অবৈতনিক সাংসারিক কাজ নারীকে করছে মূল্যহীন

সোমবার, ২৭ আগস্ট ২০১৮

সেবিকা দেবনাথ

গৃহিণীর শ্রমের কারণেই যুগ যুগ ধরে টিকে আছে আমাদের পরিবার বা সামাজিক অবকাঠামো। অথচ তার সেই কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই। সাংসারিক কাজের বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক পান না বলেই সেসব কাজ মূল্যহীন বলেই ধরে নেই আমরা। সেই সঙ্গে ওই নারীকেও মূল্যহীন ধরে নেয়া হয়।

বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে নারীর গৃহস্থালি অবদানের হিসাব না করা হলেও কিছু কিছু সংস্থার এ সংক্রান্ত কয়েকটি গবেষণা রয়েছে। কয়েক বছর আগে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ‘বাংলাদেশের নারীর অনুদ্ঘাটিত অবদান অনুসন্ধান : প্রতিবন্ধকতা, সম্পৃক্ততা ও সম্ভাব্যতা’ নামের গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। ওই গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের নারীরা দৈনিক গড়ে ১৬ ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজ করেন, কিন্তু এ বিশাল সময় কাজের বিনিময়ে তারা কোনো মজুরি পান না। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নারীরা প্রতি বছর ৭৭ কোটি ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন। গবেষণায় এ পরিমাণ কাজের মোট অর্থমূল্য ধরা হয়েছে ছয় হাজার ৯৮১ কোটি থেকে নয় হাজার ১০৩ কোটি ডলার। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ জিডিপিতে ধরা হলে দেশের জিডিপির আকার দ্বিগুণ হতো বলে উল্লেখ করা হয় ওই গবেষণায়। গবেষণায় বলা হয়, পুরুষের কাজের ৯৮ শতাংশই জিডিপিতে যোগ হচ্ছে কিন্তু সেখানে নারীর কাজের মাত্র ৪৭ শতাংশ জিডিপিতে যোগ হচ্ছে।

‘জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর গৃহস্থালি কাজের অবদান’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, যদি জাতীয় আয়ের সঙ্গে নারীদের অন্যান্য কাজের সঙ্গে পারিশ্রমিক বিহীন কর্মকাণ্ডের অবদান যোগ করা হয়, তাহলে জাতীয় অর্থনীতিতে নারীদের অবদান ২৫ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশ হবে। আর পুরুষদের অবদান ৭৫ থেকে দাঁড়ায় ৫৯ শতাংশে। গবেষণায় দেখা গেছে, সাংসারিক জীবনে বেশির ভাগ নারীর কোনো অবসর সময় নেই। তারা আয়মূলক বিভিন্ন কাজসহ গৃহস্থালির বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। কর্মস্থল থেকে ফিরে নিজের ঘরের প্রায় সব কাজ সম্পন্ন করে। শহরের তুলনায় গ্রামের নারীরে বেশ কিছু ভিন্ন ধরনের কাজ করতে হয়। একজন নারী প্রতিদিন প্রায় ৪৫ ধরনের কাজ করে থাকেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদের মতে, নারীদের বড় একটা অংশ পরিবারে কাজ করেন। কিন্তু তারা অবৈতনিক। এটি জাতীয় আয়ে হিসাব হয় না। বর্তমানে শ্রম খাতে ৩৩ শতাংশ নারী জড়িত। যাদের সিংহভাগই কৃষিতে। আর ৬৭ শতাংশ নারী রয়েছে কর্মপরিধির বাইরে। কিন্তু নারীদের সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজে লাগালে ৩৩ শতাংশ থেকে এই হার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা যাবে। সিংহভাগ নারী বাইরে কাজ না করলেও সাংসারিক কাজে সারা জীবনই যুক্ত থাকেন। কিন্তু তাদের এ কাজের মূল্যায়ন জাতীয়ভাবে এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

নারী অধিকার কর্মী খুশি কবির বলেন, নারীদের গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি নিয়ে কয়েক বছর ধরে আলাপ আলোচনা হচ্ছে। এ কাজের অর্থনৈতিক স্বীকৃতি নিয়ে একপক্ষ বলছে নারীর এ কাজের অর্থনৈতিক মূল্য থাকা দরকার, আর অন্যপক্ষ বলছে বাসার কাজের জন্য পারিশ্রমিক নেয়া কেমন কথা। তবে নারীর এ বিশাল কাজের স্বীকৃতি দেয়া হলে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে নারীরা আরো বেশি সুবিধা পাবে। নারীর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং নারী নির্যাতন কমে আসবে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj