মুখের রোগে অবহেলা নয়

শুক্রবার, ১০ আগস্ট ২০১৮

লালা দাঁত ও মাড়িকে ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করে যার কারণে দন্তক্ষয় এবং মাড়ির প্রদাহ বা জিনজিভাইটিস হয়ে থাকে। তাই মাড়ি রোগের ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে, আপনার লালার প্রবাহ স্বাভাবিক আছে কিনা? যদি আপনি গর্ভবতী হয়ে থাকেন এবং আপনার মাড়ি রোগ থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে আপনার শিশু নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম নিতে পারে এবং শুধু তাই নয়, ওই শিশু আকার আকৃতিতে স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হবে। গর্ভবতী মায়ের মাড়ি রোগে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে নির্দিষ্ট সময়ে।

মাড়ি রোগের মাধ্যমে যদি ব্যাকটেরিয়া ‘ভিরিড্যানস স্ট্রেপটোকক্কাই’ রক্ত প্রবাহে সংক্রমিত হয় তাহলে হার্টের ভাল্ব নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই মাড়ি রোগের ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা করবেন না। যাদের মাড়ি রোগ নেই এবং মাড়ি সুস্থ তাদের চেয়ে সর্বসাধারণের মাঝে যাদের মাড়ি রোগ আছে তাদের হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। মাড়ি রোগ ইতোমধ্যেই শীর্ষ ঘাতক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে যা হৃদরোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

সম্প্রতি জরিপে দেখা গেছে, মাড়ি রোগের ব্যাকটেরিয়া ইসোফেজিয়াল ক্যান্সার বা টিউমারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। শুষ্ক মুখ এবং জিহ্বার কারণে লালার প্রবাহ কমে যায়, ফলে ঠিকভাবে খাদ্যদ্রব্য অপসারিত হয় না। তাই দাঁতে ক্ষয় হয়ে থাকে। স্ট্রেপটোকক্কাস মিউট্যানস এবং ল্যাকটোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়া দাঁতের ক্ষয় করে থাকে। দাঁত শিরশির করলে আমরা ঠাণ্ডা খাবার খাই না। বিশেষ করে আইসক্রিম বা বরফ জাতীয় কিছু। বরফ কখনো চুষবেন না এবং কামড়াবেন না। বরফ চোষা বা কামড়ানো স্থায়ীভাবে দাঁতের ক্ষতি করতে পারে, দাঁতের এনামেলে ছোট ছোট ক্র্যাক বা ফাটল সৃষ্টির মাধ্যমে। এই ক্র্যাক বা ফাটল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় হয় এবং সবশেষে পুরো দাঁতটিতে ফ্র্যাকচার বা ফাটল সৃষ্টি হয়।

আপনার জিহ্বার রং কমলা রংয়ের মতো হতে পারে যদি ঠিকভাবে মুখ ও জিহ্বার যতœ না নেয়া হয়। যেমন জিহ্বা যদি নিয়মিত ব্রাশ বা পরিষ্কার করা না হয়। ভিটামিন ‘বি’ এবং ফলিক এসিডের অভাবে জিহ্বা লাল অথবা কমলা রং হতে পারে। অধিকাংশ সময় হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস অকার্যকর অবস্থায় অর্থাৎ সুপ্ত অবস্থায় নার্ভ সেলে থাকে। তাই এ ভাইরাসের সংক্রমণের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। হাইপার থাইরয়ডিজমের ক্ষেত্রে রোগীরা মুখে জ্বালাপোড়া এবং অস্বস্তির কথা বলে থাকেন বিশেষ করে জিহ্বার ওপর এবং গালের অভ্যন্তর ভাগে। চিকিৎসা না হলে মুখের জ্বালাপোড়া এবং অস্বস্তিভাব একটি লম্বা সময়ব্যাপী থাকতে পারে। আবার সাইকোসোমাটিক ব্যথাও মুখে একটি লম্বা সময় ধরে থাকতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই রোগী রাতের বেলা ঠিকভাবে ঘুমাতে পারে না। রোগী কখনো কখনো অস্থিরতা ও মানসিক চাপে ভুগে থাকেন। রোগীদের উচিত মুখস্ত ওষুধ সেবন না করে চিকিৎসকের কাছে সবকিছু খুলে বলা। তবেই একটি সমাধান বের হয়ে আসবে। ব্যথানাশক ওষুধ যখন সেবন করবেন বিশেষ করে এনএসএআইডি গোত্রভুক্ত ওষুধ সে ক্ষেত্রে আপনার এলকোহল সেবনের অভ্যাস থাকলে অবশ্যই এলকোহল সেবন করবেন না। আর এলকোহল সেবন বন্ধ করতে না পারলে আপনার অভ্যাসের কথা ডাক্তারকে খুলে বলুন। এ ক্ষেত্রে আপনি বিকল্প ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করবেন। কারণ এনএসএআইডি গোত্রভুক্ত ওষুধ সেবন করলে এবং পাশাপাশি এলকোহল পান করলে পাকস্থলিতে রক্তপাত হতে পারে।

প্রায় চারশর ওপরে ওষুধ শুষ্ক মুখ সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে এন্টিহিস্টামিন, ডিকনজেসটেন্টস, ব্যথানাশক ওষধ এবং বিষণœতানাশক ওষুধ উল্লেখযোগ্য যা শুষ্ক মুখের সৃষ্টি করে থাকে। আপনার টুথব্রাশ এমন কোনো জায়গায় রাখবেন না যেখানে বাথরুমে ফ্লাশ করা হয়, তা যত দামি বাথরুমই হোক না কেন। আপনার টুথব্রাশ অবশ্যই জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে। বাথরুমের যেখানে ফ্লাশ করা হয় তার খুব কাছাকাছি যদি আপনার বেসিন হয়ে থাকে তবে সে বেসিনের ওপর টুথব্রাশ না রাখাই ভালো। থাইরয়েড গ্রন্থির অচলাবস্থার জন্য আপনার পেরিওডন্টাল অবস্থার অবনতি ঘটবে। আপনার পেরিওডন্টাল স্বাস্থ্য খারাপ হলে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের মাধ্যমে আপনার হৃৎযন্ত্র আক্রান্ত হতে পারে। তাই মুখের রোগে কোনো অবহেলা করবেন না। মুখস্ত কোনো চিকিৎসা গ্রহণ করবেন না। মুখের কোনো রোগ সহজে ভালো না হলে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন এবং সুস্থ থাকুন।

ডা. মো. ফারুক হোসেন

মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ

ইব্রাহিমপুর, ঢাকা

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj