রিপোর্টার থেকে এডিটর…

সোমবার, ১৩ আগস্ট ২০১৮

বাংলায় নারীদের সাংবাদিকতার প্রথম হাতেখড়ি ঘটে মূলত ব্রিটিশ আমল থেকেই। তবে সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক যাই বলা হোক না কেন, দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী সাংবাদিক বলা হয়ে থাকে নূরজাহান বেগমকে। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নারী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বেগম’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকও ছিলেন। প্রায় ছয় দশক তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া বেগম রোকেয়া, কবি সুফিয়া কামাল প্রমুখ লেখক ও সাহিত্যিকরাও সেই সময়ে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীন বাংলার পরবর্তী সময়ে পত্রিকার নারী পাতাগুলোতে শুধু নারীরাই কাজের সুযোগ পেতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলেছে। রিপোর্টিংসহ সংবাদ মাধ্যমের বিভিন্ন শাখায় নারীরা আসতে শুরু করেন। এরপরও সংবাদমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক কম। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই সংখ্যা এখনো তলানিতেই বলা চলে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে কত সংখ্যক নারী কাজ করছেন এর সাম্প্রতিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে গণমাধ্যমভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আর্টিকেল নাইনটিনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের নিচে। কিছু ইতিবাচক উদাহরণ থাকলেও কর্মস্থলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণের হার খুবই সীমিত। সাংবাদিকতা পেশার ক্ষেত্রে সম্পাদনা ও ব্যবস্থাপনায় তা মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই হার ৩৮ শতাংশ। আধুনিকতার যুগে অনলাইন ভিত্তিক নিউজ পোর্টালের কদর বেড়েছে। সংখ্যায় কম হলেও কিছু অনলাইন ভিত্তিক নিউজ পোর্টালের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন নারী। তেমন চার নারী সম্পাদককে নিয়ে অন্যপক্ষের এবারের আয়োজন। প্রতিবেদক সেবিকা দেবনাথ

সুপ্রীতি ধর

নারী বিষয়ক অনলাইন নিউজ পোর্টাল উইমেন চ্যাপ্টার। যার সম্পাদক সুপ্রীতি ধর। নাম উইমেন চ্যাপ্টার হলেও সেখানে নেই সেলাই-ফোঁড়াই কিংবা রান্নাঘরের কথা। নারী কীভাবে বিভিন্ন ইস্যু দেখছে, সেগুলোই তুলে আনতে চায় উইমেন চ্যাপ্টার।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা শেষে সুপ্রীতি দেশে ফিরে বিভিন্ন সময় কাজ করেন প্রশিকা, দৈনিক প্রথম আলো, বিবিসি, বিডিনিউজ২৪ডটকম, যমুনা টিভি, মাছরাঙা টিভি ও জাস্টনিউজে। নারীদের নিয়ে অনেক নারী সংগঠন মাঠে কাজ করে। সুপ্রীতি চেয়েছিলেন মাঠের পাশাপাশি লেখালেখির একটা প্ল্যাটফর্ম হোক। এই চিন্তা তার মাথায় প্রথমে আসে ২০০৬ সালে। ২০১১ সালে তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীরের মৃত্যু, ২০১২ সালে রামুতে হামলা, ২০১৩ তে শাহবাগের আন্দোলন সুপ্রীতিকে আমূল পাল্টে দেয়। সাংবাদিকতা আর অ্যাক্টিভিজম তাকে নতুন করে এক দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করায়। এ সময়ই মাত্র দুজনের সহায়তায় শুরু হয় উইমেন চ্যাপ্টার তৈরির কাজ।

বর্তমানে প্রবাসী সুপ্রীতি অন্যপক্ষকে বলেন, আমার এই প্রবাস জীবনে কী লাভ হয়েছে বা কী ক্ষতি হয়েছে, তা জানি না, তবে উইমেন চ্যাপ্টার আরো বেশি পরিচিত হয়েছে। যেখানেই যাচ্ছি, আমার একটাই পরিচয়, উইমেন চ্যাপ্টার। মানুষজন পড়তে পারুক বা না পারুক, তারা আগ্রহী এ নিয়ে। তারা এ নিয়ে কথা বলছে। এর কারণ একটাই, নারীরা লিখছে, সাধারণ নারীরা লিখছে। তবে যেই সেই লেখা না, ট্যাবু ভাঙা লেখা, প্রতিবাদী লেখা। এটা সাধারণদের প্ল্যাটফর্ম।

শুরুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টাকা নেই, কোনোরকম কারিগরি সহায়তা নেই, ছোট্ট এক নোটবুকে উইম্যান চ্যাপ্টারের যাত্রা শুরু। এখন পাঁচ বছর হয়ে গেছে। এখনো ভাঙা ল্যাপটপেই এর কাজ চলে। থেমে তো নেই। প্রথমদিকে সবাই নাক সিঁটকাত। এখনো সিঁটকায়। উইমেন চ্যাপ্টার করতে গিয়ে নানারকম প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে। যেহেতু পুরুষতন্ত্র এবং ধর্মান্ধতা পাশাপাশি চলে, তাই আমাদের এই ট্যাবু ভাঙার এবং প্রতিবাদ করার মানসিকতা অনেকেরই চক্ষুশূল হয়েছে। আমাকে হত্যার হুমকি, ধর্ষণের হুমকি নৈমিত্তিক হয়ে গিয়েছিল। অনেকবার সাধারণ ডায়েরিও করতে হয়েছে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে। তবু হাল ছাড়িনি। এক হাতে কাজ করছি পাঁচ বছর ধরে। একটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ব্লুগ ক্যাটাগরিতে পেয়েছিল ডয়চে ভেলে থেকে, আর এমন একটি প্ল্যাটফর্ম করার জন্য ‘অনন্যা’ পুরস্কার পেয়েছিল ২০১৬ সালে। উইমেন চ্যাপ্টারকে আমি তো শুধু পোর্টাল বলি না, এটা একটা আন্দোলন। আমি না থাকলে কেউ না কেউ একে এগিয়ে নিয়ে যাবেই যাবে। পাঁচ বছর আগে এর সূচনা হয়েছিল, এখন আরো কয়েকটি পোর্টাল গড়ে উঠেছে। একে আমি পজিটিভ সূচনা হিসেবেই দেখছি। মেয়েদের কথা বলার জায়গা এগুলো।

শুরু থেকেই ইংরেজিতে কিছু কিছু লেখা ছাপানো হচ্ছিল এই পোর্টালে। ২০১৬ সাল থেকে আলাদা করে ইংলিশেই পোর্টাল চালু হয়েছে উইমেন চ্যাপ্টারের। এর দায়িত্বে আছে সুপ্রীতি ধরের মেয়ে শুচিস্মিতা সীমন্তির। এ প্রসঙ্গে সুপ্রীতি বলেন, ইংলিশটার সুবিধা হলো এই যে, ওইটার বৈশ্বিক পাঠক আছে। অনেকেই লিখছে ওখানে যারা বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন সংগঠনের। আমরা বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে একাত্ম হয়েও কাজ করছি। যারা নারী অধিকার, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে, মূলত তাদের সঙ্গেই আমাদের কাজ।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj