নারী শ্রমের মূল্য কি শুধুই সান্ত¡না?

সোমবার, ২৭ আগস্ট ২০১৮

টুম্পা ভট্টাচার্য্য

আপনি কি চাকরি করেন? সব গৃহিণী নিশ্চয় এইকথার সম্মুখীন হয়েছেন। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সংসার সামলানোর জন্য হয়তো অনেকে বাইরে কাজ করতে পারে না। আর যখন তারা ঐ প্রশ্নের সামনে পরে তখন হয়তো মনটা খারাপ বা ছোট হয়ে আসে। আর সেজন্য সংসারকে দায়ী করতে থাকে। সৃষ্টি হয় সংসারের প্রতি বিরূপভাব। কিন্তু আমরা/আপনারা কখনো কি ভেবেছেন আপনাদের ঘরের সার্ভিসটা বাইরের কাজ থেকে কতটা মূল্যবান? সব শ্রম, শক্তি ও ভালোবাসা দিয়ে আপনার সংসার গড়া। আপনার ঘরের সার্ভিসে কখনো বেতন, বোনাস, ভাতা, ছুটি ও অবসর না থাকা সত্ত্বেও নিরলস সংসারের জন্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন এই সেবা কতটা মহৎ ও নিঃস্বার্থ। ৩৬৫ দিন আপনি এভাবে মায়া মমতা দিয়ে সেবা দিয়ে থাকেন এবং সারা জীবন দিয়ে যান। আপনি একজন বিশ্বস্ত সেবিকা, শিক্ষিকা, রাঁধুনী, পরিচারিকা একাধারে সব পেশা পালন করছেন সংসারের জন্য। আপনার সেবা পৃথিবীর সব সেবার ঊর্ধ্বে যা কোনো কিছুর বিনিময়ে মূল্যায়ন করা যায় না। এরপরেও মনে হয় আপনাদের কিছুই করতে পারছেন না? আসলে এই হীনম্মন্যর জন্য আমাদের সমাজ ও পরিবেশ দায়ী। এতে আপনাদের দোষ নেই। আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিই এ রকম। যার জন্য গৃহিণীরা হীনম্মন্যতায় ভুগে। যারা ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে সংসারের জন্য নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন কেন আজো তারা সমাজের চোখে অবহেলিত?

সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একাধিক সন্তানের দায়িত্ব থাকার কারণে অনেক নারীর চাকরি করা হয়ে উঠে না। অনেকে ভালো অবস্থানে কাজ করেও সংসারের কথা ভেবে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই ছাড়ের মূল্যায়নটা কখনো সেভাবে করা হয় না। খুব অবাক হয় যখন কাজের বুয়া দুঘণ্টা শ্রমের বিনিময়ে ৩/৪ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পায়। একজন গৃহিণী সেই বুয়ার থেকেও মূল্যহীন? দিনের ২৪ ঘণ্টায় ৮ ঘণ্টা ঘুম ছাড়া বাকি ১৬ ঘণ্টা সে ঘরের জন্য শ্রম দিয়ে চলছে, বিনিময়ে পায় থাকা খাওয়া ও প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো। যদি কাজের হিসেবে পারিশ্রমিক হিসাব করা হয় তবে দেখা যাবে মাসে লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু তার বিনিময়ে সামান্য হাত খরচও দেখা যায় হাত পেতে নিতে হয়। একটা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করতে হয় তার থেকে অনেক গুণ বেশি একটা সংসারের ব্যবস্থাপপনায় মাথা ও শরীর খাটাতে হয়। এরপরও সেই নারীকে ঘরে বাইরে কথার সম্মুখীন হতে হয় কী কাজ করে? আর যেই শুনে না সেই আচরণের ভাষা বদলে যায়। আমি কয়েকজন স্বামীকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা আপনাদের কি মনে হয় না স্ত্রী হিসেবে নির্দিষ্ট একটা পারিশ্রমিক দেয়া উচিত যেহেতু সে আপনার পরিবারের দেখাশুনার আজীবন দায়িত্ব নিয়েছে? উত্তর আসলো পরিবারতো আমার একার নয়। আর পারিশ্রমিক দিলে সম্পর্কে আর ভালোবাসা থাকে না। অনেক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তরটা দিল। যদিও সেই আত্মবিশ্বাসটা ছিলো পুরুষতন্ত্রের অহংকার ও বিদ্রƒপের হাসি। সত্যি তো কত সহজে একজন নারীকে বুঝ দেয়া যায় ভালোবাসার দোহাই দিয়ে নারীর সর্বস্ব পাওয়া যায়। গৃহবধূ এই শব্দটাও আপত্তিকর কেননা বধূতো গৃহেরই হয়। এটাতে এক ধরনের ঘোমটাতে আড়াল করার চেষ্টা মাত্র। সে তুলনায় গৃহরক্ষিতা বললে বেশ মানানসই মনে হয়। নতুবা কেন বলা হয় না গৃহ ব্যবস্থাপক? কারণ সেটাতে থাকে মর্যাদা আর বিবাহিত নারীকে সমাজ হোক বা গৃহে কোথাও মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত হতে দেয়া হয় না। যতক্ষণ না সে কোনো উপাধিযুক্ত কাজ করছে। তবে কষ্ট হয় একজন গৃহিণী সেই বুয়া থেকেও মূল্যহীন যখন। গৃহবধূ চিরজীবন অবহেলিত ছিল আর থাকবে আমাদের সুশীল (সুশীল-নরসুন্দর) সমাজ সভ্য মুখোশ আড়ালে থাকবে। গৃহিণী তুমি জীবন দিয়ে কাজ করে যাও বিনিময়ে তোমার আছে একবুক মিথ্যে আশ্বাস ও ভালোবাসা।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj