ্রম কিংবা দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিভ্রষ্টতা। কিংবা ডায়াবেটিসের জটিলতায় স্ট্রোক কিংবা হার্ট অ্যাটাক পরবর্তী পর্যায়ে হতাশা কিংবা স্মৃতিভ্রষ্টতার ঘটনাও এক অতি সাধারণ ব্যাপার। ডায়াবেটিস কিংবা এর জটিলতার তীব্র মনোবেদনা যেন মানব শরীরে বিভিন্ন অঙ্গে নানা শারীরিক উপসর্গ যেমন- ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনিভাব, হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হাত-পা জ্বালা-পোড়া প্রভৃতির ছদ্মাবরণে প্রকাশ পেতে পারে। তাছাড়া তীব্র জটিল ও দীর্ঘমেয়াদে নানা মানসিক রোগ যেমন- হতাশা, সিজোফ্রেনিয়া প্রভৃতিতে আক্রান্ত রোগীরা সাধারণ মানুষদের তুলনায় অধিক হারে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়।

মূলত ডায়াবেটিসে এসব মনোগত সমস্যার ফলে এর নিয়ন্ত্রণে দেখা যেতে পারে অতিশিথীলতা কিংবা বিরল ক্ষেত্রে অতিচিকিৎসা কিংবা কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে নানা জটিলতা যেমন- হঠাৎ রক্তে গøুকোজের মাত্রা অতিরিক্ত কমে যাওয়া। আস্থাহীনতা দেখা দিতে পারে রোগের চিকিৎসায়। বেড়ে যেতে পারে রোগীর যথাযথ ওষুধ গ্রহণ ও রোগ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতা। বেড়ে যেতে পারে ডায়াবেটিসের জটিলতা। সেই সঙ্গে ডায়াবেটিসের জটিলতাজনিত কারণে মৃতের সংখ্যা। এক জরিপে দেখা যায় আমাদের এই পাক-ভারত উপমহাদেশে বছরে প্রায় ১.২ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিসের নানা জটিলতাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করে।

সমস্যার সমাধানে :

১। সবার আগে প্রয়োজন ডায়াবেটিস এবং এর নানা মনো-শারীরিক জটিলতা সম্পর্কে যথোচিত স্বাস্থ্য শিক্ষা। কেননা রোগ ও রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে একমাত্র সঠিক স্বাস্থ্য শিক্ষাই সরিয়ে দিতে পারে ভ্রান্তির সব কালো পর্দা।

২। পরবর্তী সময়ে ডায়াবেটিসসহ এর জটিলতার চিকিৎসাসহ এর নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার এক নাতিদীর্ঘ বিবরণ।

৩। ‘জীবনে ডায়াবেটিসের আবির্ভাব’ একে মেনে নিন জীবনের অন্যান্য অবাঞ্ছিত ঘটনার মতো। যে সহে, সে রহে; তাই এর প্রতি তীব্র ভীতি বা উদ্বেগ নয়। বরং এর যথাযথ নিয়ন্ত্রণে আজই নিন একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ।

৪। অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক ডায়াবেটিসের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ কিংবা এর জটিলতা প্রশমনকল্পে যথাযথ চিকিৎসা নিন।

৫। নয় ডায়াবেটিসের অনিয়ন্ত্রণ কিংবা অতিনিয়ন্ত্রণ, চাই এর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ। সেই সঙ্গে প্রয়োজন রোগীসহ রোগীর অভিভাবককে ডায়াবেটিস ও এর চিকিৎসায় সৃষ্ট নানা জটিলতা যেমন- রক্তের গøুকোজের মাত্রা হঠাৎ অতিরিক্ত কমে যাওয়ার লক্ষণ ও এর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান।

৬। ধূমপান বিষপান। তাই আজই ধূমপান পরিহার করুন। স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ যেমন টাটকা শাকসবজি, ফলমূল ও সামুদ্রিক মাছের তেল প্রভৃতির রয়েছে মানব বুদ্ধি বৃত্তীয় প্রক্রিয়ার ওপর হিতকর প্রভাব। কাঁচা লবণ পরিহার করুন।

৭। মানসিক যাতনা দূরীকরণে মদ ও অন্যান্য মাদক সর্বদাই বর্জনীয়। কারণ স্বল্পমেয়াদে তা মনের সব উদ্বেগ, হতাশা কিংবা উৎকণ্ঠার আগুন চাপা দিয়ে রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে এই সকল সমস্যা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো ফুসে উঠতে পারে। জ্বেলে-পুড়ে তছনছ করে দিতে পারে জীবনের সব সম্ভাবনা।

৮। মানসিক সমস্যার তীব্র পর্যায়ে ওষুধ কিংবা মনোচিকিৎসার জন্য একজন মনোচিকিৎসক কিংবা মনোবিদ হতে পারে এক হিতকর পরামর্শক।

৯। একটুখানি রোগ ও রোগের উপসম কিংবা নিরাময়ের আশ্বাস মনের সাজানো বাগানে বয়ে দিতে পারে প্রশান্তির সুবাতাস।

১০। জীবনকে সর্বদাই গতিশীল ও কর্মক্ষম রাখুন। জীবনের সব নেতিবাচক চিন্তাসমূহকে প্রতিস্থাপিত করুন ইতিবাচক আশার স্ফুরণে। কেননা নেতিবাচক চিন্তার অপর দিকেই থাকতে পারে ভবিষ্যতের ইতিবাচক চিন্তার সঠিক অভিধান।

ডা. মো. কফিল উদ্দিন চৌধুরী

মেডিসিন ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj