৩৪ বছর সংরক্ষণেই আটকা সিডওর দুই ধারা

সোমবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

কাগজে-কলমে নারীর অধিকারের কথা স্বীকৃত হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব একটা নেই। শিক্ষায় ও কর্মক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের আসার বিষয়টি দৃশ্যমান হলেও তারা কর্মক্ষেত্রে ও সমাজজীবনে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছেন। তাই স্বাধীনতার এত বছর পরও নারীর জীবনমানের উন্নতি খুব একটা হয়েছে তা দাবি করা যায় না। উন্নয়ন ঘটেনি নারীর প্রতি সামাজিক মূল্যবোধের। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রণীত আইনের বাস্তবায়ন ঘটেনি; প্রচলিত আইনের সংস্কার যথোপযুক্তভাবে হয়নি। বিয়ে বিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার বিষয়ক আইনগুলোতে নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাট ব্যবধান তৈরি করেছে। কাজেই সাংবিধানিক অধিকার ও আইনি সুবিধা আজ নারীর জন্য খুব প্রয়োজন।

৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সিডও দিবস। সিডও হলো জাতিসংঘের ‘নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ’ সনদ। ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সিডও সনদ গ্রহণ করে। এর পাঁচ বছর পর ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকার সিডও অনুমোদন করে। তবে সিডওর প্রাণ হিসেবে চিহ্নিত দুটি ধারার ওপর থেকে সংরক্ষণ তুলে নেয়া হয়নি এখনো।

ধর্মের দোহাই দিয়ে দেশের মৌলবাদী ও ধর্মান্ধগোষ্ঠী এ সনদের পূর্ণাঙ্গ অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। নারী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, নারী-পুরুষের সমতার প্রশ্নে প্রতিবারই ধর্মের দোহাই দেয়া হয়। ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীর প্রতি যে বৈষম্য করা হচ্ছে তা অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন। ধর্মকে আঘাত না করেও নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

যা আছে ধারা ২ এবং ১৬.১(গ)-এ

১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সিডও সনদ গ্রহণ করে। এর পাঁচ বছর পর ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকার সিডও অনুমোদন করে। অনুমোদনকালে সরকার ২, ১৩(ক) এবং ১৬.১(গ) ও (চ) ধারা আপত্তিসহ স্বাক্ষর করেছে। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ১৩(ক) ও ১৬.১(চ) ধারা থেকে বাংলাদেশ তার আপত্তি প্রত্যাহার করে নেয়। তবে ধারা ২ এবং ১৬.১(গ)-এ এখনো আপত্তি রয়ে গেছে। সনদের ২ নম্বর ধারায় বলা আছে, নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে রাষ্ট্র আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং প্রয়োজনে আইন বা বিধিবিধানের পরিবর্তন, পরিবর্ধন অথবা বাতিল করবে। ১৬.১ (গ) ধারায় বিয়ে করা ও বিয়ে বিচ্ছেদের সময় নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

এ প্রসঙ্গে মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, সিডওর যে দুটি ধারায় বাংলাদেশ সংরক্ষণ রেখেছে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এই কথাগুলো আমরা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে শুনছি। তারপর বলা হলো এই বিষয়টি তারা ‘স্ট্রং কনসিডারেশন’ করছে। এসব চাতুর্য্যপূর্ণ কৌশল এবং শব্দ চয়ন আর ধোপে টিকবে না। সিডও সনদের দুটি ধারা থেকে আপত্তি তুলে নেয়ার ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর যে দোহাই দেয়া হয় তা একটা উসিলা মাত্র।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, ধর্ম থেকে বিচ্যুতি না ঘটিয়েও নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক একটি সনদে আমরা স্বাক্ষর করেছি। কিন্তু দুটি ধারায় এখনো আপত্তি অব্যাহত রয়েছে। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও এই সনদ আমরা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছি। সিডও সনদের ২ ধারাটি হচ্ছে সনদের প্রাণ। কিন্তু আমরা সনদের মূল উপজীব্য থেকে দূরে আছি। আর সে কারণে ওই সনদের আইনে কোনো মূল্য আছে বলে আমি মনে করি না। সিডও সনদের দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন; ভিশন টুয়েন্টি টুয়েন্টি ওয়ান এবং জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করতে হলে সমতার বাংলাদেশ গড়েতে হবে এবং এই সংরক্ষণ তুলতে হবে।

এ প্রসঙ্গে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, আমি মনে করি, সিডও সনদের ধারা ২ এবং ১৬.১(গ) থেকে আমাদের সংরক্ষণ প্রত্যাহার করার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। খুব শিগগিরই সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj