নাক নিয়েই নানা কিছু

বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সেই যে কাঠের পুতুলের কথা মনে আছে? মিথ্যা কথা বললেই যার নাক লম্বা হয়ে যেত! ওয়াল্ট ডিজনির সৃষ্টি সেই আজব চরিত্রের নাম ছিল ‘পিনোকিও’। এই নাক নিয়েই পিনোকিওর হয়েছিল যত জ্বালা। প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে মিথ্যা বলতে গেলেই সে ধরা পড়ে যেত। তবে মানুষের ক্ষেত্রেও এমন হলে বেশ হতো। তখন মিথ্যা কথা বললেই টের পাওয়া যেত। যে যত মিথ্য বলত, তার নাক ততই লম্বা হয়ে যেত!

নাক নিয়ে আছে মানুষের নানা ভাবনা। এটি গন্ধ অনুভব করার প্রাথমিক অঙ্গ হলেও এর বাইরের সজ্জা নিয়ে আছে নানা চমক। আবার করমর্দনের মতো ‘নাসিকামর্দন’ করেও অনেক জাতি শুভেচ্ছা বিনিময় করে। উত্তর এশিয়া, আমেরিকা, নিউগিনি, ভারতের কিছু উপজাতি, মাদাগাস্কারসহ বেশ কিছু জাতির মানুষ শুভেচ্ছা বিনিময় বা প্রাথমিক সাক্ষাতে একে অপরের শরীরের গন্ধ নেয়। কেউ বা আবার নাকের সঙ্গে নাক ঘষে কুশল বিনিময়টা সারে।

মঙ্গোলীয় ও চীনের কিছু উপজাতি ভালোবাসার স্মারক হিসেবে থুঁতনিতে নাক ঠেকিয়ে নিঃশ্বাস টানে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় সামোয়া দ্বীপের অধিবাসীরা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পরপরই নাকে নাক ঘষে। ফিজি দ্বীপের উপজাতিরা উৎসব চলাকালে সঙ্গীর হাতটি নাকের কাছে টেনে এনে শুঁকতে থাকে। নিউগিনির কিছু উপজাতি প্রীতি সম্ভাষণকালে ডান হাতের তর্জনি ও বৃদ্ধাঙ্গুলি নাকে প্রবেশ করিয়ে বাম হাতের তর্জনি দিয়ে নাভির দিকে নির্দেশ করে।

নিউজিল্যান্ড ও প্রেন্ডলি দ্বীপের কিকু উপজাতি শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় দুজনের নাক একত্র করে এবং হাত দিয়ে অপরের নাকসহ মুখমণ্ডলটি স্পর্শ করে দেয়। নাকের সঙ্গে নাক স্পর্শ করে ভাব বিনিময়ের এসব প্রথা কীভাবে, কবে থেকে প্রচলিত- সেটা সঠিক করে বলা মুশকিল। তবে এরকম আচরণের নমুনা ছড়িয়ে আছে বিশ্বব্যাপী।

নাকের নানারকম সাজের রীতিও বিশ্বের নানা দেশে প্রচলিত। আমাদের দেশেও আছে এই প্রথা। বিশেষ করে মেয়েরা নাক-কান ফুটো করে নানারকম অলঙ্কার পরে। আমাদের দেশে প্রচলিত না হলেও পৃথিবীর অনেক দেশেই ছেলেরাও এরকম করে থাকে। এর পেছনে সৌন্দর্য বর্ধন, সংস্কৃতি, প্রথা বা ধর্মীয় নির্দেশনা থাকে।

অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা কোনো উৎসব উপলক্ষে নাকে কাঠ, হাড়, পাখির পালক অথবা গাছের ডাল অলঙ্কার হিসেবে পরে। নিউজিল্যান্ডের কিছু উপজাতি নাকে হাড় দিয়ে তৈরি করা আংটা পরে। নাকে হাড়ের অলঙ্কার পরে এরকম পুরুষ খুঁজে পাওয়া যাবে নিউ সাউথ ওয়েলসের উপজাতিদের মধ্যে। ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার কুরনাই উপজাতির মধ্যে দীক্ষাকরণ অনুষ্ঠানে নাক ছিদ্র করা হয়।

কিছু উপজাতির মধ্যে নাক ছিদ্র করার অর্থ হলো তান্ত্রিক বিদ্যা শেখার প্রাথমিক পর্যায় পার হওয়া।

জিপসল্যান্ডের আদিবাসীরা মনে করে, যাদের নাকে অলঙ্কারের কীলক থাকে না, তারা পরকালে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। আর ব্রিটিশ নিউগিনির মুতু উপজাতির সদস্যরা তাদের সন্তানের বয়স দুই বছর হলেই নাকে ছিদ্র করে দেয়। তারা বিশ্বাস করে, যার নাকে ফুটো নেই সে দেবতাদের অনুগ্রহ পাবে না। নাকে ছিদ্র না করে মারা গেলে মৃত্যুর পর এমন জায়গায় ঠাঁই হবে যেখানে কোনো খাদ্য নেই।

মেলেনেশিয়ান উপজাতি ‘কুইতার’রা মৃত ব্যক্তিদের নাক ফুটো করে দেয়। তারা বিশ্বাস করে এরকম করা না হলে মৃত্যুর পর তার নাসারন্ধ্র কীটপতঙ্গের আক্রমণের শিকার হবে! নিউগিনির ফ্লাই রিভার অঞ্চলে নাকে ফুটো না থাকলে ছেলেমেয়েরা বিয়ের অনুমতিই পায় না। টোরেস উপজাতির লোকেরা শিশুর বয়স পনেরো দিন হলেই নাক ছিদ্র করে দেয়। তারা মৃত আত্মীয়র খুলি সংগ্রহ করে তাতে মোমের নাক লাগিয়ে দেয়!

:: আমির খসরু সেলিম

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj