সাফল্য দেখাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তারা

সোমবার, ৬ আগস্ট ২০১৮

গত কয়েক বছরে অনলাইনভিত্তিক ই-কমার্স ব্যবসার বিশাল একটি বাজার গড়ে উঠেছে। দেশে অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারী উদ্যোক্তারা। এ ব্যবসায় কর্মজীবী নারীদের পাশাপাশি পিছিয়ে নেই ঘরের নারীরাও। অনলাইনে ব্যবসা করে ঘরে বসেই অনেক নারী উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ খাতের আওতায় চলছে ই-কমার্স বা ই-বাণিজ্য। ই-কমার্স মূলত পাঁচভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে। ব্যবসা থেকে ব্যবসা, ব্যবসা থেকে গ্রাহক, ব্যবসা থেকে সরকার, গ্রাহক থেকে গ্রাহক ও মোবাইল কমার্স। মূলত ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যম ক্রয়-বিক্রয়ই এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়। আধুনিক ই-কমার্সে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েভ ব্যবহার করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। দেশে ওয়েবভিত্তিক অনলাইন শপ রয়েছে এক হাজার। ফেসবুকভিত্তিক আছে ১০ হাজারেরও বেশি। বেসিস (বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এন্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ৪০টির মতো ওয়েবসাইটভিত্তিক অনলাইন শপ রয়েছে। অনলাইন শপিং সাইটসহ ফেসবুক পেজের মাধ্যমে এখন অনেক নারী উদ্যোক্তা ব্যবসা করছেন। বেসিসের তালিকাভুক্ত প্রায় দুই হাজার ফেসবুক পেজ আছে যার মধ্যে প্রায় তিন থেকে চারশ পেজ নারী উদ্যোক্তার। এছাড়াও এক হাজার অনলাইন শপিং সাইট আছে যার মধ্যে প্রায় দুশটি ওয়েবসাইট নিয়মিত

চলছে। এখানেও অনেক নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন। এমন সফল তিন নারী উদ্যোক্তা নিয়ে

অন্যপক্ষের এবারের আয়োজন। প্রতিবেদক সেবিকা দেবনাথ

মিজির ‘গুটিপা’

একসময় সাংবাদিকতা করলেও তাসলিমা মিজি এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। নানা প্রতিবন্ধকতা ঠেলে ২০০৮ সালে ‘টেকম্যানিয়া’ নাম দিয়ে কম্পিউটার ব্যবসা শুরু করেন তিনি। সৃষ্টিশীল কিছু করার তাগিদ থেকে তিনি শুরু করেন লেদার ব্যাগ এন্ড লেদার ফুটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ‘গুটিপা’র।

ফেসবুকে পেজ খুলে শখের বসে টোট ব্যাগ দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল গুটিপার। দাম কম ও দারুণ নকশার কারণে টোট ব্যাগের চাহিদা ও বিক্রি ছিল ভালো। এরপর একে একে ক্লাচ, পার্স, ক্রস বডি ব্যাগ, লেদারের কার্ড কেস, পেনসিল পাউচ, কয়েন পাউচ, ছেলে ও মেয়েদের মানিব্যাগ নিয়ে কাজ করেন। নিত্যনতুন গবেষণা ও ডিজাইন টেম্পলেট জড়িয়ে ‘গুটিপা’ এগিয়ে যেতে থাকে। শুরু করেন লেদারিনার ব্যানারে ব্যবসা। মূলত তিনি লেদার ও আর্টিফিশিয়াল লেদার নিয়ে কাজ করে থাকেন। সরাসরি ট্যানারির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও লেদারিনার ব্যানারে নিজেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন ‘গুটিপা’ লেদার শপ। পণ্য বানিয়ে ক্রেতার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়াই হলো তার কাজ। এ বিষয়ে একাডেমিক কোনো শিক্ষা না থাকলেও লেদারের প্রডাক্ট তৈরিতে নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেই ডিজাইন করা শুরু করেন। শুরু থেকেই খুব সাড়া পান তিনি। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে শুরু হলো ব্র্যান্ডকে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস। সেখানেও ভালো সাড়া মেলে। তার কাজ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাদৃত হচ্ছে বিদেশেও। তার অধীনে অনেক নারী কর্মী কাজ করছে।

লেদারের ব্যবসায় কেন এলেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তাসলিমা মিজি বলেন, বিজনেস করার ইচ্ছা আমার কখনোই ছিল না। বাবা বিজনেস করতেন। তার ব্যবসায়িক সাফল্য আমাকে আকৃষ্ট করত। আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণে জনশক্তি আছে। বিশেষ করে লেদার বা নন-লেদার গুডস, ফুটওয়্যার ব্যাগ এগুলোর জন্য আমাদের এখানে কাঁচামালের সহজলভ্যতাও অনেক। তা ছাড়া বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম লেদার সরবরাহকারী দেশ। তাই লেদার নিয়েই একটা কিছু করার সিদ্ধান্ত ছিল।

এই কাজ করতে গিয়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীনও হতে হয় তাকে। যা রীতিমতো বিব্রতকর। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। কেন আসলাম, এখানে কী করছি, মেয়ে হয়ে কেন এসব করতে হচ্ছে, বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ নেই নাকি- চারপাশের বাঁকা চোখের নানা কথা। কিন্তু আমি তো থেমে যাব বলে যাত্রা শুরু করিনি।

গুটিপা একদিন একটা আন্তর্জাতিক মানের বাংলাদেশি ব্র্যান্ড হবে, বিভিন্ন দেশে গুটিপার লেদার পণ্যের নিজস্ব ক্রেতা তৈরি হবে এমনটাই স্বপ্ন দেখেন তাসলিমা মিজি। সেই লক্ষ্যেই কাজ করে চলছেন নিরন্তর।

তাতিয়ার ‘তাঁতী আর তাঁত’

ইসরাত জাহান তাতিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে একটি এনজিওতে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতা এবং ছোট্ট সন্তানকে দেখাশোনার জন্য চাকরি ছেড়ে নিজেকে আত্মনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে কিছু একটা করার পরিকল্পনা করতে লাগলেন। সালটা ২০১০-১১। ফেসবুক কেনাবেচা তখন তুঙ্গে। কিছুদিন অনলাইন বাজার পর্যবেক্ষণ করে তাতিয়া দেখলেন, এর বেশির ভাগ পণ্যই চায়না, ইউকেসহ ভারতীয়, পাকিস্তানের। দেশীয় পণ্য নিয়ে হাতে গোনা কিছু মানুষ কাজ করছেন তাও সেগুলো বিভিন্ন ধরনের মিক্সড পণ্য। শাড়ির প্রতি এক ধরনের তীব্র ভালোলাগা, ভালোবাসা বরাবরই ছিল তাতিয়ার। তাই প্রাথমিকভাবে নিজের এলাকায় বিখ্যাত, ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি নিয়ে ২০১১ সালের জুন মাসে ‘তাঁতী আর তাঁত’ নামক ফেসবুকভিত্তিক পেজ দিয়ে কাজ শুরু করলেন। দেশীয় পণ্যের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে এর কার্যক্রম শুরু করেন মাত্র পাঁচ হাজার টাকা সম্বল নিয়ে।

তাঁতী ও তাঁতের যাত্রা প্রসঙ্গে তাতিয়া বলেন, প্রাথমিকভাবে ডরহমং ড়ভ ইঁঃঃবৎভষু নাম নিয়ে কাজ শুরু করলেও বর্তমানে তা ‘তাঁতী আর তাঁত’ নামে পরিচিত। শুরুটা বেশ কঠিন ছিল। প্রথমত অনলাইনে আবার কীভাবে ব্যবসা করে মানুষ- এটা পরিবারকে, সাপ্লায়ারদের বোঝাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। পণ্য যাচাই-বাছাই, সঠিক দাম, পণ্য সংগ্রহ, ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো প্রতিটা ক্ষেত্রই ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। এখন তো অনেক গোছানো। কাজের ক্ষেত্র, পরিসর, চ্যালেঞ্জ সবকিছুই বেড়েছে। চাকরি ছেড়ে দিয়ে এক ধরনের মানসিক অস্থিরতার মাঝে যখন হাবুডুবু খাচ্ছিলাম তখন এই অনলাইন বিজনেস আমাকে মানসিকভাবে শক্ত হতে সাহস জুগিয়েছে। অনেক সময় পার হয়ে গেলেও এখনো খুব উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারিনি, নানা প্রতিক‚লতার মধ্য দিয়ে ধীরগতিতে এই প্রতিষ্ঠানের কাজ চলছে। বর্তমানে দুজন স্থায়ী ও ছয়জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়ে কাজ করছে তাঁতী আর তাঁত।

ঢাকার বেইলি রোডে প্রায় দুই বছর এর জন্য কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে একটি আউটলেট ও পরিচালনা করার চেষ্টা করি। ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা থাকার পরেও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বিনিয়োগের অভাবে প্রকল্পটি মুখথুবড়ে পড়ে। কিন্তু আমি আবারো ঘরে বসে নিজের একক উদ্যোগে নতুন নাম নিয়ে কাজ শুরু করি। পরিবারকে পরিপূর্ণ সময় দেয়ার পাশাপাশি অনলাইনে মোটামুটি সফলতার সঙ্গেই এই উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছি।

এ পেশার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমানে ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা এমনিতেই বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে গেছে। অপেশাদার ব্যবসায়ীদের কারণে বাজার, ক্রেতা নষ্ট হচ্ছে- যা আমাদের দেশের অনলাইন বিজনেসের জন্য বিপজ্জনক।

বাংলাদেশের পাশাপাশি আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো কয়েকটি দেশে স্বল্প পরিসরে নিয়মিতভাবে পণ্য পাঠাচ্ছে তাঁতী আর তাঁত। তরুণ প্রজন্মের কাছে দেশীয় পোশাকের প্রতি আগ্রহ তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার তৈরির লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পনা করছেন তাতিয়া।

‘পিওর বাংলাদেশ’ নিয়ে শাহীনা

দীর্ঘ ১৬ বছর চাকরি করার পর, নিজে কিছু করার আকাক্সক্ষা থেকে সমমনা তিনজনকে নিয়ে ‘পিওর বাংলাদেশ’ গড়ে তোলেন শাহীনা রহমান। হাতে তৈরি, ঢেঁকি ছাঁটা মসলা, গ্রামীণ খাদ্যপণ্য এবং অবশ্যই দেশি পণ্য নিয়ে পিওর বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে ২০১৭ সালে।

পিওর বাংলাদেশ সম্পর্কে শাহীনা বলেন, কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখেই আমরা পিওর বাংলাদেশ গড়ে তুলি। সেগুলো হলো; ঢাকা শহরে বসে খাঁটি পণ্য পাওয়া কঠিন। কর্মজীবী নারী, যাদের অনেকটা সময় বাইরে কাটিয়ে আবার রান্নাঘরে সময় দিতে হয়, তাদের কাজ কিছুটা সহজ করে দেয়া। আমাদের দেশে অনেক দেশি ও গ্রামীণ পদ্ধতিতে তৈরি খাবার রয়েছে, যেগুলোর হয়তো শ্রম মূল্য অনেক বেশি, কিন্তু পরিচ্ছন্ন উপায়ে তৈরি করতে পারলে পুষ্টিগুণ অক্ষুণœ থাকে। সবাই যেভাবে মেশিননির্ভর, খুব দ্রুত ফল পেতে চাই, সেখানে বেশির ভাগ পণ্য কেমিক্যাল ফ্রি, হাতে তৈরি পণ্য নিয়ে কাজ করাটা অনেকটা ¯্রােতের উল্টা দিকে হাঁটার মতো।

এত পণ্য থাকতে অনলাইন ব্যবসার জন্য দেশি খাদ্যপণ্য কেন বেছে নিলেন এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকেই এই প্রশ্নটা আমাকে করেন। কেন গ্রামীণ খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করা? আমার জন্ম, বড় হওয়া পুরনো ঢাকার এক বিশাল বাড়িতে। আম, কাঁঠাল, নারকেল, মধু কোনোদিন কিনে খেতে হয়নি। গ্রাম থেকে নিয়মিত চাল, চালের আটা, ডাল, ডালের বড়ি, খেজুর এর গুড়? পাটালি আসত। আমি খুব গর্ব করেই বলি আমার চাচারা কৃষিকাজের সঙ্গে সংযুক্ত, তাই আমাকে পণ্যের মান নিয়ে তেমন মাথা ঘামাতে হয় না। পিওর বাংলাদেশের যে ছোট্ট কর্মী দলটি আমাদের সঙ্গে কাজ করে, তারাই আমাদের মূল চালিকাশক্তি। আমরা তাদের তাদের মতো করেই, খাদ্যপণ্যটি তৈরি করতে দেই। এতে গ্রামীণ স্বাদটা বেশ অক্ষুণœ থাকে। শুধু খেয়াল রাখা হয়, যেন তারা পরিচ্ছন্নতা (মুখে, হাতে, মাথায় মাস্ক/গøাভস ব্যবহার করে) বজায় রাখেন। ময়মনসিংহ ও চুয়াডাঙ্গায় পিওর বাংলাদেশের ছোট দুটি খামার আছে। দেশি এবং হাতে তৈরি পণ্য নিয়ে দুটো বাংলাদেশি ব্র্যান্ড পিওর বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে। ক্রেতার উদ্দেশে শাহীনা বলেন, ক্রেতাদের প্রতি একটাই বার্তা- দেশি পণ্য ব্যবহার করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যান। আমরা আমাদের পণ্যের প্রচার এবং ব্যবহার যদি না করি, তাহলে দেশের অর্থনীতি কী করে এগুবে? আমাদের ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোই বা কী করে বড় হবে?

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj