সাহসী খোকার গল্প : মোনোয়ার হোসেন

বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮

খোকা দেখতে একেবারে পাটখড়ির মতো!

লিকলিকে। ছিপছিপে লম্বা।

খোকা ভাত খায়, মাছ খায়, দুধ খায়, ডিম খায়, শাক-সবজি খায়, ফলমূল খায়, সবকিছুই খায় তবুও খোকা মোটা হয় না। দিনে দিনে আরো যেন লিকলিকে হয়ে যায়। মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে বলে শট মারতে গিয়ে নিজেই উল্টে পড়ে যায়। এই খোকাকে নিয়ে বাবা-মায়ের চিন্তার অন্ত নেই। যে লিকলিকে ছেলে!

লিকলিকে হলে কী হবে?

খোকা কিন্তু দুরন্তপনায় পটু, আর পড়ালেখায় ভীষণ মনোযোগী। রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-তুফান যাই হোক না কেন- গ্রামের শিশুদের সঙ্গে নিয়ে দলবেঁধে ছুটে যায় বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শুক্রবার বা ইশকুল ছুটির দিনে সাথীদের নিয়ে যায় মধুমতি নদীতে। মনের সুখে সাঁতার কাটে মধুমতির ঘোলাজলে। বিকেলে মাঠে খেলে হা-ডু-ডু, ফুটবল কিংবা ভলিবল।

পাখি ছিল তার খুব প্রিয়। ভালোবাসত ভীষণ। শালিক ও ময়না পাখি বাড়িতে পুষতো। আবার কখনো কখনো একাকী খালে বসে মাছরাঙার মাছ ধরা দেখত। দেখে কী যে তার ভালো লাগত! ফিক করে হেসে দিত।

প্রতিদিনের দিনের মতো সে দিনও খোকা ইশকুল থেকে বন্ধুদের সঙ্গে নৌকায় চড়ে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ নৌকা উল্টে গিয়ে সবাই পানিতে পড়ে গেল। খোকাও পড়ে গেল। খোকার পানিতে পড়ে যাওয়ার কথা শুনে মা দৌড়ে এসে খোকাকে খালের পানি থেকে তুলল। তারপর থেকে মা আর তাকে গিমাডাঙ্গা ইশকুলে পাঠালেন না। গোপালগঞ্জ শহরে বাবার কাছে নিয়ে গোপালগঞ্জ পাবলিক ইশকুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। বাবা গোপালগঞ্জ শহরে সরকারি চাকরি করতেন।

খোকা ছোট থেকেই মহৎ, দয়ালু ও পরোপকারী। ইশকুলে সহপাঠীদের গায়ে ছেঁড়া জামা দেখলে নিজের গায়ের জামা খুলে তাকে পরিয়ে দিত, বাসা থেকে খাবার এনে তাদের খাইয়ে দিত। কারো ছাতা না থাকলে নিজের ছাতা তাদের দিয়ে নিজে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরত। রাস্তার পাশে কোনো ক্ষুধার্ত লোককে দেখলে বাসায় ডেকে নিয়ে পেটপুরে ভাত খাওয়াত। খোকার মা ছিলেন খুব ভালো মা। আদর্শ মা। এতে কিন্তু মা একদম রাগ করতেন না। বিরক্ত হতেন না। বরং খুব খুশি হতেন। ভালো কাজ করার জন্য ছেলেকে আরো উৎসাহ দিতেন।

খোকা অনেকটা বড় হলো। প্রাইমারি ছেড়ে ভর্তি হলো মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন ইশকুলে। ৬ষ্ঠ সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে উঠল অষ্টম শ্রেণিতে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন তাদের ইশকুল পরিদর্শন করতে এলেন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাঘা রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে ইশকুলকে ঝেড়ে মুছে ঝকঝকে আর তকতকে করা হলো। সবাই ধোপদুরস্থ পরিপাটি কাপড় পরে ইশকুলে এলেন।

ইশকুল পরিদর্শন শেষে মুখ্যমন্ত্রী পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ডাকবাংলার দিকে। পথিমধ্যে খোকা একদল সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে মন্ত্রীর সামনে এসে দাঁড়াল। পথ আটকে ধরল।

আচমকা এই পথরোধে মন্ত্রী তো একেবারে হতভম্ব। বললেন, তোমরা কে? আমার কাছে কী চাও?

আচমকা এই এলাহী কাণ্ডে প্রধান শিক্ষকও ভড়কে গেলেন। দৌড়ে এসে বললেন, অ্যাই, অ্যাই তোমরা করছোটা কী? পথ আটকে রেখেছো কেন? পথ ছেড়ে দাও।

কিন্তু কে শুনে স্যারের কথা।

খোকা আরো সামনে এগিয়ে এল। দাঁড়াল একেবারে মন্ত্রীর সামনে। নির্ভীক মনে। সাহসী ও দীপ্তকণ্ঠে বলল, আমরা গোপালগঞ্জ মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন ইশকুলের ছাত্র। আমাদের ইশকুলের ছাদে ফাটল ধরেছে। একটু বৃষ্টি হলেই চুয়ে চুয়ে পানি পড়ে। আমাদের বইখাতা ভিজে যায়। ক্লাস করতে খুব অসুবিধা হয়। ইশকুল কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে অনেকবার অবহিত করেছি, তারা কোনো সুরাহা করেনি। আজ আমাদের ইশকুলের ছাদ সংস্কারের জন্য আর্থিক অনুদান না দিলে আমরা পথ ছাড়ব না।

এইটুকু ছেলের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, সাহস আর স্পষ্টবাদিতা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন মন্ত্রী। মুগ্ধ হয়ে খুশিমনে নিজের তহবিল থেকে ছাদ সংস্কারের জন্য আর্থিক অনুদান দিলেন এবং দ্রুত ছাদ সংস্কারের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিলেন।

ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা কী জানো এই সাহসী খোকাটি কে? তিনি হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি, আমাদের সবার গর্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট ঘাতকদের বুলেটে সপরিবারে নিহত হন।

(অলঙ্করণ : কমিক সিরিজ ‘মুজিব’-এর প্রচ্ছদ অবলম্বনে)

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj