স্বপ্নজয়ীদের কথা….

সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৮

বাংলাদেশে নারীদের অগ্রযাত্রা নিয়ে রয়েছে নানা মত। অনেকে এখনো মনে করেন রক্ষণশীল সমাজের কারণে বাংলাদেশে নারীরা এগোতে পারছেন না। কিন্তু পারিবারিক বাধা, সামাজিকতার চোখ রাঙানি, শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে এক কঠিন বাস্তবতাকে সঙ্গী করে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের নারীরা। শিল্প, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে সমাজসেবামূলক কাজের নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও সাফল্য দেখাচ্ছেন তারা। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে তারা সুনাম কুড়িয়েছেন বিশ্ব দরবারেও। প্রবাসে বসবাসকারী বাংলাদেশি তরুণীরাও রাখছেন সাফল্যের স্বাক্ষর। উজ্জ্বল করছেন দেশের নাম। স্বপ্নজয়ী তিন তরুণীকে নিয়ে অন্য পক্ষের এবারের আয়োজন। প্রতিবেদক সেবিকা দেবনাথ

নারী ফুটবলারদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন মারিয়া

ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম কলসিন্দুরের মেয়ে মারিয়া মান্দা। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ১৫ নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক। যার সাফল্য আজ শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্ববাসী জানে। তবে তার ফুটবলার হয়ে ওঠার শুরুর দিকটা মোটেও মসৃণ ছিল না। জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে এই পর্যায়ে এসেছেন মারিয়া। তাকে লড়তে হয়েছে অভাবের সঙ্গে, প্রবল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে। ছোটবেলায় বাবাকে হারায় মারিয়া। কলসিন্দুর থেকে যখন প্রথম চ্যাম্পিয়ন হন মারিয়া তখন তিনি মায়ের সঙ্গে মানুষের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। কারণ পিতৃহীন সংসারে মাকে মানুষের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে সংসার চালাতে হতো। মাকে সহযোগিতা করতেন মারিয়া। কিন্তু সে দমে যায়নি। প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও সাধনার জোরে সেসব বাধা ডিঙ্গিয়ে মারিয়া এখন নারী ফুলবলারদের প্রতীক হয়ে উজ্জ্বল। তার অধিনায়কত্বে দলটি সাফ ফুটবলের শিরোপা জয় করেছে, অংশ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন টুর্নামেন্টে। স¤প্রতি অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন মারিয়া। মারিয়ার ফুটবলে হাতেখড়ি ২০১১ সালে। প্রাইমারি স্কুল নিয়ে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে মারিয়া কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে খেলায় অংশ নেয়। ২০১১-১২ এই দুই বছর মারিয়াদের দল ঢাকা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হলেও বিভাগীয় পর্যায়ে হেরে যায়। পরে ২০১৩ সালে এসে তারা বিভাগীয় পর্যায়েও চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৪ সালে মারিয়াসহ কলসিন্দুরের অনেকেই অনূর্ধ্ব ১৪ জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পায়। রাজশাহীতে ফুটবল ক্যাম্পটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভালো করার পরই সরাসরি অনূর্ধ্ব ১৫ জাতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য দলে সুযোগ পান মারিয়া।

যাদের অনুপ্রেরণায় মারিয়ার আজকের অবস্থান সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার মা আর মফিজ উদ্দিন স্যার অনুপ্রেরণা দিয়েছে বলেই আমি ফুটবলার হওয়ার দিকে এগিয়ে গেছি। শুরুর দিকে অনেক সময় প্র্যাক্টিসে যেতে অলসেমি লাগত, ভালো লাগত না। তখন মফিজ স্যার ফোন দিয়ে আমার খোঁজ নিতেন। প্র্যাক্টিসে যেতে বলতেন। আবার অনেক সময় মা আমাকে জোর করেই প্র্যাক্টিসে পাঠিয়ে দিতেন। মা আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন ফুটবল খেলতে।

খেলতে গিয়ে সমাজের নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। এ প্রসঙ্গে মারিয়া বলেন, যখন খেলাধুলা শুরু করি, তখন গ্রামের মানুষ বলত ফুটবল তো ছেলেদের খেলা। মেয়েরা কেন হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলবে? এ রকম নানান কথা শুনতে হতো। আর অনেকেই মাকে গিয়ে বলত আপনার মেয়েকে কেন ফুটবল খেলতে দিচ্ছেন? ফুটবল তো ছেলেদের খেলা। এ রকম নানা কথা শুনতে হয়েছে শুরুর দিকে। তখন অনেক কষ্ট লাগত। মফিজ স্যারকে সেগুলো বলতাম। তখন স্যার বলতেন, লোকে কে কী বলল তাতে কান দেয়ার প্রয়োজন নেই। তুমি তোমার মতন খেলে যাও, একদিন দেখবে নিজের জন্য, দেশের জন্য, মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে পারলে লোকজন তোমাকে সম্মান করবে। যখন ভালো করতে লাগলাম, তখন সবাই বুঝতে পারল যে মেয়েরা সবকিছু পারে। এখন সাফল্য আসায় সবাই আমাকে সমর্থন করেন। অথচ প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলতে হয়েছিল খালি পায়ে। বুট কেনার সামর্থ্য ছিল না আমার। ওই ম্যাচেই ফুটবলের প্রেমে পড়ে যাই। সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা করি। তারপরই স্থানীয় কোচ এবং বাফুফের সংশ্লিষ্টদের নজরে পড়ি। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মারিয়া বলেন, শুধু খেলা নিয়েই আপাতত আমার সমস্ত ভাবনা চিন্তা, স্বপ্ন দেখা। আপাতত আগামীতে ভালো খেলে যেতে চাই। বিশ্বের বিভিন্ন ক্লাব লীগে খেলা, বাংলাদেশের হয়ে ফুটবল বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখি।

ফটোগ্রাফি নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চায় হিয়া

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী রাইসা ফারিয়া হিয়া। পড়ছেন ক্যানবেরা হাই স্কুলে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে জাপানের হিগাসিকাওয়া শহরে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক ছবি উৎসবে পদক জিতেছে হিয়া। শুধু তাই নয় পদক জিতেছে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে এই ছবি উৎসবে অংশ নেয় ক্যানবেরা হাই স্কুলের আরো দুজন শিক্ষার্থী।

‘টাউন অফ ফটোগ্রাফি’ নামে পরিচিত জাপানের হিগাসিকাওয়া শহর। গত ২ আগস্ট থেকে এ শহরেই অনুষ্ঠিত হয় সপ্তাহব্যাপী ‘ইন্টারন্যাশনাল হাই স্কুল স্টুডেন্টস ফটো ফেস্টিভ্যাল এক্সচেঞ্জ’। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিক্ষার্থীদের বন্ধু বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ ছবি উৎসবের আয়োজন করা হয়। এবারের প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১৮টি দেশের উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীসহ হিগাসিকাওয়া শহরের তিনটি স্কুল অংশ নেয়। ছবি উৎসবে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পাঁচটি পুরস্কারের জন্য লড়েছে শিক্ষার্থীরা। তার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘বিশেষ পদক’; যা কিনা নির্ধারিত হয়েছে অনলাইন ভোটিংয়ের মাধ্যমে। শীর্ষ দুটি স্কুল এবং তিনজন শিক্ষার্থীকে দেয়া হয় এ পদক। বিশেষ পদক ক্যাটাগরির ব্যক্তিগত পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান দখল করে হিয়া।

হিয়ার মা আলফা আরজু একজন পেশাদার সাংবাদিক। তবে হিয়ার কখনো সাংবাদিক হওয়ার শখ ছিল না। তার ঝোঁক ফটোগ্রাফিতে। হিয়া জানায়; অনেকটা শখের বশেই ছবি তুলত সে। তবে প্রতিযোগিতায় স্থান পাওয়ার পর ফটোগ্রাফিতে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে তার। নিজের এবং দলের পদক জয়ে বেশ খুশি হিয়া। বলেন, প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আমরা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাচ্ছি এটা বিশ্বাস করতেই আমার কয়েকদিন লেগেছে। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে পদক জিততে পারায় বেশ ভালো লাগছে। ফটোগ্রাফি নিয়ে হায়ার স্টাডি করার ইচ্ছা আছে। ক্যারিয়ারও গড়তে চাই ফটোগ্রাফি নিয়ে।

সুবিধা বঞ্চিতদের মাঝে স্বপ্ন বুনে চলেন তানজিল

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের হালি শহরের মেয়ে তানজিল ফেরদৌস। বিশ্বের উদীয়মান দশ তরুণ নেতার তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশের মেয়ে তানজিল। দেশে শান্তি ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টিতে অনন্য অবদান রাখায় চলতি বছরের ২ মে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ঘোষিত ‘উদীয়মান তরুণ নেতা পুরস্কার’ পেয়েছেন।

মা ফেরদৌস আরা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ কাট্টলী-রামপুর-উত্তর হালিশহর এলাকার দুবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর। আর বাবা মুহাম্মদ আবু তাহের একজন ব্যবসায়ী। বর্তমানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে অর্থনীতি বিষয়ে লেখাপড়া করছেন তানজিল।

২৪ বছর বয়সী তানজিল শৈশব থেকেই সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়ান। তবে সক্রিয়ভাবে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন ২০১২ সালে। বাংলাদেশের তারুণ্য ও সামাজিক পর্যায়ে উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। ব্যক্তিগতভাবেও লিঙ্গবৈষম্যকে মোকাবেলা করে চলেছেন তিনি। ২০১৫ সালে চট্টগ্রামে জাগো ফাউন্ডেশনের ইউথ উইং ভলানটিয়ার্স ফর বাংলাদেশের সভাপতির দায়িত্বকালীন তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে নিয়ে বহু সমাজসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

রাজনীতিবিদ মায়ের উৎসাহ ও উদ্দীপনায় সমাজের পথশিশু ও সুবিধা বঞ্চিতদের নিয়ে কাজ করা শুরু তানজিলের। সুবিধা বঞ্চিতদের মাঝে স্বপ্ন বুনে চলেন। সেই স্বপ্ন সারা বিশ্বে পৌঁছে দিতে বর্তমানে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএএইচসিআরের হয়ে কাজ করছেন কক্সবাজার রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের নিয়ে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে জাগো ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ৫০০ রোহিঙ্গা শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে তিনি সাহায্য করেছেন। ‘উদীয়মান তরুণ নেতা’ হিসেবে পুরস্কৃত হওয়ার অনুভূতি সম্পর্কে তানজিল বলেন, এই পুরস্কারটাকে আমি শুধু আমার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেখি না। বরং এটা আমাদের দেশের সব স্বেচ্ছাসেবীর কাজের স্বীকৃতি। আমি নিশ্চিত এই পুরস্কার দেশের সব স্বেচ্ছাসেবীকেই উৎসাহ জোগাবে। তরুণদের উদ্দেশে তানজিল বলেন, সমাজসেবায় তরুণরা এগিয়ে এলে সত্যিকার অর্থে দেশটা বদলে যাবে। কারণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ তরুণ।

তানজিল বিশ্বাস করেন, তরুণদের সমাজসেবামূলক কাজে উদ্বুদ্ধ ও যুক্ত করা হলে তারা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকবে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তানাজিল জানান, আগামীতে কক্সবাজারের নারী ও শিশু নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করতে আগ্রহী তানজিল। এসব কিছু ছাপিয়ে দেশে সমাজসেবামূলক কাজের পাশাপাশি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজে নারী-পুরুষ বৈষম্যের বিরুদ্ধেও সোচ্চার থাকতে চান তিনি।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj