ঈদ স্মৃতি : নদী রহমান

শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮

আমাদের মধ্যবিত্তের ঈদ মানেই ভীষণ একটা খুশির ব্যাপার। আমরা ছয় ভাইবোন। দুই বোন, চার ভাই। সবার বড় বোন, তারপর ভাই, এরপর আমি, লাইন ধরে আমার পরে তিন তিনটে ভাই। পিঠাপিঠি ভাইবোন সব।

অনেক ছোটবেলার ঈদের কথা মনে পড়ে। আম্মা প্রিন্টেড গজ কাপড় কিনে আমাদের ঈদের জামা নিজ হাতে সেলাই করে দিতেন। যে কারণে আমার আর আপার জামার মতোই ছিল ভাইদের সবার জামা। শুধু পার্থক্য ছিল ওদের জামাটা ফতুয়া টাইপ, ছেলে সংস্করণ।

ঈদের আগে কয়েকদিন ধরে আম্মার সেলাই মেশিন অনেক রাত অবধি শব্দদূষণ ঘটাতো, কোনো কোনো সময় মাঝরাতে মেশিনের শব্দে ঘুম থেকে উঠে পড়তাম, চোখ রগড়ে দেখতাম আমার লক্ষী মা কি অসীম ধৈর্য নিয়ে সেলাই করে যাচ্ছে! ছয় বাচ্চার জামা তৈরি বলে কথা!

ঈদের দিন আমরা সবাই এক ধরনের জামা পরে পাড়ায় বেড়াতে বের হতাম। কি আনন্দই না ছিল! এখন ভাবলে অবাক লাগে এই রকম ড্রেসআপ নিয়ে আমরা হাফ ডজন ভাইবোন আনন্দে মাতোয়ারা!

এরপর আর একটু বড় হলাম আম্মা আর একরকম কাপড় দিয়ে আমাদের বুঝ মানাতে পারত না। আমরা একটু হলেও বুঝদার হলাম। মনে আছে খুব বেশি দামি জামা কিনে না দিলেও আম্মা ঈদ উপলক্ষে ঢাকা আসতেন। ইসলামপুর থেকে আমাদের কাপড় কেনা হতো। আব্বা আমাদের দুই বোনকে নিয়ে বিকেলে বের হতেন ঈদের ঠিক আগের দিন, চুড়ি, ফিতা, নেইলপালিশ আর যা যা লাগে সব কিনে দিতেন।

বিরানব্বই সালে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের পরেই প্রথম রোজার ঈদ, ঘুমিয়েই ছিলাম চাঁদরাতে, মাঝরাতে চাঁদ ঝকঝকে জোছনায় ঘুম ভেঙে গেলে এক মায়াময় পরিবেশে সে কি বুক ফাটা কান্না! বর দিশেহারা, আমিও কেঁদেই যাচ্ছি, কান্না আর থামে না।

বরকে বলতে পারিনি কি এক নস্টালজিক দুঃখবোধ!

এই প্রথম ঈদের বিকেলে বাবা ডাকেনি, ফিতা চুড়ি কিনে দেয়ার কোােন ইচ্ছেও প্রকাশ করেনি। শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়ির দূরত্ব ছিল সে সময় মাত্র ১৫ টাকার রিকশা ভাড়া। হায় কপাল! বিয়ে হয়ে গেছে বলে বাবা এভাবে পর করে দিল! মানতে পারছিলাম না আমার বন্ধুর মতো বাবা, আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরুষ, কীভাবে পারল!

আমি জানি বাবা ভেবেছিল, ভার্সিটি পড়া মেয়ের ফিতা-চুড়ি শুধুই মামুলি, এগুলো শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাওয়াটা প্রেস্টিজ ইস্যু, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছিল এটা ২২ বছরের কিশোরীর শিকড় উপড়ে ফেলার এক বিরাট ষড়যন্ত্র। আজও ঈদ আসে। প্রচুর রান্নাবান্না খাওয়া-দাওয়া, জামা-কাপড়।

কই আগের মতো একটুও আনন্দ পাই না। কোথায় দিয়ে ঈদ আসে আর কোথা দিয়ে যায় বুঝতে পারি না। ছোটবেলাটা কবেই হারালাম বাবাকে হারালাম সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে, ঈদ আনন্দ।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj