ক্রিকেটারদের নৈতিকতা ও বিসিবির করণীয় : কামরুজ্জামান ইমন

মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ক্রিকেটাররা দেশের তরুণদের আইডল। তাদের অনেকে অনুসরণ করে। মাশরাফি, মুশফিক, সাকিব, তামিম এবং মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু উঠতি বয়সের তরুণ খেলোয়াড়রা সাফল্য পেয়ে খ্যাতির চূড়ায় উঠলেই শুরু হয় বিপথে যাওয়া। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের আগে রুবেল হোসেন থেকে শুরু করে সম্প্রতি এ তালিকায় যোগ হয়েছেন মোসাদ্দেক। বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার ব্যক্তিগত জীবনের ঝামেলায় জড়িয়ে নেতিবাচকভাবে খবরে এসেছেন। যার ফলে কলুষিত হয়েছে ক্রিকেট দলের সুনাম। গত তিন বছরে তিন ক্রিকেটারকে ফৌজদারি মামলায় যেতে হয়েছে কারাগারে। আবার কয়েক জনের বিরুদ্ধে উঠেছে নারীঘটিত কেলেঙ্কারি কিংবা স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগ। অতীতে বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার শৃঙ্খলা ভঙ্গেও কারণে শাস্তিও পেয়েছেন নানা মেয়াদে। সম্প্রতি কিছু গুরুতর অভিযোগ উঠেছে নাসির হোসেন এবং সাব্বিরের নামে। ১ সেপ্টেম্বর ডিসিপ্লিনারি কমিটির সামনে তলব করা হয় অভিযুক্ত তিন ক্রিকেটার নাসির, মোসাদ্দেক ও সাব্বির রহমানকে। নাসিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ নারী কেলেঙ্কারির এবং মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে তার স্ত্রী সামিয়া শারমিন নারী নির্যাতনের মামলা করেছেন ময়মনসিংহের আদালতে।

পায়ে আঘাত পাওয়া নাসিরের অপারেশন হয়েছে। তাই ডিসিপ্লিনারি কমিটির সামনে হাজির হতে পারেননি। নাসির উপস্থিত না হতে পারায় তার শুনানি হয়নি। তবে স্ত্রীর নারী নির্যাতনের মামলায় আলোচনায় আসা মোসাদ্দেক হোসেনকে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে শুনানি শেষে সাব্বির রহমানকে ছয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছে ডিসিপ্লিনারি কমিটি। কারণ তার বিরুদ্ধে নতুন-পুরনো মিলিয়ে অভিযোগ অনেক।

ক্রিকেটারদের নৈতিকতা সম্পর্কে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেছেন, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন তো আর বিসিবি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। বিয়ে এবং তালাক এসব বিষয়গুলো তো ব্যক্তিগত। এখানে তো বিসিবির কিছু করার নেই। কেউ যদি কাউকে ডিভোর্স করতে চায় এটা নিয়ে আমরা কি করব? আবার কেউ একাধিক বিয়ে করলে সেটাও আমাদের কিছু করার নেই। আমরা তো বলতে পারি না, ক্রিকেট যারা খেলে তারা একাধিক বিয়ে করতে পারবে না। যদি কারো কোনো দোষ খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে বিসিবি কঠোর শাস্তির পথে হাঁটবে। বিসিবি সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেলেঙ্কারিতে যুক্ত ক্রিকেটারদের ডিসিপ্লিনারি কমিটিতে ডেকে তাদের বক্তব্য নেয়া হবে এবং এরপর প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে। পাপন আরো বলেন, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমাদের বলার বেশি কিছু নেই। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হলে আমরা সর্বোচ্চ তাকে দল থেকে বাদ দিয়ে দিতে পারি। তবে তাদের এসব ব্যাপারে ট্রেনিং দেয়ার জন্য আমরা একজন সাইকোলজিস্ট (মনোবিদ) নিয়ে আসার কথা ভাবছি। যে কিনা খেলোয়াড়দের এসব ব্যাপারে ট্রেনিং দেবে। আমরা তো আমাদের ক্যাম্পে শুধু খেলায় জেতার ব্যাপারে ট্রেনিং করাই। এখন নৈতিকতার বিষয়ে কিছু করা যায় কিনা, সেটা নিয়েও কথা বলেছি। সংশ্লিষ্ট কমিটি এ ব্যাপারে যোগাযোগ শুরু করে দেবে।

মোহাম্মদ শহীদ : গত বছর জুলাইয়ের বিসিবির প্রধান নির্বাহীকে লিখিত অভিযোগ দিতে দুই সন্তান নিয়ে হাজির হয়েছিলেন পেসার শহীদের স্ত্রী। সহসাই পারিবারিক ঝামেলা মিটিয়ে যাবে বলে সেদিন মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন শহীদ। ক’দিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শহীদের নতুন বিয়ের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।

রুবেল হোসেন : পেসার রুবেল হোসেন কথা এখনো ভুলেনি ক্রীড়ামোদীরা। ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর রুবেলের বিরুদ্ধে মামলা করেন তার বান্ধবী। তার বিরুদ্ধে প্রেমের ফাঁদে ফেলে প্রতারণার অভিযোগ এনেছিলেন কথিত এক বান্ধবী। এ মামলায় ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি জেলে যেতে হয় রুবেলকে। পরে তিনি জামিন পেয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যায়।

শাহাদাত হোসেন : ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে শাহাদাত ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। তবে মামলাটি কোনো নারীঘটিত নয়। তাদের বিরুদ্ধে শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল। মামলার পর স্ত্রীকে নিয়ে কিছুদিন পালিয়ে ছিলেন শাহাদাত। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে সব ধরনের ক্রিকেটীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করে বিসিবি। ওই বছরের অক্টোবরে আত্মসমর্পণের পর তাকে জেলে যেতে হয়। ডিসেম্বরে জামিনে মুক্তি পাওয়া শাহাদাত পরে সমঝোতার মাধ্যমে মামলা থেকে অব্যাহতি পান।

আল আমিন : শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২০১৫ বিশ্বকাপের মাঝপথে আল আমিনকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ২০১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ব্রিসবেনে নিয়ম ভেঙে টিম হোটেলে ফিরেছেন রাত ১০টার পর। ২০১৬ বিপিএলে আবারো তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। বিপিএলের চট্টগ্রাম পর্বে আল আমিন কারো রুমে ঢুকছেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এটা দেখে জরিমানা করা হয় ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে চুক্তির অর্ধেক পরিমাণ অর্থ। যার পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ টাকা।

আরাফাত সানি : গত বছর জানুয়ারিতে আরাফাত সানির বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করেন তার স্ত্রী পরিচয় দেয়া এক তরুণী। এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সানিকে রিমান্ড শেষে জেলে পর্যন্ত যেতে হয়। প্রায় দুই মাস জেল খেটে জামিনে মুক্তি পেলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর ফিরতে পারেননি সানি।

নাসির হোসেন : ক্যারিয়ারে বেশ দুঃসময় যাচ্ছে নাসিরের। এর মধ্যে ক’দিন আগে ভীষণ আলোচিত হয়েছেন এক কথিত মডেল বান্ধবীর সৌজন্যে। গত জুনে সেই বান্ধবী নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে প্রকাশ করতে শুরু করলেন, শুধু সতীর্থ খেলোয়াড়রাই নয় বরং ভীষণ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যায় বিসিবি। নাসিরের বিরুদ্ধে কোনো মামলা এখনো হয়নি। তবে তার নারীসঙ্গ নিয়ে অনেক কথাই চালু রয়েছে ক্রিকেট অঙ্গনে।

মোসাদ্দেক হোসেন : মোসাদ্দেকের স্ত্রী সামিনা শারমীন ২৬ আগস্ট ময়মনসিংহের আদালতে স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুক ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেছেন। ১৬ বছর বয়সে খালাতো বোনকে বিয়ে করেছিলেন মোসাদ্দেক হোসেন। গত ১৬ আগস্ট তিনি স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়েছেন। কিন্তু স্ত্রীর পরিবারের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার পর মোসাদ্দেকের নাকি মাথা ঘুরে গেছে!

সাব্বির রহমান : ২০১৬ বিপিএলের চট্টগ্রাম পর্বে হোটেল কক্ষে নারী অতিথি নিয়ে যাওয়ার অপরাধে সাব্বিরকে ১৩ লাখ টাকা জরিমানা করে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। গত ডিসেম্বরে জাতীয় লিগের ম্যাচ চলার সময় কিশোর দর্শককে মারধরের অভিযোগে ২০ লাখ টাকা জরিমানা ও ৬ মাস ঘরোয়া ক্রিকেটে নিষেধাজ্ঞার ঘটনাটা তো আছেই। জুনে দেরাদুনে আফগানিস্তানের বিপক্ষে শেষ টি-টোয়েন্টিতে সতীর্থ মেহেদী হাসান মিরাজকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সাব্বিরের বর্তমান ফর্ম নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্য পোস্ট করেন এক ক্রিকেটপ্রেমী। সাব্বির তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে এটি পরে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এমনি অসংখ্য অভিযোগের কারণে সাব্বিরের নামের পাশে ‘ব্যাড বয়’ তকমাটা আগেই বসেছে। ক্রিকেটারদের নৈতিকতা উন্নয়নে বিসিবির অনেক কিছুই করার রয়েছে। শুধু শাস্তি দিলেই চলবে না। তাদের চরিত্র গঠনে নানা উদ্যোগ নিতে হবে। উঠতি বয়সের তরুণ খেলোয়াড়রা সাফল্য পেয়ে খ্যাতির চূড়ায় উঠলেই শুরু হয় বিপথে যাওয়া। তাদের সঠিক পথে রাখতে বিসিবির সাইকোলজিস্ট আনার সিদ্ধান্ত যে খুবই কার্যকরী একটি ব্যাপার হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

গ্যালারি'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj