পুরনো গল্প ও নতুন স্বপ্ন

মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় দিন কোনটি- এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে যে কারো চোখে ভেসে উঠবে ১৫ বছর আগের একটি ম্যাচের কথা। সময়টা ২০০৩ সালের ২০ জানুয়ারি। ওইদিন বিকেলে নিজেদের মাঠে অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে মালদ্বীপের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। জানুয়ারির কনকনে শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে খুব কম বাংলাদেশি সমর্থক হয়তো ভেবেছিলেন সেদিনই রচিত হতে যাচ্ছে তাদের ফুটবল ইতিহাসে স্বর্ণালি এক অধ্যায়ের। তবে কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠার পর যে কোনো দেশই স্বপ্ন দেখে শিরোপা জয়ের। মনে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখেছিল এ দেশের মানুষও। হয়তোবা এ জন্যই ফাইনাল ম্যাচটি দেখার জন্য দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় জমেছিল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে। শীতের বিকেলে খেলা দেখতে গ্যালারিতে উপস্থিত হওয়া দর্শকদের মোটেই হতাশ করেননি বাংলাদেশের ফুটবলাররা। ফাইনাল ম্যাচটিতে মালদ্বীপকে টাইব্রেকারে হারিয়ে রোমাঞ্চকর এক জয় নিয়ে প্রথমবারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ওই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ ফুটবল দলের কোচ ছিলেন জর্জ কোটান। ফাইনালের নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হয়েছিল ১-১ গোলের সমতায়। এরপর অতিরিক্ত সময়েও আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়িয়েছিল টাইব্রেকারে। সেখানে মালদ্বীপকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় জর্জ কোটানের শিষ্যরা। দক্ষিণ এশিয়ার বিশ^কাপ হিসেবে খ্যাত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতাটাই এখন পর্যন্ত ফুটবলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

আবারো বাংলাদেশের মাটিতে বসতে যাচ্ছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আসর। পাকিস্তান ও নেপালের ম্যাচ দিয়ে আজ থেকে মাঠে গড়াচ্ছে ২০১৮ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। আজ দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। যেখানে কোচ জেমি ডের শিষ্যদের প্রতিপক্ষ ভুটান। এটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ১২তম আসর। এবারের আসরে বাংলাদেশের অবস্থান ‘এ’ গ্রুপে। যেখানে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তান। অন্যদিকে গ্রুপ ‘বি’তে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারত ছাড়াও রয়েছে শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ।

২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে। স্বাগতিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও ওই আসরে বাংলাদেশের স্বপ্নটা যে খুব বড় ছিল না। কেননা এর আগে অনুষ্ঠিত আসরগুলোতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সফলতা ছিল তৃতীয় স্থান। তবে কোচ জর্জ কোটানের শিষ্যরা যেন রাতারাতি বদলে যায়। সেমিফাইনালে ভারতকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ। মালদ্বীপের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত ফাইনাল ম্যাচটির ১৩ মিনিটেই কাঞ্চনের গোলে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। তবে ম্যাচের ৫৭ মিনিটে আলি উমরের গোলে সমতায় ফেরে মালদ্বীপ। ওইদিন ভাগ্য হয়তো বাংলাদেশের পক্ষেই ছিল। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে মালদ্বীপকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতান মতিউর মুন্নারা। এটি ছিল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের পঞ্চম আসর। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ষষ্ঠ আসরেও চমক দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ওই আসরে রানার-আপ হয়েছে পঞ্চম আসরের চ্যাম্পিয়নরা। এরপর টুর্নামেন্টটির আরো ৫টি আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কোনো আসরেই ফাইনাল পর্যন্ত যেতে পারেনি বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৭ বার টুর্নামেন্টটির শিরোপা জিতেছে ভারত। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান চ্যাম্পিয়ন হয়েছে একবার করে।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের এবারের আসরকে ঘিরে বাংলাদেশের স্বপ্ন আকাশচুম্বী। কেননা এবারসহ মোট তিনবার টুর্নামেন্টটির আসর বসতে যাচ্ছে এ দেশে। এবারের আসরে খেলতে নামার আগে কোচ জেমি ডের শিষ্যদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা সদ্য শেষ হওয়া এশিয়ান গেমসের ফুটবলের দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলা। গ্রুপ পর্বে কাতারের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে এ বছর প্রথমবারের মতো এশিয়াডের দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে বাংলাদেশ।

তাই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গত তিন আসরের গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়া বাংলাদেশকে নিয়ে এবার ভালো কিছু করে দেখানোর স্বপ্ন দেখছেন কোচ জেমি ডে। এশিয়াডের দলে থাকা বেশিরভাগ ফুটবলারই রয়েছেন সাফের দলে। জেমি ডে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিততে পারিনি। তাই ছেলেদের বলেছি মাঠে নিজেদের সেরাটা দেয়ার জন্য প্রস্তুত হতে।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের এবারের আসরে জেমি ডের শিষ্যদের ভালো করার ব্যাপারে আশাবাদী বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক কোচ মারুফুল হকও। দেশের মাটিতে বাংলাদেশ অন্তত সেমিফাইনালে খেলবে বলে বিশ^াস তার। এ বিষয়ে তার অভিমত, ঘরের মাঠে খেলা, তাই অন্তত সেমিফাইনালে খেলবে বাংলাদেশ। এমনকি ফাইনালে খেললেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

২০০৩ সালে প্রথমবার যখন বাংলাদেশে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আসর বসেছিল তখন ছিল কনকনে শীত। এবার শীত নেই বরং তীব্র গরম। আবহাওয়া বদলালেও বদলায়নি স্বপ্ন। স্বপ্নের মতো পরিবর্তন আসেনি ভেন্যুতেও। ১৫ বছর আগের সেই পুরনো গল্পগুলো থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এবার নতুন ইতিহাস রচনা করবেন জামাল ভূঁইয়ারা এমনই প্রত্যাশা এ দেশের প্রতিটি মানুষের।

:: এস এম সায়েম

গ্যালারি'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj