একাল সেকাল

শনিবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সোহেব সোহান

উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ি তখন। ২০০২ কিংবা ২০০৩-এর কথা। সন্ধ্যায় ঈদের চাঁদ দেখার পর থেকে শুরু হয়ে যেত উন্মাদনা। সন্ধ্যা রাতের পড়া মাথায় তুলে শীতের প্রকৃতিতে মেতে উঠতাম লুকোচুরি খেলায়। প্রতিটি বাড়িতে তখন নবান্নের চিহ্ন। খড়-ধান স্ত‚পাকারে পড়ে আছে বাড়ির এ-কোনায় ও-কোনায়। রাতভর লুকোচুরি, খড়ের গাদার পিছনে লুকিয়ে থাকা।

রাতেই হয়তো ঈদের অতি আনন্দে গোল্লাছুট খেলা। খেলতে খেলতে তীব্র শীতেও শরীর যখন ঘামে ভিজে একাকার তখন দলবেঁধে প্রস্তুতি নিতাম হাতে মেহেদি দেয়ার। ছেলেদের কাজ ছিল যে বাড়িতে মেহেদি গাছ আছে সে বাড়ি থেকে মেহেদি পাতা নিয়ে আসা। চুরি করতে হতো না, চাইলেই দিয়ে দিত সে দিন। ছেলেদের কাজ শেষ, মেহেদি পাতা এসে গেছে। এখন তা শিলপাটায় বেটে মিহি করে হাতে লাগিয়ে দেয়াই মেয়েদের কাজ। হাতে মেহেদি নিয়েই হয়তো না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়তাম।

উত্তেজনায় কী আর ঘুম আসে? দূরে কোথাও ফজরের আজান দিতেই ঘুম ভেঙে গেছে। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে জেগে উঠেই লুকিয়ে রাখা কিশমিশের প্যাকেট খুলেই এক মুট কিশমিশ নিয়ে এক দৌড়ে উঠানে। মঠো ভরা কিশমিশ দেখে চোখজোড়া জ্বলজ্বল করত। তীব্র আনন্দে দ্রুত মুঠের সব কিশমিশ সাবাড় করে যখন আবার কিশমিশ আনতে ফিরে যেতাম ততক্ষণে মা-ও ঘুম থেকে জেগে উঠতেন। ঘরে যেতেই হাতে দুই-তিনটা নারিকেল এসে পড়ত। হালকা আলোয় উঠানে বসেই নারিকেল ছিলে, ভেঙে, পানি খেয়ে তারপর আবার নারিকেল কোরানো।

নারিকেলের ভেতরে শাঁস থাকলে তো কথাই নেই। কাজ শেষ এবার ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়া।

নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরে আসতেই মায়ের সেমাই রান্না শেষ। পিরিচের সেমাই খেয়ে শেষ করতে না করতেই মা একটা টিফিন বাক্স নিয়ে হাজির। এখন এই বাক্স নিয়ে বাজারে যেতে হবে। বাবা গতরাতে বাড়ি ফিরেননি। দোকানে তার প্রচুর কাজ। বাবা ঈদের নামাজের আগ মুহূর্তে বাড়ি ফিরে নামাজ পড়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে লম্বা একটা ঘুম দিবেন। সারাদিন আর হুঁশ থাকবে না।

বাবার কাছে সেমাই নিয়ে যেতাম হেঁটে হেঁটে কিংবা কারো সাইকেলে চড়ে। পুরো রাস্তাজুড়ে কেমন জানি ঈদের খুশি ছড়িয়ে থাকত। ফিরতাম আতর-টুপি কিনে বাবার সাইকেলে চড়ে। বাড়ি ফিরেই দলবেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়তাম পুকুরে। চোখজোড়া টকটকে লাল হওয়া অবধি গোসল শেষ হতো না। গোসল শেষ করে নতুন জামা-কাপড় পরে ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়তে যেতাম পরিবারের সবাই একসঙ্গে। আহ! সে কি আনন্দ!

কয়েক বছর ধরে আর ঈদগাহে নামাজ পড়া হয় না। ঈদগাহ পড়ে থাকে ঈদগাহের জায়গায়, আমরা নামাজ পড়ি মসজিদে। ঈদের নামাজ শেষে মসজিদের ভিতরেই লেগে যায় তর্ক-বিতর্ক। তৈরি হয় মান-অভিমান। কি যে বিশ্রি অবস্থা। ঝগড়া হলেই নিজের পাড়ায় মসজিদ বানিয়ে ফেলার হুমকি দিতেও কেউ ভুলে না। ইতোমধ্যে বানিয়েও ফেলেছে দুই-তিনটা। এখন পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ। আজানে আজানে সংঘর্ষ হয়। কোনো আজান-ই সম্পূর্ণ শুনতে পওয়া যায় না।

ছোটরাও শিখছে বড়দের কাছ থেকে। অথচ ঈদ কী আমাদের এই শিক্ষা দেয়? ঈদ শিক্ষা দেয় ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আলিঙ্গন করা। ঈদ শিক্ষা দেয় রাগ-অভিমান ভুলে পুরনো সম্পর্কটাকে ঝালাই করে আরো শক্ত ও মজবুত করে গড়ে তোলার…।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj