একটি কুঁড়ি দুটি পাতার কষ্ট গাথা : দীপংকর গৌতম

সোমবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

একটি কুঁড়ি দুটি পাতার দেশ সিলেটে আমরা প্রমোদ বিহারে যেয়ে আপ্লুত হই। চা শ্রমিকদের জীবন দেখে তাদের ঝুড়ি নিয়ে ছবি তুলি। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেই। কিন্তু কতজনে জানি বঞ্চিত চা শ্রমিকদের দুর্বিষহ জীবনের কাহিনী। সবুজে ঘেরা চা বাগানের উঁচু-নিচু আঁকাবাঁকা টিলায় বেষ্টিত অনিন্দ্য সুন্দরের সমারোহ চায়ের বাগানে পাতা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত ৯০ শতাংশ শ্রমিকই হচ্ছেন নারী। প্রায় প্রতিটি নারী শ্রমিককেই তাড়াহুড়ো করে গৃহস্থালির কাজ শেষ করে ছোট ছোট সন্তানদের রেখে বা সঙ্গে নিয়ে দলবেঁধে ছুটতে হয় বাগানে। এক চিমটে লবণ চা দিয়েই সকালের যাত্রা শুরু হয় তাদের। নারী শ্রমিকরা শুধু পাতি (চা পাতা) উত্তোলনের কাজই করেন না। তারা কলম কাটা, প্রোনিং বা চারাগাছ রোপণ থেকে শুরু করে গাছের আগাছা পরিষ্কারও করে থাকেন। বিপরীতে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি অমানবিক ও হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে ২৩ কেজি পাতি উত্তোলনের বিনিময়ে মাত্র ১০২ টাকা পেয়ে থাকেন। আর নিয়মিত নারী শ্রমিক সপ্তাহে জনপ্রতি ৩ কেজি ২৫০ গ্রাম রেশন পেয়ে থাকেন। পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে চেহারা হাড্ডিসার দশা চা বাগানগুলোর নারী শ্রমিকদের। অথচ চা উৎপাদন করতে গিয়ে বেশিরভাগ নারী শ্রমিককেই হাড়ভাঙা শ্রম দিতে হয়! চা গাছ ছেঁটে ছেঁটে ২৬ ইঞ্চির বেশি যেমন বাড়তে দেয়া হয় না, তেমনি বাড়তে দেয়া হয় না লেবার লাইনে চা শ্রমিক নারী এবং তাদের পরিবার বসবাস করার জন্য বরাদ্দকৃত জায়গা। বাগান কর্তৃপক্ষ থেকে ২২২ বর্গফুটের অর্থাৎ ৮ হাত বাই ১২ হাতের ছাউনিকেও। একদিকে নিম্ন মজুরি অন্যদিকে অভাব-অনটনের সংসার এ দুয়ের যাঁতাকলে মাঝপথে পিষ্ট হচ্ছে নারী চা শ্রমিক ও তাদের সন্তানদের জীবনযাত্রা। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, তুফান সবকিছু মাথায় নিয়েই চা বাগানে কাজ করতে হয় নারী শ্রমিকদের। বৃষ্টি বা ঝড়ের সময় সামান্যতম আশ্রয়ের জন্য বাগানগুলোতেই নেই কোনো শ্রমিক ছাউনি। এমনকি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে এসব নারী শ্রমিকের ঝোপঝাড়ই ভরসা, নেই কোনো স্যানিটারি ল্যাট্রিনের ব্যবস্থাও।

একজন নারী বা পুরুষ চা শ্রমিক অমানবিক ও পরিশ্রমে জুটে মাত্র ১০২ টাকা। দুপুরের খাবারে নারী শ্রমিকরা পাতি ছানা (চা পাতার ভর্তা) সঙ্গে পেঁয়াজ ও মরিচ দিয়ে রুটি অথবা ভাত খেয়ে থাকেন। এসব খাবার খেয়েই তাদের জীবন চলে। যে জন্য পুষ্টিহীনতা তাদের নিত্যসঙ্গী। চা বাগানের শ্রমিকের বড় অংশই নারী। সবাই হাড্ডিসার। খাটুনি খেটে সংসার চালালেও পুষ্টির অভাব সবার। এসব সংসারের পুরুষরা খুবই অলস হাড়িয়া পান করে নেশায় বুঁদ হয়ে ঘুমায়। সরেজমিন দেখা যায়, চা বাগানগুলোতেও নারী শ্রমিক বা তাদের পরিবারের জন্য থাকে না পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা। সেখানে প্রায় শ্রমিককেই দেখা যায় রক্তশূন্যতা, স্বাস্থ্যহীনতা, জন্ডিস, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হতে। সাধারণ রোগশোকে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা এখানে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। শিক্ষা, বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্যানিটারি ল্যাট্রিন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা, বসবাসের জন্য উপযোগী বাসস্থানসহ স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব বাগান কর্তৃপক্ষের। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে শ্রম আইনে উল্লেখ করা এসবের কোনো কার্যকারিতা প্রায় নেই বললেই চলে।

একাধিক নারী চা শ্রমিক নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, তাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়েও চলে নয় ছয়। সন্তান প্রসবকালীন মাত্র দুই থেকে সর্বোচ্চ তিন মাস ছুটি পেয়ে থাকেন। দেশে অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত নারীদের মতো ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ছুটির দাবি করেন তারা। মধ্যযুগের ভূমিদাসের মতোই চা মালিকের বাগানের সঙ্গে বাঁধা এসব সহজ সরল শ্রমিকের জীবন কাঠামো।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj