ঈদ এবং তারপরের রাজনীতি

মঙ্গলবার, ২৮ আগস্ট ২০১৮


ত্যাগের মহিমামণ্ডিত কোরবানির ঈদ শেষ হয়েছে। এবার ঈদ উদযাপন হয়েছে মোটামুটি ভালোভাবেই। বড় কোনো অঘটনের খবর পাওয়া যায়নি। নিয়মিত যে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিদিন ঘটে সেরকম অবশ্য এবার ঈদেও ঘটেছে। যেভাবে লাখ লাখ মানুষ স্বজন-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামমুখো হয় তাতে দু-চারটে দুর্ঘটনা না ঘটাই বরং অস্বাভাবিক ব্যাপার হওয়ার কথা। ট্রেনে-বাসের ছাদে বাদুড়ঝোলা হয়ে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন তাতে দুর্ঘটনা যে কেন আরো বেশি ঘটে না, আশ্চর্যের বিষয় সেটাই।

আমাদের সব কিছুই অপরিকল্পিত। আমাদের জনসংখ্যা অপরিকল্পিত, যানবাহন অপরিকল্পিত, সড়কপথ, রেলপথ, নৌপথ সবই অপরিকল্পিত। কতটুকু জায়গায় কত সংখ্যক মানুষের বসবাস করা উচিত, আমরা জানি না। কোথায় বসতি গড়া উচিত আমরা তা জানি না। জায়গা পেলেই আমরা ঘর তুলি। পয়ঃনিষ্কাশনের কথা ভাবি না, স্বাস্থ্য সচেতনতার কথা ভাবি না। কোনোমতে মাথা গোঁজা এবং বেঁচে থাকার কথা ভাবি। আমরা সংখ্যা বাড়াই, বেঁচে থাকি। এটাই আমাদের গৌরব, এতেই আমাদের গর্ব।

আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়ছে। আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি, আমাদের সুখের আর কোনো তুলনা নেই। আমাদের দেশে এখন আর না খেয়ে মানুষ মারা যায় না। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় এখন আর কার্তিকে মঙ্গা হয় না। মানুষের কাজ আছে। পরনে কাপড় আছে। প্রায় সবারই মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে। বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যায় এমন খবর আর তেমন শোনা যায় না। অভাবের কান্না-হাহাকার আর সে রকম শোনা যায় না।

মানুষ দামি গরু কোরবানি দিচ্ছে। হাজার হাজার নয়, লাখ লাখ টাকার গরু কোরবানির প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়। কে বলবে দেশে অভাব আছে, দারিদ্র্য আছে। কেবল একটু খটকা লাগে যখন দেখা যায় এক টুকরো কোরবানির মাংসের জন্য কিছু মানুষ দুয়ারে দুয়ারে কড়া নাড়ে। হাত পাতা মানুষদের দেখে কি বিলাসী ঈদ উদযাপনকারীদের একটু বিরক্ত লাগে না!

আমাদের দেশে কত সংখ্যক মানুষ এখন ঈদ উদযাপনের জন্য, কিংবা কেনাকাটার জন্য বিদেশে যান, সে খবর কি আমরা রাখি? কত টাকা তারা উপার্জন করেন? এই বিপুল অর্থ উপার্জনের বৈধ পথ কি? আয়-ব্যয়ের সঙ্গতি-অসঙ্গতি নিয়ে আমরা কেউ মাথা ঘামাই না। একজন মানুষ মাসে কত টাকা আয় করেন সেটা আমি জানি। আয়ের চেয়ে বেশি আয় করেন না কিন্তু ব্যয় করেন অনেক বেশি। কীভাবে এটা সম্ভব হয়? আজকাল আমরা সম্মান করি মানুষের সম্পদকে, মানুষের মর্যাদাকে এখন আর কেউ সম্মান করে না। চুরিধারী যেভাবেই হোক না কেন বৃত্তের অধিকার একবার করায়ত্ত হলে তার নাগাল আর পায় কে! সামাজিক মর্যাদার আসনটাও পাকাপোক্ত হয়ে যায়।

কোরবানিটাও আজকাল আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। লোভ-লালসা বা ভেতরের পশুত্বকে কোরবানি দেয়ার চেয়ে এখন কত দামি পশু কোরবানি দেয়া হলো এবং সেটা কত বেশি মানুষকে জানানো হলো সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন প্রধান বিষয়। ডান হাতে দান করলে বাম হাত জানবে না- এটাই নাকি ছিল আগে দান-খয়রাতের রীতি। এখন যুগ বদলেছে। এখন প্রচারেই প্রসার। এখন দান করার আগে সবাইকে জানান দিতে হবে। এখন নানা ধরনের যোগাযোগ মাধ্যম। এখন মানুষের হাতে হাতে মোবইল সেট। কাকে কি দিচ্ছি বা দেয়ার নিয়ত করছি তা সবাইকে মুহূর্তে জানিয়ে দিচ্ছি। ব্যক্তিগত বলে এখন আর কিছু নেই। আমার সুখ-অসুখের কথা আমার পরিবার-পরিজন জানার আগে জেনে যাচ্ছে ফেসবুক বন্ধুরা। কি আজব ব্যবস্থা। গোপন কথাটি আর থাকছে না গোপনে।

ট্রেন দেরিতে ছাড়ছে, ছাদে তিল ধারণের ঠাঁই নেই বলে ট্রেন চলছে ধীরগতিতে, তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে, তীব্র যানজটের কারণে বাস নির্দিষ্ট সময়ে আসা-যাওয়া করতে পারছে না, সব কিছুই আপনি জানতে পারছেন আগেভাগে, মুহূর্তের মধ্যে। শুধু কি তাই। আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের গতিবিধিও আপনার অজানা থাকছে না। সবার হাতে হাতে যে একটি মোবাইল সেট আছে, আর সেটা যে শেখ হাসিনার সরকারে একটি যুগান্তকরী অবদান, আপনি সেটা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে না পারলেও আপনার শত্রুরা সেটা ঠিকই লাগাচ্ছে আর আপনাকে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে। যে কোনো আধুনিক যন্ত্র বা সুযোগের সুফল এবং কুফল দুটোই আছে। কুমতলববাজরা কুফল লুফে নেবে- এটাই স্বাভাবিক। আপনি ভালো মানুষ। আপনি যন্ত্রটা ব্যবহার করতে চাইবেন মানুষের কল্যাণে, পরহিতৈষী কাজে। আর দুষ্টলোকেরা চাইবে এর অপব্যবহার, ক্ষতিকর কাজে লাগাতে। দেখলেন তো, সা¤প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সময় ফেসবুকের কি অপব্যবহারটাই না হলো।

অতএব, সাধু সাবধান। ঈদ তো ভালোয় ভালোয় কাটল। সামনে আসছে আরো বড় ঈদ, আরো বড় উৎসব। ঈদ কিন্তু ধর্মীয় উৎসব। সব ধর্মের মানুষ এই উৎসবে শামিল হয় না। ভোট উৎসব কিন্তু সে রকম নয়। এই উৎসবে সব ধর্ম বর্ণের মানুষ শামিল হয়। ভোটের প্রচারে কিন্তু সত্য-মিথ্যা কোনো বাছবিচার নেই। মানুষ কিন্তু সত্যটার চেয়ে মিথ্যাটা বেশি বিশ^াস করে। চিল কান নিয়েছে শুনে কানে হাত না দিয়ে চিলের পেছনে দৌড়ায়।

আগামী নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য কঠিন পরীক্ষা। পরীক্ষা আওয়ামী লীগের কর্মীদের। গত দশ বছর আপনারা মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছেন, তা সব মানুষ মনে রেখেছে। কারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন, কারা মানুষকে অপমান-অসম্মান করেছেন, মানুষ তার কিছুই ভোলেনি। কারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। কাদের গায়ে গতরে আশাতিরিক্ত চর্বি জমেছে তার সবই মানুষের চোখের সামনে ঘটেছে। কাজেই এখন একটু মানুষের কাছে গিয়ে মার্জনা ভিক্ষা করুন। তার বিপদে আপদে একটু সাহায্য-সহযোগিতা করুন। যে সম্পদ গড়েছেন তার সামান্য অংশ দান-খয়রাত করুন। আমাদের দেশের মানুষের দয়ার শরীর। রাগ-দুঃখ মনে পুষে রাখে না হাসি মুখে কথা বললে, সালাম-আদাব দিলে সব কষ্ট ভুলে যায়। কাজেই কোরবানি দিয়ে ভেতরের পশুটাকে বধ করে মানুষটাকে জাগ্রত করে একটু অকপটভাবে মানুষের কাছে যান।

শেখের বেটির কাছে মানুষের বিপুল প্রত্যাশা। দেশের জন্য, মানুষের জন্য তার হৃদয়ে রয়েছে উজাড় করা করা ভালোবাসা। মানুষ এই। ভালোবাসা হৃদয় নিংড়ে ফেরত দিতে চায়, আপনাদের জন্য তাতে ছেদ না ঘটে। বঙ্গবন্ধু বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে গিয়েছেন। তার কন্যা এখন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, তারা তাকে নিরাশ করবেন না। আপনারা যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী তাদের সামনে আগামী নির্বাচন এক বড় পরীক্ষা।

বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ডিসেম্বরের স্মৃতি

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু

Bhorerkagoj