নারী সহিংসতায় সাইবার ক্রাইম

সোমবার, ৩০ জুলাই ২০১৮

অন্যপক্ষ প্রতিবেদক : রুমা (ছদ্মনাম) রাজধানীর বেসরকারি একটি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রী। সম্প্রতি তার ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়। বিষয়টি সে বুঝতেও পারেনি। সেই আইডি থেকে অশ্লীল ভিডিও ও ছবি প্রচারের হুমকি দিয়ে হ্যাকাররা তার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। রুমা বলেন, এ কথা জানার পর মাথায় যেন আকাশ ভেয়ে পড়ল। বিষয়টি কাউকে বলতেও পারছিলেন না। আমার এক বন্ধু আছে যে আইটিতে খুব ভালো। তাকে বিষয়টি জানালাম। সে আমাকে অনলাইন সিকিউরিটি অ্যাওয়ারনেস মিশন (অসাম)-এর সহায়তা নেয়ার পরামর্শ দেয়। ওর পরামর্শ অনুযায়ী আমি সেখানে যাই। তারা আমার আইডি উদ্ধার করে দেয়। পরে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আমাকে আইনি ব্যবস্থা নিতে থানা পুলিশের কাছে পাঠায়। বড় বাঁচা বেঁচে গেলাম।

রুমার মতো অসংখ্য নারী ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। মোবাইল ফোনের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা, ভিডিও করা, নগ্ন ছবি এমএমএস করা, ব্লুটুথের মাধ্যমে ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া, এ ধরনের কিছু বিব্রতকর ঘটনার মুখোমুখিও হচ্ছেন অহরহ।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন দেশের সাইবার অপরাধ নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী শতকরা প্রায় ৫২ ভাগ অভিযোগই আসে নারীদের থেকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী মেয়েরা। শতাংশের হিসাবে যা প্রায় ৭৪ শতাংশ। অভিযোগের একটি বড় অংশের অভিযোগ ফেসবুক সংক্রান্ত। যার মধ্যে আইডি হ্যাক থেকে শুরু করে সুপার ইম্পোজ ছবি এবং পর্নোগ্রাফির অভিযোগও আছে। তবে হয়রানির শিকার হলেও ভুক্তভোগীদের ৩০ শতাংশই এর বিরুদ্ধে কীভাবে আইনি ব্যবস্থা নিতে হয় তা জানেন না। ২৫ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হবে না ভেবে অভিযোগ করেন না।

এ ক্ষেত্রে প্রতিকারের উপায় নিয়ে স্বচ্ছ ধারণার অভাব এবং লোকলজ্জা ও ভয়-ভীতিকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এতে একদিকে যেমন নারীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, তেমনি ব্লু্যাকমেইল ও হুমকির কারণে তাদের ব্যক্তিগত জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের তদন্ত করার মধ্যেই বিতর্কিত ছবি কিংবা ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়। এ ছাড়া গুগলে স্থায়ীভাবে সেগুলো থেকেও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর ভোগান্তি হয় সীমাহীন।

এদিকে সাইবার সিকিউরিটি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের দেয়া তথ্য মতে, সারাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের যেসব মামলা হয় তা দায়েরকারীদের মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী। কিন্তু ইলেকট্রনিক আলামত প্রদর্শনে ব্যর্থ হওয়ায় ৭৫ শতাংশই খারিজ হয়ে যায়। এ ছাড়া সাইবার অপরাধের বিষয়গুলো তদন্তে পুলিশ কর্মকর্তাদের দক্ষতারও অভাব রয়েছে। অনলাইন ব্যবহারকারীদেরও সতর্ক হতে হওয়ার পাশাপাশি নিজের ফেসবুক, ই-মেইল আইডি সুরক্ষিত রাখতে এ ধরনের গোপনীয় তথ্য কারো সঙ্গে শেয়ার না করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা।

পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের ডিসি আলিমুজ্জামান বলেন, সাইবার অপরাধের ব্যাপ্তি দিন দিন বাড়ছে। এগুলোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে নতুন নতুন অপরাধ মোকাবেলা করা যাবে।

প্রতিকার

বাংলাদেশে ২০০৬ সালে প্রথম সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) প্রণয়ন করা হয়। এরপর ২০১৩ সালে এই আইন সংশোধন করা হয়। সে বছর ঢাকায় স্থাপন করা হয় দেশের একমাত্র সাইবার ট্রাইব্যুনাল। এই আইনে কারো অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও তোলা এবং তা প্রকাশ করার অপরাধে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। সাইবার হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগে একটি সাইবার হেল্প ডেস্কও রয়েছে। এই হেল্পলাইন (০১৭৬৬৬৭৮৮৮৮) সপ্তাহের সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। দেশের যে কোনো জায়গা থেকে যে কেউ হেল্পলাইনে সরাসরি ফোন করে অথবা এসএমএসের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন। এ ছাড়া সাইবার হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে হটলাইন ‘৯৯৯’ চালু করেছে সরকার। যে কেউ সাইবার অপরাধের শিকার হলে এই হটলাইনে ফোন করেও অভিযোগ জানাতে পারবেন।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj