কিশোর নজরুলের রসিকতা

বুধবার, ২৯ আগস্ট ২০১৮

সংসারের নানা দুঃখ-কষ্টের মধ্যে জন্ম নেয়া সন্তানটির নাম রাখা হয় দুখু মিয়া। ছোট্ট সেই দুখু মিয়াই একদিন অনেক বড় কবি হয়েছিলেন। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল তার খ্যাতি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাকে জাতীয় কবি ঘোষণা করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কি খটকা লাগল? আরে সেই দুখু মিয়ার ভালো নামই তো- কাজী নজরুল ইসলাম। দুঃখী বলা হলেও ছোটবেলায় নজরুল কিন্তু মোটেই

মনমরা ছিলেন না। নজরুল ছিলেন খুবই দুরন্ত আর দারুণ দুষ্টু প্রকৃতির। তার কিশোর বেলার কিছু রঙ্গ-রসিকতা তুলে ধরেছেন তাপস রায়

মেয়ের জামাই

প্রতিবেশীর মেয়ের আকিকা। বিশাল আয়োজন। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলামকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি দেখে তিনি এক কাণ্ড করলেন। রোগা পটকা এক ঘোড়ার পিঠে বিদঘুটে চেহারার এক লোককে বসিয়ে প্রতিবেশীর বাড়ি উপস্থিত হলেন।

নজরুল বাড়ির গিন্নিকে ডেকে বললেন, মাইজি, তোমার মেয়ের জন্য বর এনেছি। দেখে যাও।

গিন্নি নজরুলের এমন রসিকতার কারণ বুঝতে পেরে বললেন, আমি তো বাপু ভেবে রেখেছি তোমার সঙ্গেই আমার মেয়ের বিয়ে দেব।

জব্দ করতে এসে উল্টো জব্দ হয়ে কিশোর নজরুলের চেহারা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। ঘোড়াসহ ওই বিদঘুটে লোকটিকে রেখেই তিনি দ্রুত চম্পট দিলেন।

ডবল প্রমোশন

কাজী নজরুল ইসলাম শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়েছেন। পড়াশোনার চেয়ে বন্ধুরা মিলে কার বাগানে কোন লিচুতে রং ধরেছে, কোন গাছের পেয়ারা ডাঁসা হয়েছে- এসব দিকেই বেশি মনোযোগ।

সবাই ধরেই নিল এই বাউণ্ডুলকে দিয়ে আর যাই হোক পড়াশোনা হবে না। কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেখা গেল নজরুল খুব ভালো করেছেন। এতটাই ভালো যে, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে ডবল প্রমোশন দিয়ে দিল। অর্থাৎ ক্লাস সেভেন থেকে এক লাফে ক্লাস নাইন। সঙ্গে রাজবাড়ী থেকে মাসে সাত টাকা করে বৃত্তিও ঘোষণা করা হলো তার নামে।

নিমগাছের ভূত

বন্ধু শৈলজানন্দকে নিয়ে নজরুল ঘুরতে বেড়িয়েছেন। ফেরার সময় ঝড় উঠল। দুই বন্ধু দিল দৌড়। হঠাৎ পড়ে গিয়ে শৈলজানন্দের হাঁটুর কাছে অনেকটুকু কেটে গেল। নজরুল বন্ধুকে ধরে বাড়ি পৌঁছে দিলেন ঠিকই কিন্তু পুরোপুরি চিন্তামুক্ত হতে পারলেন না। রাতে নিমপাতা নিয়ে বন্ধুর পড়ার ঘরের জানালায় উঁকি দিলেন।

এত রাতে নজরুলকে দেখে শৈলজানন্দ অবাক। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন রাতের বেলা সে নিমপাতা পেল কোথায়?

নজরুলকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি একগাল হেসে বললেন, নিমগাছ খুঁজতেই তো রাত হয়ে গেল। শেষে খ্রিস্টানদের কবরখানার নিমগাছে উঠে পাতা পেড়ে আনলাম।

: এত রাতে গাছে উঠলে! তুমি জানো না ওই গাছে ভূত আছে?

নজরুল হাসতে হাসতে বললেন, ধুর! ওসব বাজে কথা। তা ছাড়া আমি কি ভূতের ভয় করি নাকি?

এয়ারগানে প্র্যাকটিস

বন্ধু পাঁচুর এয়ারগান পেয়ে নজরুলের আনন্দ আর ধরে না। শৈলজানন্দকে নিয়ে সোজা হাজির হলেন খ্রিস্টানদের কবরখানায়। কিন্তু পাখি বাদ দিয়ে এয়ারগান তাক করলেন সিমেন্টের বেদির দিকে। তারপর আক্রোশে গুলি ছুড়তে লাগলেন- ঠুস্ ঠুস্।

নজরুলের কাণ্ড দেখে বন্ধু অবাক। এসব কী হচ্ছে?

নজরুল বলেন, ইংরেজগুলোকে খতম করছি।

আসল ঘটনা হলো, ছেলেবেলা থেকেই ইংরেজদের ওপর নজরুলের ভীষণ রাগ। কারণ ওরা দেশের শত্রু। যুদ্ধ করে হলেও ওদের তাড়িয়ে দেশ স্বাধীন করতে হবে। তাই কবরস্থানের সিমেন্টের বেদিগুলো একেকটি বড়লাট, ছোটলাট, ম্যাজিস্ট্রেট মনে করে নজরুল গুলি ছুঁড়তেন।

পেঁপে গাছেও নজরুল এয়ারগান দিয়ে এভাবে গুলি ছুড়ে ইংরেজ মারতেন।

দরমা পীরের দরগা

পাড়ায় নতুন জামাই এসেছে। নজরুল বন্ধুদের নিয়ে ফন্দি আটলেন জামাইয়ের কাছ থেকে টাকা খসাতে হবে। তিনি জামাইকে গিয়ে বললেন, নতুন জামাইদের দরমা পীরের দরগায় যেতে হয়। চলুন। নইলে অকল্যাণ হবে।

‘দরমা’ মানে হাঁস-মুরগির ঘর।

নজরুলের বুদ্ধিতে একটা পোড়ো বাড়ির মধ্যে ‘দরমা ঘর’ আগে থেকেই লাল কাপড়ে ঢেকে রাখা হলো। জামাই সেখানে গিয়ে সালাম করে নগদ সালামি দিলেন। এবার বন্ধুরা মিছিল করে জামাইয়ের শ্বশুর বাড়ি এসে উপস্থিত হলো। গেটে দাঁড়িয়ে নজরুল ছড়া কাটতে শুরু করলেন :

মাসি গো মাসি

তোমার জামাইয়ের দেখ হাসি

দরমা পীরে সালাম দেওয়ালাম

খাওয়াও মোদের খাসি।

আমচোর

গ্রীষ্মের এক দুপুরে পরিবারের সঙ্গে নজরুল গরুর গাড়িতে শিকারপুর যাচ্ছেন। বিশ্রাম নেয়ার জন্য এক আম বাগানে গাড়ি থামিয়ে সবাই নামলেন। বাগানের আমগুলোতে রং এসেছে দেখে নজরুলের খুব লোভ হলো। কিন্তু এক মহিলা পাহারা দিচ্ছেন দেখে নজরুল বুদ্ধি বের করলেন। মহিলাকে মাসি পাতিয়ে তার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলেন। কৌশলে জেনে নিলেন তার স্বামী বাগানের মালিকের বাড়ি পাকা আম পৌঁছে দিতে গেছে।

শুনে নজরুল অবাক হয়ে বললেন, মাসি, আমরা তো সেই বাড়ি থেকেই আসছি। কিন্তু সেখানে তো ওরকম কাউকে দেখলাম না! আমি ও-বাড়ির বড়মিয়ার ছোট জামাইয়ের ভাই। আজ চলে যাচ্ছি। বড়মিয়া বললেন, বাগান দিয়ে গেলে আম নিয়ে যেও। তাই তো থামলাম। আচ্ছা মাসি, কোন গাছের আম মিষ্টি বলো তো!

নজরুলের বলতে দেরি কিন্তু আম পেতে দেরি হলো না। সেই মাসিই সব ব্যবস্থা করে দিলেন।

মেম সাহেবের বাংলা

কাজী নজরুল ইসলাম বন্ধু শৈলজানন্দকে নিয়ে মাঠে বসে আছেন। এমন সময় এক মেম সাহেব গাড়ি থেকে নেমে নজরুলের উদ্দেশে বললেন, ছেইলে সকল, হামারা আসানসোল যাইটে ছাই। ইখান ঠেকে কেটো ডুরে বলিতে পারো?

মেম সাহেবের মুখে বাংলা শুনে নজরুল তো হেসেই অস্থির। মেম সাহেব পুনরায় বললেন, ছেইলে সকল, টুমরা কি হামার কঠা বুঝিটে পারো নাই? এটো হাসিটেছ কেন?

শৈলজানন্দ এবার নজরুলকে ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললেন, আসানসোলের রাস্তা এদিকে নয়। আপনার ভুল হয়েছে।

: হামার বুল হইয়াছে? নো, নো। বুল হইটে পারে না।

: আমি সত্যি বলছি। এ পথ আসানসোলের নয়। আপনি ভুল করেছেন।

এবার মেম সাহেব রেগে দুহাত ছুড়ে চিৎকার দিয়ে বললেন, হোয়াট! টুমি বলিতে চাও, হামি বাংলা জানি না?

মেম সাহেবের কথা শুনে এবার দুই বন্ধু একসঙ্গে হো হো করে হেসে উঠলেন।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj