মিতিদের ঈদ : মাহবুবা হোসেইন

শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮

আমাদের বাসায় প্রায় আসত মিতি, আমার বন্ধু। একই ক্লাসে পড়ি আমরা। মেয়েটার হাসিটা অমলিন, কিন্তু ওর বেশভুষা তার হাসিটার মতো নয়। প্রাণবন্ত মেয়েটা আমার সঙ্গে যতটা না, আমার মায়ের সঙ্গে তার চেয়ে বেশি খাতির। আমার মাও উচ্ছল, কথা বলতে পছন্দ করেন। মিতি বাসায় এলে মা খুশি হয়ে হাতের কাছে ভালো যা থাকে তাই খেতে দেন, মিতিও আয়েশ করে খায়, প্রতিটি বিন্দুর স্বাদ নিয়ে আস্তে আস্তে শেষ করে, খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিতিও আমার মায়ের অনর্গল কথা চলতে থাকে। মিতি ঘনঘন আসে আমাদের বাসায়, স্কুল যাওয়ার পথে অথবা স্কুল ছুটির পর কিন্তু আমি কোনোদিন যাইনি ওদের বাসায়, মিতিও কোনোদিন বলেনি।

আজকে ঈদ। আমাদের বাসায় মহাধুমধাম। একটা থান থেকে তৈরি নতুন জামা-কাপড় আমাদের পরনে, যে যার মতো সেজেছি। অঢেল পোলাও-কোরমা ফিরনি-জর্দা, পেট পুরে খেয়ে আমাদের হাঁসফাঁস অবস্থা। খুব সকালে মিতি এল আমাদের বাসায়, তার পরনে হাতে কাচা ফর্সা জামা তবে নতুন নয়, সেন্ডেলটাও পুরনো। আমরা বেরিয়ে পড়লাম পাড়া বেড়াতে- এবাড়ি ওবাড়ি বন্ধুদের বাসায়। মিতির হয়তো একটু খারাপ লাগছিল, বলল ‘চল আমাদের বাসায়।’ আমিও রাজি হয়ে গেলাম।

আমরা তিন চারজন বান্ধবী গেলাম মিতিদের বাসায়। একটা ছোট ঘর তাতে দুটো রুম। প্রথম রুমটাতে একটা চৌকি তাতে আমরা বসলাম। মিতি ভেতরে গিয়ে ফিরে এল, আবার ভেতরে গেল। এভাবে এঘর ওঘর করতে করতে মিতি কেবল বলতে লাগল ‘মা এদের কিছু খেতে দাও, সেমাই রাঁধনি মা?’ ভেতর নিরুত্তর। মিতি এবার ভেতরে গিয়ে আর আসে না।

আমি ভাবলাম ভেতরে গিয়ে বিদায় নিয়ে আসি। গিয়ে দেখি মিতি ঘরের মেঝেতে স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে আছে, ওর মা জানালার দিকে মুখ করে পেছন ফিরে আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছেন।

আমি কাছে গিয়ে বিদায় নিতে উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন, ‘মা তোমার খালু সেই সাত সকালে বেরিয়ে গেল, বলে গেল দেখি সেমাই-টেমাই কিছু পাওয়া যায় কিনা কিন্তু সেই যে গেল এখনো ফিরে আসল না। কে জানে কোথায় নীরবে সময়টা পার করছে?’ আমি একদম স্তব্ধ হয়ে গেলাম, মনে হলো যেন অভাবের হাঁ করা মুখের ভেতর দিয়ে টুপ করে ডুবে গেলাম।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj