নির্বাচন না গণঅভ্যুত্থান

মঙ্গলবার, ২৮ আগস্ট ২০১৮


২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সে হিসেবে এ বছরের অক্টোবর মাসের কোনো এক সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষুদ্র অবয়বে কেয়ারটেকার সরকারে পরিণত হবে। কেয়ারটেকার সরকারে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো নতুন পলিসি প্রণয়নে হাত দিতে পারবে না। তাদের কাজ হবে সরকারের দৈনন্দিন কাজসমূহ সমাধা করার মধ্যে নিজেদের সীমিত রাখা। এবং অতি-অবশ্যই নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সাহায্য করা। তবে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের বৃহৎ প্রতিপক্ষ বিএনপি কেয়ারটেকার বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই ফর্মুলা মেনে নিতে চায় না। বরাবর তারা দাবি করে আসছিল নির্বাচনের আগে পার্লামেন্ট ও সরকার ভেঙে দিতে হবে। সরকারের জায়গায় বহাল করতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনেরও পুনর্গঠন জরুরি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে। সেটাও করতে হবে।

উল্লিখিত দাবি না মানায় বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করেছিল। পরে স্বয়ং দলনেত্রী খালেদা জিয়া স্বীকার করেছিলেন ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির যোগ না দেয়াটা রাজনীতির বিচারে চরম ভুল ছিল। ভাবার বিষয়, বিএনপি আবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে ২০১৪ সালের অবস্থানে ফিরে গেছে। আগের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর একটি ‘মোক্ষম’ দাবি। দলের চেয়ারপারসন দুর্নীতির দায়ে জেলে আছেন। বিএনপি বলছে বেগম জিয়াকে ছাড়া তারা আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে যোগ দেবে না। সাধারণ নির্বাচন করতে হলে বেগম জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে।

সরকারি দল আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির এ যাবৎ উত্থাপিত কোনো নির্বাচনী দাবি মানবে বলে মনে হয় না। আইনের বিচারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল একটা অস্থায়ী ব্যবস্থা। অস্থায়ী ব্যবস্থাকে জীবনদান করার সঙ্গে কোনো গুরুতর বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রাজনীতিতে ঘটেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তাই অবান্তর বৈ কিছু নয় আওয়ামী লীগের বিবেচনায়।

আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল ও সেতুমন্ত্রী রাজনীতিতে শালীন ভাষায় কথাগুলো বহুবার বলেছেন। অন্যান্য ক’জন সিনিয়র মন্ত্রীও বিএনপির দাবির মুখে কথাগুলো বলেছেন। তবে ক্ষমতার বাইরে থাকলে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি যুক্তির প্রতি সাড়া দেয়া দূরে থাক, কথা ও আচরণে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এবারেও অবস্থার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

মাঝে একটা সময় ছিল বিএনপি সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সাগ্রহ ঘোষণা দিয়ে বলত নির্বাচন সুষ্ঠু হলে আওয়ামী লীগ নাকি ৪০টা আসনেও জয় পাবে না। বিএনপি স্থানীয়, পৌর এবং সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগের তুলনায় সে সব নির্বাচনে বিএনপি যথেষ্ট আসন পায়নি। নির্বাচনে বিএনপি বিশাল জয় পায়নি। পেয়েছে আত্মরক্ষা করার মতো কিছু আসন। সুতরাং বিএনপির ভাষায় ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি’। বিএনপির অভিযোগ নির্বাচন কমিশন সরকার যা যা করতে বলেছে নির্বাচন কমিশন ঠিক তা তা করেছে। সংগঠন হিসেবে গত ন’বছরে বিএনপি যে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে তা যাচাই করার কিংবা বলার মতো নেতা বোধকরি দলে একটাও নেই। থাকলে তারা বুঝতে পারতেন প্রতিটি স্থানীয় নির্বাচনে এ যাবৎ তাদের নির্বাচনী ফলাফল কেন এত খারাপ হচ্ছে। দুর্নীতির দায়ে আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে খালেদা জিয়ার জেলে যেতে হওয়ায় দলটি আরো দুর্বল হয়ে পড়েছে। শুধু হেন করেঙ্গা, তেন করেঙ্গা বললে তো হয় না, ক্ষমতায় যেতে পারে, অতীতে দুবার নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায়ও গেছে, এমন একটা বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা থাকাও বিধেয় ছিল। যেটুকু সম্পৃক্ততা জনগণের সঙ্গে বিএনপির আছে তা নির্বাচনে জেতার জন্য যথেষ্ট নয় বলেই অনেকে মনে করেন। মাঝে বিএনপি সাধারণ নির্বাচনকে অংশগ্রহণ করার কথা বলত। এখন বলে না। এখন যা বলছে তা একেবারেই ভিন্ন ফর্মুলা।

তাদের শীর্ষ নেতারা ইদানীং বলছেন, তারা দেশে গণতন্ত্রের স্বার্থে গণঅভ্যুত্থান ঘটাবে। পতন ঘটাবে স্বৈরাচারী সরকারের। বিএনপির ভাষায় সরকার উৎখাতের পর সাধারণ নির্বাচন হবে, তবে বিএনপির শর্তে। বিএনপির শর্তে, কেননা দেশে গণতান্ত্রিক শাসন দিতে পারে শুধু বিএনপি। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

বিএনপি আন্দোলনের দল নয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুসহ পরিবার-পরিজনের বেশির ভাগ নৃশংসভাবে কতিপয় কুলাঙ্গারের হাতে শহীদ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তিনি তার মৃত্যুর অন্যূন ছ’মাস পর্যন্ত চিফ মার্শাল ল’ এডমেনিস্টেটর, প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনী প্রধান পদে বহাল ছিলেন। মার্শাল ল’ উঠিয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেনারেল জিয়া চিফ মার্শাল ল’ এডমেনিস্টেটরের পদ হারালেন বটে, তবে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় সেনাবাহিনী প্রধানের পদ আঁকড়ে থাকলেন বেআইনিভাবে। প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনী প্রধান থাকা অবস্থায় একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা পায় তার নেতৃত্বে। দলটির নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। সংক্ষেপে বিএনপি।

জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য বিএনপির জন্ম। এই দল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে অংশগ্রহণ করেছিল বটে, তবে মূল আন্দোলন ছিল আওয়ামী লীগের হাতে। বিএনপি ক্ষমতা উপভোগ করার রাজনীতিতে পাকা। তবে আন্দোলনের দল বিএনপিকে বলা যায় না কিছুতেই।

গত ন’বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। সরকারের বিপক্ষে কোনো কার্যকর আন্দোলন বা জনসম্পৃক্ততা দেখানোর জন্য মাঝারি ধরনের কোনো শো-ডাউনও এ পর্যন্ত করতে পারেনি দলটি।

বিএনপি আন্দোলনের দল নয়। খালেদা জিয়া কারাগারে। তারেক রহমান লন্ডনে। আর বিএনপির রাজনীতি এখন এসে ঠেকেছে জাতীয় প্রেসক্লাবের সেমিনার কক্ষে। নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে হাজার খানেক নেতা-কর্মীর চিৎকার ও বক্তৃতায়। মানববন্ধনেও কোথাও কোথাও ঢুকে পড়েছে বিএনপির রাজনীতি।

বর্তমানে বিএনপি রাজনীতির যা দশা তাতে গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা একটু নিম্নমানের রসিকতা হতে পারে। তবে বাস্তবসম্মত যে নয় কিছুতেই, তা আওয়ামী লীগার-বিএনপির লোক নির্বিশেষে সবাই মেনে নেবে। তবে আমি এবং আমার মতো বহু লোক বিশ্বাস করি যে বিএনপির রাজনৈতিক অভিধানে রক্তহীন বিপ্লবের মতো ষড়যন্ত্রের বিষ মাখানো আরো বহু প্রতিশব্দ আছে। থাকতে পারে। সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে আওয়ামী মুসলিম লীগের (পরে আওয়ামী লীগ) জন্ম যে মানুষের অধিকার আদায় এবং পাকিস্তানিদের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে। সেই কথাটা সংক্ষেপে বলে নিতে চাই।

বাংলাদেশের তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দলের দুটোই দুই একনায়কের ক্ষমতায় বহাল থাকার সময় গঠিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর অত্যন্ত প্রতিক‚ল পরিবেশে আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। পাকিস্তানের একুশ বছর পাকিস্তানের নানা স্তরের নানা রাজনৈতিক দলের মধ্যে সদাসর্বদা জনগণের অধিকার ও কল্যাণের জন্য সংগ্রাম করেছে শুধু দুটি দল,- আওয়ামী লীগ ও কম্যুনিস্ট পার্টি। আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই একুশ বছরের মধ্যে কম্যুনিস্ট পার্টি বহু দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগের বামপন্থি অংশটি ছাত্রলীগ থেকে বেরিয়ে নতুন দল গঠন করেছে। কোনো দলে বেশি তাত্তি¡ক থাকলে যা হয়। সমাজতন্ত্র আসার সম্ভাবনা ফুটতে না ফুটতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আন্দোলন শুরু করলে যা হয়। সেই দলটি এখন বহুধা বিভক্ত। আওয়ামী লীগে, বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতপ্রাপ্তির পর নেতৃত্বের কোন্দল ছিল। দীর্ঘকাল নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগে নেতৃত্বের সেই কোন্দল মিটে যায়। মীজানুর রহমান চৌধুরী সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদের আশ্রয় ছেড়ে আওয়ামী লীগে ফেরেন একটু দেরি করে। আর আওয়ামী লীগ থেকে উল্লেখ করার মতো নেতা ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে যান। এখন রাজনৈতিক এতিমদের নিয়ে ‘জাতীয় ঐক্যে’র রাজনীতি করেন তিনি।

কথাগুলো বললাম এই কারণে, পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগই একমাত্র জনগণের অধিকার ফিরে পাওয়ার আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। কম্যুনিস্ট পার্টি সংগঠন হিসেবে ক্ষুদ্র। আন্দোলন, সংগ্রামে তারাও থাকতো। ১৯৬২ সালে হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশন কর্তৃক প্রণীত সুপারিশ বাতিলের আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ছ’দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান সংঘটনের কৃতিত্ব রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগেরই।

সেই দলকে গণঅভ্যুত্থানের ভয় দেখানো! একটু আশ্চর্য হতে হয়! বিএনপি ঠাট্টা-পরিহাসে লিপ্ত হয়েছে এমনটা মনে করাও ভুল হবে। গণঅভ্যুত্থান ঘটানোর মধ্য দিয়ে তারা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করবে সেই জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বিএনপির আছে বলে মনে হয় না। অনেকে মনে করেন গণঅভ্যুত্থান শব্দটা বিষাক্ত কোনো ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিতবহ। ইদানীং ড. কামাল হোসেন রাজনীতি নিয়ে বড় বড় কথা বলছেন। এসব কথা ষড়যন্ত্র ও হত্যাকাণ্ডে পাকা দলটির উদ্দেশ্যে বললে সঠিক হতো। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কেন এসব কথা বলছেন রাজনীতিতে হিরো থেকে জিরো হওয়া লোকটি। এটাই প্রশ্ন।

গণঅভ্যুত্থান বলতে বিএনপির শীর্ষ নেতারা হয়তো অশুভ কোনো পরিস্থিতি ঘটানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তবে তাদের মনে রাখা দরকার, এটা ১৯৭৫ সাল নয়। এটা ২০১৮ সাল। বেফাঁস সব কথাবার্তা শেষ পর্যন্ত বিএনপির বিপক্ষে বুমেরাং হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। নির্বাচনে না গেলে দলটি হয়তো রাজনীতিতে আম ও ছালা, দুই-ই হারাতে পারে।

রাহাত খান : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ডিসেম্বরের স্মৃতি

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু

Bhorerkagoj