নারীর ঈদ কই?

সোমবার, ২৭ আগস্ট ২০১৮

লীনা পারভীন

বিংশ শতক পেরিয়ে একবিংশ শতকের অধিবাসী আমরা। এমডিজির লক্ষ্য অর্জন করে এখন আমরা এসডিজি অর্জনের রাস্তায় আছি। জাতিসংঘের লক্ষ্য অর্জনের রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশের উদাহরণ আছে অনেক ক্ষেত্রেই। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারীর অগ্রগতি। এমডিজির অন্যতম একটি লক্ষ্য ছিল নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীর অগ্রগতিকে নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ সরকার সফলতার সঙ্গেই এটি অর্জন করেছে এবং অন্যান্য দেশের জন্য তৈরি করেছে উদাহরণ।

কিন্তু এই যে এত এত উন্নয়ন, এত ক্ষমতায়ন এর কোনোটিই কী নারীকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পেরেছে? একটি বাস্তব উদাহরণ দেই। আমি নিজে একজন উচ্চশিক্ষিত এবং মোটামুটি একটি উচ্চ পদে কর্মরত আছি। পাশাপাশি আমি একজন মা, একজন কন্যা, একজন স্ত্রী। সংসারে আমি ছাড়াও আমার সন্তানের পিতা আছেন। তিনি একজন যথেষ্ট আধুনিক মননের মানুষ। সাধ্যমতো চেষ্টা করেন আমাকে সাহায্য করতে নানা বিষয়ে। আমাদের দুটি সন্তান আছে। আমিও কাজ করি এবং আমার জীবনসঙ্গীটিও কাজ করেন কিন্তু যে জায়গাটিতে পার্থক্য করে দেয় সেটি হচ্ছে, আমাকে আগের রাতেই চিন্তা করতে হয় পরেরদিনের রান্না কী হবে, নাস্তা কী হবে, বাচ্চাদের স্কুলের টিফিন কী হবে এবং প্রতিটা বিষয় আবার সবার রুচির সঙ্গে মিলিয়ে করতে হবে। সারা দিন কাজের ফাঁকে আমাকে খোঁজ রাখতে হয় বাচ্চারা বাসায় ফিরল কি না, খেল কি না এ সব। অথচ বাচ্চাদের বাবা দিব্বি নিজের কাজে বেরিয়ে পড়ছেন নিশ্চিন্তে। তিনি জানেন এই কাজটি আমি ঠিক করে নেব। কোনো সমস্যা হলেও আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব।

বিষয়টা যেন নারীর নিয়তি হিসেবেই লেখা হয়ে আছে। আর এই চিন্তাগুলো একজন নারীকেই করতে হবে এটাই বিধির বিধান। ঈদ পার্বণ এলে ঘরে ঘরে চিত্রটা একটু কল্পনা করেন। ঈদ মানেই উৎসব। বাসায় সবাই একসঙ্গে থাকবে। হৈ চৈ করবে, আনন্দ করবে। এই কাজটি করার কথা সবাই মিলেই। কিন্তু হেঁশেলের খবরটি কে রাখেন? একটু ভেবে দেখেনতো। আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে অভ্যস্ত হচ্ছি যতই উৎসব পার্বণ আসুক আমার মা চাচিদের ব্যস্ত থাকতে হবে রান্নাঘরেই। এই যে এত এত লোক আসবে তাদের জন্য খাবার ব্যবস্থাটি করবে কে? এ কাজটি কিন্তু নিশ্চিন্তে ছেড়ে দেয়া হয় বাড়ির নারীদের ওপর। যেন নারীদের জন্য উৎসব মানেই নানা পদের বাহারি রান্না করে খাওয়ানো।

আমার মাকে আমি জীবনে কোনোদিন সময়মতো খেতে দেখিনি। কোনোদিন বাড়ির সবার আগে খাননি। ঈদের দিন সকালে সবার আগে ঘুম থেকে উঠতে হয়। উঠেই বাড়ির পুরুষেরা নামাজে যাবে বলে তাদের জন্য সেমাই রান্না করা ফরজ। আছে সকালের নাস্তার আয়োজন। নাস্তা শেষ না হতেই শুরু হয়ে যায় দুপুরের খাবারের আয়োজন। এর পাশাপাশি আছে বাড়িতে আসা মেহমানদের জন্য খেদমতের আয়োজন। সন্তানের বন্ধুরা আসে, বাড়ির কর্তার বন্ধুরা আসে। সবাইকে নিখুঁতভাবে আদর যতœ করার দায়িত্বটাও আশে নারীর ঘারেই। আমার মতো হাজারো উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চপদের কর্মরত নারীর সংখ্যা এখন অনেক। কিন্তু চিত্রটা কী সামান্যও পাল্টেছে? অনেকেই হয়তো ধরতেই পারছেন না যে এখানে আবার পাল্টাপাল্টির কী বিষয়? ঈদ এলে, বিয়ে সাদি লাগলে বা পার্বণ এলে তো বাড়ির নারীরাই ব্যস্ত থাকবে রান্নাঘরের কাজে। এতে আবার অবাক হওয়ার কী আছে?

ঠিক তাই। আমরা এই একটা জায়গায় অবাক হতে চাই না। উদার হতে চাই না। একবারও ভেবে দেখি না এই যে একজন নারী কেবলমাত্র বাড়ির বউ হওয়ার কারণে, মা হওয়ার কারণে, মেয়ে হওয়ার কারণে সর্বোপরি একজন নারী হওয়ার কারণে ঐতিহাসিকভাবে এবং বংশ পরম্পরায় রান্নাঘরের দায়িত্বটি বহন করে যাচ্ছে বিনিময়ে সে কী পাচ্ছে? হ্যাঁ, অনেকেই হয়তো বলবেন, এতে সে আত্মতৃপ্তি পাচ্ছে। নিজের পরিবারের জন্যই তো করছে। এখানে কেন এত হিসাব আসবে? পরিবারের জন্য ভালোমন্দ রান্না করায় যে তৃপ্তি পাওয়া যায় এটা কী আর অন্য কোনো কিছুতে আছে? না বাজারে কিনতে পাওয়া যায়? এই ভার্চুয়াল সান্ত¦না দিয়েই আমরা যুগে যুগে আমাদের নারী জাতিকে ফুলিয়ে রেখেছি।

জানি এর মধ্যেই পাঠকের মনে অনেক প্রশ্ন জমা হয়েছে। হয়তো ভাবছেন, এ কেমন নারী যে নিজের পরিবারকেও রান্না করে খাওয়াতে ভালোবাসে না? ভুল। আমি ভালোবাসি কিন্তু আমাকেই নিয়ম করে এই কাজটি করতে হবে এটি মানতে পারি না। আমি চাই আমার মতো নারীদের জীবনে এতসব আসুক অন্য রং নিয়ে। তারা যদি মনে করে রান্না করবে তো করবে আর ইচ্ছে না করলে করবে না। অন্য কোনো উপায়ে ব্যবস্থা করবে। ঈদের দিনে বাড়ির পুরুষরা সেজেগুজে ঘুরতে বের হবে আর বাড়ির নারীরা সারাদিন নেয়ে ঘেমে রান্না করে খাইয়ে দাইয়ে ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরে মাঝ রাতে ঘুমাতে যাবে। এভাবেই দিনের পর দিন, বছরের পর বছর নারীদের উৎসব হয়ে উঠবে হাঁড়ি ঠেলার। তাদের আনন্দ, সুখ বা ক্লান্তি বাধা পড়বে রান্নাঘরের মাঝে আর পুরুষেরা প্রজাপতির মতো ঘুরে বেড়াবে এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এমনকি একজন নারী তার উৎসবের পোশাকটিও পরার সময় বা সুযোগ পান না।

আমার মা চাচিরা উৎসবকে উৎসব হিসেবে পালন করতে পারেননি। তাদের বলার মতো সুযোগ ছিল কম। তাই বলে আমাকেও একই পরম্পরায় আটকে থাকতে হবে এ চিন্তা থেকে মুক্ত হওয়ার দিনকে টেনে আনতে হবে দ্রুত। বড় বড় ডেকচিতে মাংস রান্না করার মাঝেই যদি হয় নারীর ঈদ তাহলে এমন ঈদ আমি চাই না। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে মুক্তি আর এই আনন্দ ও মুক্তি ভোগ করবে নারী পুরুষ সবাই মিলে সমানতালে। আমি এমন এসব চাই যখন একজন নারীকে মাঝরাতে ঘুমিয়ে আবার ভোরবেলা উঠে সেমাই রান্না করতে হবে না। সারাদিন কোনো বিশ্রাম না নিয়ে সবার খাবার-দাবার নিয়ে ব্যস্ত থেকে আবার মাঝরাতে সবার ঘুমানোর পর যাবে ঘুমাতে এমন ঈদের উৎসব থেকে নারীর মুক্তি চাই।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj