আশ্রয়…

শনিবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ঊষার মাহমুদ

খেয়াঘাটে দাঁড়িয়ে আছি। প্রায় একযুগেরও বেশি সময় পর। ভৈরবগামী নয়টার নৌকোর অপেক্ষায়। ন’টা বাজতে আরো পনের মিনিট বাকি। কাশবনের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রাণ ভরে চারপাশ দেখছিলাম। বৈশাখী রোদে চকচক করছে সবুজময় ধানক্ষেতগুলো! তিতাস নদীটার দিকে তাকিয়ে আছি অপলক। বেশ কিছুক্ষণ হলো পানকৌড়িটা ডুব দিয়েছে। তাকিয়ে আছি কখন ভেসে উঠবে কালো পাখিটা।

আহ! কতদিন হয় দেখি না পানকৌড়ির ঠোঁটে জীবন্ত মাছের ছটফটানি! ডাহুকপাখিটা আমার পাশ দিয়ে উড়ে গিয়ে হারিয়ে গেল কুচুরিপানার ভেতরে। পাখিটার ডানার শব্দে ধ্যান ভাঙলো আমার।

নৌকো ভিড়ল খেয়াঘাটে। দাঁড়িয়ে না থেকে হাঁটতে হাঁটতে নৌকোয় উঠে পড়লাম। ছইয়ে বসে যাবার প্রবল ইচ্ছে থাকলেও প্রখর রোদের কথা ভেবে ভেতরেই বসলাম। ওপাশে বসে থাকা একজন আমার দিকে তাকিয়েছিল। চোখগুলো ছাড়া বোরখায় সারা শরীর ঢাকা। তবে বড্ড চেনা মনে হচ্ছে চোখযুগল। হয়তো চেনা কেউ। দ্বিধাদ্ব›েদ্ব পড়লাম।

আন্দাজ করতে লাগলাম- কে হতে পারে? মনে করতে পারছি না। মনে না করতে পারাটা প্রচণ্ড অস্থিরতায় ভোগাচ্ছে আমায়। ঠোঁটের মধ্যে এসে ফিরে যাওয়া কথার মতো। মনে করেও যেন করতে পারছি না। কে এই চেনা চোখের অচেনা মানুষটা?

‘আপনি কি মাহমুদ ভাইয়া?’

মেয়েলি মধুর কণ্ঠে ছেদ পড়ল ভাবনায়! আমি চোখ তুলে তাকালাম।

‘হ্যাঁ। আপনি..?’

পরক্ষণে বোরখার মুখোশটা খুলে ফেলল।

আমি নাজমা। আপনার চাচাতো বোন তানহার বান্ধবী। আমরা এক সঙ্গে পড়তাম।

বেশ অবাক হলাম! ‘মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি’ এই কথাটা যেন সারাজীবনের জন্য হার মেনে গেল আজকের এই মুহ‚র্তটার কাছে। আমার তো ভাষা হারিয়ে ফেলার অবস্থা। কি বলব বুঝতে পারছিলাম না আর ভেবেও পাচ্ছিলাম না। বিস্ময় আর কাটে না আমার।

আরে নাজমা, তুমি?

হ্যাঁ ভাইয়া। কেমন আছেন?

জায়গা বদল করে নাজমার কাছাকাছি গিয়ে বসলাম।

হ্যাঁ ভালো। তোমার কী খবর?

গালে ভাঁজ তুলে হাসলো। মায়াবী মুখে অনন্য হাসি! কত বছর পর এই মুখ, এই চেনা হাসির স্নিগ্ধতায় ভিজলো মন!

এইতো আপনাদের দোয়ায় স্বামী সংসার নিয়ে বেশ আছি।

নাজমার কোলে বসে থাকা পুতুলের মতো মেয়েটার দিকে চোখ যায় হঠাৎ।

আমার মেয়ে অনমী। চার বছর ছয় মাস।

তাই! তোমার মেয়ে তো ভারি সুন্দর।

সাদরে মেয়েকে কোলে নিতে চাইলাম, কান্না জুড়িয়ে দিল।

মাহমুদ ভাই; বিদেশ থেকে কবে আসলেন?

গতকাল রাতে।

যে বছর আমরা এসএসসি পাস করে সবে কলেজে পা দিয়েছিলাম, সে বছর আপনি বিদেশ গিয়েছিলেন। অনেকে বছর পর এলেন, তাই না?

হুম। হয়ে গেল তো, এক যুগেরও বেশি।

আপনার লেখা গল্পের বই ‘যেখানে নূপুর বাজে’ খুব ভালো লেগেছিল! বেশ কয়েকবার পড়েছি।

তাই! শুনে ভালো লাগল।

হুম। তানহা দিয়েছিল।

আমি বলেছিলাম তোমাকে দিতে!

জানি। তানহা বলেছে। যাই হোক আপনার বইটার সব কটা গল্পই ভালো লেগেছে, তবে একটা গল্প আমাকে ফের এত বছর পর নাড়িয়ে গেছে। গল্পটাতে আমার জীবনের ঘটে যাওয়া কিছু স্মৃতির সঙ্গে মিল আছে…!

নাজমার কথা শুনে নিজের অজান্তেই হৃৎপিণ্ডটা ধড়ফড় করতে লাগল!

কোন গল্পটা?

ওই যে সেই গল্পটা। যে গল্পটাতে ছেলেটা প্রতি সপ্তাহে মেয়েটাকে একটা করে চিঠি দিত। কোনো চিঠিতেই নাম ছিল না। আমাকেও ঠিক একইভাবেই কে যেন চিঠি দিত। যখন আমি ক্লাস টেনে পড়তাম। সেই নামহীন চিঠিগুলো আমাকে পাগল করে তুলত। সারারাত ঘোরে-বেঘোরে খুঁজে বেড়াতাম চিঠির মানুষটাকে। শেষমেশ তাকে খুঁজে না পেয়ে খুব অসহায় হয়ে পড়েছি। খুব করে চেয়েছি, আমাকে পাগল করা মানুষটাকে একবার মুখোমুখি দেখব। কত মুখ উঁকি দিয়ে যেত মনের আকাশে। সহপাঠীদের হাতের লেখায় মিল খুঁজেছি গোপনে গোপনে; কিন্তু কারো লেখার সঙ্গেই চিঠির লেখার মিল ছিল না।

গল্পটা পড়ার পর স্বস্তি পেয়েছিলাম। গল্পটাতে আমাকে লেখা শেষ চিঠিটা হুবহু তুলে ধরেছেন। আপনার কাছেই আছে আমার জীবনের সবচাইতে এলোমেলো রহস্যের ব্যাখ্যাটা! প্লিজ বলবেন আমাকে, খুব জানতে ইচ্ছে করে কে সে?

কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। বন্ধ হয়ে গেল মুখের ভাষা।

প্লিজ ভাইয়া, চুপ করে থাকবেন না।

কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যাচ্ছি। ঠিক কোন কথা বলা উচিত আর কোনটা উচিত নয় সেই বোধটুকু হারিয়ে ফেলেছি। পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করি।

বাদ দাও না এসব। আজ এত বছর পর শুনে আর কী হবে!

দেখুন কি হবে না হবে সেটা মুখ্য নয়। আমার দেখার ইচ্ছে সেই মানুষকে?

দেখলে কি হবে?

কিছু না হোক। অন্তত এই কথাটা তো বলে দিত পারব, যে আমিও তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম?

তোমার এই কথাটা যে, ছেলেটার সারাজীবন ঘুম ভাঙিয়ে যাবে, আবার নতুন করে নতুন ভাবে!

প্লিজ বলুন কে সে?

বলব?

হ্যাঁ ভাইয়া; বলুন প্লিজ।

সেই ছেলেটা আমি।

আপনি!

হুম আমি।

নাজমার বিস্ময়ের শেষ থাকে না; সুন্দর মুখশ্রী কেবল বিষণœ বিরহের ছাপ।

কেন আপনি সে দিন এমনটা করেছিলেন? ভালোবাসতেন, রাত জেগে চিঠি লিখতেন, অথচ একটা চিঠিতেও নামটা দেয়ার সাহস পাননি, কেন?

না। সাহস পাইনি। ভয় ছিল যদি অপমান করো।

এখন ভালোবাসেন না?

জানি না ভালোবাসি কি না, শুধু এটুকু বলব ভুলতে পারিনি আজো। হারিয়ে ফেলেছি এমনটাও ভাবি না। মনে হয়; সে আছে মনের খুব কাছে। আর মনে হয়; প্রেমে পড়েছিলাম এক অস্পৃশ্য নারীর। যাকে কোনোদিন ধরতে পারব না; ছুঁতে পারব না। আজ থেকে বলব; হারিয়ে ফেলেছিলাম প্রিয় মানুষটাকে বলতে পারিনি তাই।

২.

প্রকৃতির কোমল মায়ায় নিজেকে বিকিয়ে দিব তাই, আজকে নৌ পথে আসা। নাজমার সঙ্গে দেখে হওয়াটা জীবনের সমস্ত রূপকথাকে হার মানিয়ে গেল। আমাদের কথার তালে কখন যে নৌকাটা তিতাস নদীর ছোট ছোট বাঁক পেছনে ফেলে মেঘনায় চলছে তা টেরও পেলাম না। পশ্চিম আকাশে মেঘ করেছে খুব। কালো হয়ে আসছে ঝড়োবৃষ্টি। ক্রমসেই দানবীয় রূপ ধারণ করতে থাকে। মনে হচ্ছে, এখনই গ্রাস করে নেবে সব। মেঘনার ঢেউগুলো যেন সুযোগ সন্ধানী মানুষের মতো; পাল্টে ফেলেছে তার রূপরেখা।

আশন্ত ঢেউয়ের দাপট নৌকার গতিপথ করে তুলছে বেসামাল। প্রতিটা মানুষ ভয়ে থিতু হয়ে আছে, পড়তে থাকে দোয়ে ইউনুস। মাঝি চিৎকার করে বলছে, ‘আল্লাহর দোহাই! আপনারা নড়াচড়া করবেন না। সবাই আল্লাহকে ডাকুন’ কিছুক্ষণ আগেও যে মুখে কথায় কথায় হাসি ফুটত, মুহ‚র্তেই যেন চঞ্চলার হাশি মাখামুখে কান্না নেমে এল।

নাজমার মেয়েটা বৃক্ষলতার মতো ওর গলা ধরে জড়িয়ে আছে। ভয়ে কাঁদতে ভুলে গেছে মেয়েটা। নাজমা মেয়েটাকে আমার দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, মাহমুদ ভাই, ‘আপনি আমার মেয়েটাকে বাঁচান! ওর কিছু হলে আমি মরে যাব!’

নাজমার সন্তানের প্রতি সরল ভালোবাসা থমকে দিল আমাকে। আশ্চর্য হলাম! কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটা বারবার ডাকার পরেও আমার কাছে আসছিল না।

যত কাছে আসতে ডেকেছি, ততই ওর মায়ের শরীরে ও মুখ লুকিয়ে নিত। অথচ, সেই মেয়েটা আমার কাঁধের ওপর মাথা রেখে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। আমিও ওকে পরম মমতায় বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরি, বলতে থাকি ‘ভয় পেয়ো না আম্মু, আমি আছি না, কিচ্ছু হবে না তোমার।’ নাজমার বিশ্বাস ছিল; এই বিপদে ওর চেয়ে আমিই ভালো নিরাপত্তা দিতে পারব তার আদরের সন্তানকে। সরল বিশ্বাসে আমারও মনে হতে থাকল, এই খনিকের কালে আমি তার ছোট্ট এক আশ্রয়।

:: কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj