প্রচ্ছদ: আদিবাসী ধাঁচে

রবিবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মৃন্ময়ী তাজিন

আধুনিক জীবনযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ ফ্যাশন। দিনবদলের ধারায় প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে ফ্যাশনের ধরনও। নতুনত্ব থাকায় আদিবাসী তথা পাহাড়ি পোশাক-পরিচ্ছদ ফ্যাশনের টানেল ধরে প্রবেশ করছে মূলধারার স্টাইলে। ফ্যাশনের মূলনীতি হলো সংযোজন ও বিয়োজন। নতুনত্ব আনয়নের লক্ষ্যে ফ্যাশন ডিজাইনাররা প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলার ঐতিহ্যবাহী ধারার সঙ্গে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন আঙ্গিক।

সমতলের বাসিন্দারা পাহাড়ে বসবাসরত মানুষদের জীবনযাপন নিয়ে সবসময়ই খানিকটা কৌতুহলী থাকেন।

পাহাড়ের গায়ে উঁচু নিচু স্থানে দিনাতিপাত থেকে শুরু করে তাদের নিজস্ব ধারার পোশাক পরিচ্ছদও এই কৌতুহলের সূত্রপাত করে।

পাহাড়ে সাধারণত উপজাতিদের বসবাস। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য উপজাতি গোষ্ঠী।

তাদের স্বকীয় আর ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও গহনায় ভিন্নতা থাকায় তা ফ্যাশন হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সমতলের মানুষদের মধ্যে। নামকরণের প্রয়োজনে একেই বলা হচ্ছে আদিবাসী ফ্যাশন।

আমাদের দেশে প্রায় চল্লিশটির মতো উপজাতি গোষ্ঠী রয়েছে। তাদের পোশাকের সঙ্গে আধুনিকতার মিশেলে ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে বাঙালি ফ্যাশন।

বিবর্তিত হচ্ছে পোশাকের ধারা। চাকমা, মারমা, মগ, মঙ, সাঁওতাল আরো নানা উপজাতি রয়েছে। যাদের সবার আছে নিজস্ব স্টাইল। কিছু ক্ষেত্রে মিলও পাওয়া যায়।

যেমন অধিকাংশ আদিবাসী পোশাক একখন্ড কাপড় কোমরে একপ্যাঁচে জড়িয়ে পরতে দেখা যায়। চাকমা সমাজে এর নাম কোমরকাট।

ধারণা করা হয় এখান থেকেই লং স্কার্টের উৎপত্তি। কিন্তু বর্তমানে অনেকে একদম ঐ

পাহাড়ি পোশাকটিই পরছে ফ্যাশন বৈচিত্র্যতার জন্য। তার এভাবেই আদিবাসী ফ্যাশন হয়ে উঠছে নতুনধারার বাহক। দৈনন্দিন জীবনে উপজাতি মেয়েরা যে পোশাক পরে তা থামি নামে পরিচিত। এই থামি এখন অনেকেই পরছেন। পাহাড়ি মেয়েরা লাল, সবুজ, নীলের মিশেলে রেওন সিল্কের ভারি নকশা করা পোশাক পরে উৎসব উদযাপন করে।

এগুলোও তাদের হাতে তৈরি যা এখন আমাদের ফ্যাশনে বিদ্যমান। থামি বা পিনন নামের উপজাতিদের পোশাকটি উজ্জ্বল রঙ ও বুননের চমৎকার সমন্বয়ে তৈরি। অনেকে মজা করে একে উপজাতীয় লুঙ্গি বলেন।

থামি দিয়ে সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া কিংবা শার্ট তৈরি করেন অনেকে। এতে ফ্যাশনের বৈচিত্র্যতা লক্ষ্যণীয়। আদিবাসীদের এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকে রঙের উজ্জ্বলতা চোখে পড়ার মতো। নানা রঙের কম্বিনেশনটাও উল্লেখযোগ্য।

থামি কেটে পোশাক তৈরি নয়, অনেক ফ্যাশন হাউজ হুবহু থামির ডিজাইনটা অক্ষত রেখে পাতলা সুতায় বুনছে শাড়ি।

একইভাবে তৈরি থান কাপড় থেকে হচ্ছে কামিজ, ফতুয়া। সব মিলিয়ে আদিবাসী ফ্যাশন আমাদের এ অঞ্চলে বেশ সমাদৃত হয়েছে। আদিবাসী পোশাকের পাশাপাশি গহনার ফ্যাশনও এখন প্রচলিত। আদিবাসীদের গহনায় জ্যামিতিক মোটিফের ব্যবহার বেশি। কাঠামোও বেশ বড়সড়। আদিবাসী গহনার মধ্যে আছে বড়মালা, নেকলেস, পায়েল, কানের দুল ইত্যাদি।

এসব গহনা এ প্রজন্মের তরুণীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

ডিজাইনারের বয়ানে : শহুরে আদিবাসী

বাংলাদেশে অনেক আদিবাসী স¤প্রদায় রয়েছে। এই স¤প্রদায়গুলোর প্রত্যেকের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। তবে, তাদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকলেও কিছু বৈশিষ্ট্য সাধারণের মতোই। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের আদিবাসী স¤প্রদায় সাধারণত তাদের পোশাকের জন্য উপজাতীয় ফ্যাব্রিক নিজেরাই তৈরি করে থাকে। প্রায় প্রত্যেক পরিবারেই লুম আছে। চট্টগ্রামের পাহাড়ি আদিবাসীরা তাদের চিন্তাতেই নিজস্ব লুমে কাপড় বানায়। সেগুলো খুব রঙিন। তারা শীট, পাতলা তোয়ালে, পোশাক সামগ্রী, কার্পেট এবং বহনযোগ্য ব্যাগও তৈরি করে। তিহ্যগতভাবে, উপজাতীয় লোকেরা পাহাড়ের ঢালে তাদের দ্বারা উৎপাদিত তুলো ব্যবহার করে। রংয়ের জন্য প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করে। মহিলাদের জন্য । আদিবাসী মোটিফেই ডিজাইনগুলো পূর্ণতা পায় পোশাকগুলোর ক্যানভাসে। এছাড়াও আলফা নামক কাপড়ের একটি অংশে তাদের ঐতিহ্যগত নকশার ব্যবহার দেখা যায়। এটি পাখি, প্রজাপতি, ফুল এবং পাতার বিভিন্ন ডিজাইন প্রদর্শন করে। লাল মাটিতে রঙিন ডিজাইন তাদের ঐতিহ্যগত দিক। বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহীর সাথে উপজাতীয় চিন্তার পুনর্বিন্যাস করা সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বই এসব সৃষ্টিগুলো। ট্রান্সফর্মিং নকশায় আমাদের ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় ফ্যাব্রিককে পুনরায় প্রবর্তন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফ্যাশন ডিজাইনার হিসাবে আমরা ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে এসবের সম্মিলিত মেলবন্ধন করবার চেষ্টা করে যাচ্ছি। সুতরাং বাংলাদেশি ফ্যাশন ডিজাইনার হিসাবে মনে করি লাইন, রঙ, এটি থেকে টেক্সচার, ফর্ম, আকৃতি নিয়ে কাজ করার অনেক কিছু আছে। যদি উপজাতীয় ফ্যাব্রিক নিয়ে ফ্যাশন ফোরকাস্টিং এবং আধুনিকতা এক করা যায়, তবে বিশ্বজুড়ে ফ্যাশনে নতুন মাত্রা পাবে আধিবাসী ধাঁচের ফ্যাশন ট্রেন্ড। একইভাবে ফ্যাশনের বিভিন্ন দিকে সমৃদ্ধি পাবে আমাদের এই সংস্কৃতি । নতুন প্রজন্মও তাদের দৈনন্দিন ফ্যাশনে জায়গা দিবে আদিবাসী ট্রেন্ডকে। ডিজাইনারদের মুন্সিয়ানায় পোশাকেও আসবে বৈচিত্র্যতা।

রোকেয়া আহম্মেদ পূর্ণা (আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ফ্যাশন ডিজাইনার)

ফ্যাশন (ট্যাবলয়েড)'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj