টাক বেল চার আনা : কানিজ জোহরা কণিকা

শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮

কেন যেন ঈদের আগের দিনটা শুরু হয় আমার প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে। সেই ছোটবেলায় ফিরে যায় মনটা। ঈদের আগের দিন গভীর রাতে আব্বা অদ্ভুত এক সুরেলা কণ্ঠে কুরআন পড়তেন। যেন অন্য কোনো জগৎ থেকে ভেসে আসছে। এখনো খুঁজি আমি সেই সুর। মাকে দেখি মুখে চিরচেনা সেই হাসি নিয়ে আলমারি থেকে আমাদের সবার নতুন জামা-কাপড় বের করছেন। প্রতি ঈদের দিন আমি সেই কর্পূরের গন্ধটা পাই। মা কর্পূর ছাড়া কাপড় রাখতেন না।

মায়ের রান্না করা পোলাওয়ের সুগন্ধ পুরো ঘরময় ছড়াত। আব্বার অনিন্দ্য সুন্দর ফর্সা মুখটা কেমন পবিত্র দেখাত সে দিন, অদ্ভুত কায়দায় চোখে সুরমা পরতেন তিনি। পাঞ্জাবিতে অন্যরকম একটা আতর দিতেন, এর সৌরভ আমি এখনো পাই। আমার ছোট ভাই শাহেদের ঈদের দিনের ঘ্যান ঘ্যান এখনো কানে বাজে।

কিছুই তার পছন্দ হতো না বায়না লেগেই থাকত তার। কাজলের তখন থেকেই সব কিছুতেই ছিল সীমাহীন উৎসাহ। পিঠাপিঠি হওয়ায় আমার পোশাকগুলোর প্রতিই তার আকর্ষণ বেশি থাকত। মাপে সব সময়ই বড় হতো বড় ভাইয়ের পাঞ্জাবি, সে পাঞ্জাবি পরেই বোকা বোকা হাসিতে আব্বার সঙ্গে ছুটতেন ঈদের নামাজে।

হায়রে সময়!

তিন ভাইয়ের এক বোন হওয়ায়, অনেক বড় হয়েও আমাকে ছেলেদের পোশাক পরতে হতো। মনে আছে একবার কেঁদেকেটে ঈদে মেয়েলি পোশাক আদায় হলো। রীতি ছিল, ঈদের আগের দিন চার ভাইবোনের চুল কাটার। আমার ভাগ্যে ছিল যথারীতি বাবলি কাট, আর ভাইদেরটা, চুলটা ছেঁটে যতটুকু ছোট করা যায়। সবকিছুই বাবার ইচ্ছায় হতো। সেবারও খোশ মেজাজ, কল্পনায় কত স্বপ্ন, মেয়েলি পোশাক, হাতে চুড়ি, চুলের জন্যও কেনা হয়েছিল তখনকার ফুল, আপেল বসানো বেবি ক্লিপ। বাহারি ব্যান্ড।

চুলটাও কানের নিচ পর্যন্ত নেমেছিল।

কিছুক্ষণ পরপর দেখতাম আয়নায় চুলের সুন্দর। বাসার ছাদেই চুল কাটার আয়োজন। আব্বা নাপিতকে সব বুঝিয়ে চলে গেছেন। কিন্তু সে কী বুঝল কে জানে?

শুনছিলাম নাপিতের চুল কাটার ক্যাচক্যাচ শব্দ কিন্তু এতটা নির্দয় হবে কে জানত? আমাকেও বানিয়ে দেয়া হলো ভাইদের মতো করে। এতে বেশি বিশ্রী দেখাচ্ছে দেখে আব্বার কথা মতো করে দেয়া হলো একেবারে বেল মাথা। হায়! এই কষ্টের স্মৃতি সহজে কী ভোলা যায়! তাও বয়সটা একেবারে পিচ্চি নয়, নয় দশ হবে। বুঝেন তো একবার আমার অবস্থাটা।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj