অচিন পাখি

শনিবার, ২৮ জুলাই ২০১৮

রোমেনা লেইস

নীলার মনটা আজ খুব ভালো। নীলার ছেলে খুব ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুল স্কলারশিপসহ ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। আজ ফুরফুরে মেজাজে আছে নীলা। রান্না খাওয়ার পালা নেই। সবাই চলে গেল বাইরে। সবাই ব্যস্ত। শুধু নীলার অবসর। নীলা একটা সিডি ছাড়ল কবিতা আবৃত্তির। আর হু হু করে মন ছুটে গেল জীবনানন্দের রূপসী বাংলায়।

বরিশালের কীর্ত্তনখোলা নদী। একদিন হিজল তমালের ছায়ায় নিবিড় নিটোল নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসেছিল নীলা। যুবকের হাতে ছিল বাঁশের বাঁশি। চারদিকে বেতের ঘন গহিন ঝোপ। টুপটাপ ঝরছিল পাতা আর ফল। পায়ের আলতা ধুয়ে গিয়েছিল নদীর জলে। বেত লতার মতো কেঁপে কেঁপে উঠছিল তনুমন। বাঁশির সুরে কী এক আকুলি-বিকুলি। জগত সংসার ভুলে দুজন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। নিঝুম দুপুরে ঘুঘুর ডাকটা কান্নার মতো শোনাচ্ছিল। ঘুঘু কী তার সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলেছে। শাপলা শালুক ছড়িয়ে আছে বিলের আরেকদিকে। ঢেউয়ে দুলছে নৌকা। কলেজে পড়তে গিয়ে প্রথম পরিচয় হয়েছিল যার সঙ্গে তার নাম রবি। হ্যাঁ রবীন্দ্রনাথ সরকার। নীলার সঙ্গে পরিচয় হলো। কবিতা লেখাও শুরু হলো। কলেজের করিডোর প্রথম কাব্য। নবীনবরণ অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করল স্বরচিত কবিতা।

নীলা অপরূপ সুন্দরী। তবে কবির কবিতা বুক কাঁপায় না এত কঠিন সে হতে পারে না। নীলার বুকের গভীরে স্থান করে নেয় রবি। নীলা আর রবি কলেজ পালিয়ে কখনো নদীতে নৌকাবিহারে যায়। বাঁশি বাজিয়ে রবি উথাল-পাথাল করে দেয় নীলার হৃদয়। নীলকণ্ঠ পাখি আর ডাহুকের সঙ্গে পদ্মবিল আর পানকৌড়ির ঝিল ঘুরে বেড়ায় দুজনে। ভালোবাসা সে তো ধর্ম বর্ণ কোনো বাধা মানে না। নীলার বাবা শফিকুর রহমানের পাথর হৃদয়। হাকিম নড়ে তবু হুকুম নড়ে না। দুনিয়া উল্টে গেলেও নীলা কোনোদিনও রবির হবে না।

সে দিনও খুব গরম পড়েছিল। দুপুরবেলায় ডাকপিয়ন চিঠি দিয়ে গেল। রবি চিঠি লিখেছে প্রায় পনেরো পৃষ্ঠা। পাতায় পাতায় নীলার রূপের গুণগান। কবিতায় নীলার কপোলের তিল। নীলার দীঘল কেশ। নীলার আলতা পরা পা। নীলার চিবুক। নীলা এক দামি পাথর। যাকে অনামিকায় ধারণ করা যায় কৌলিন্য বজায় রেখে কিন্তু আটপৌরে ভাবে যেখানে সেখানে ফেলে রাখা যায় না। নীলাকে ভালোবাসা যায় কিন্তু ভালোবেসে আপন করা যায় না। নীলা, নীলা, নীলা। এত ভালোবাসা দিলে কিন্তু ধর্মের এই সীমারেখা কেন টেনে দিলে বলো?

রবির মায়ের আহাজারি আজো কানে ভেসে আসে। সেই মধ্যদুপুরে সাড়া পাড়া যখন অলস বসে আছে। ঝিম ধরা সময়। বাতাসে নরম সুপারির ফুল আর নিমফুলের ঘ্রাণ। খোকা ভাত খেতে আয় বলতে গিয়ে মা দেখেন নীল বর্ণ ধারণ করেছে ছেলে তার। নেতিয়ে পড়া শরীর। মুখ বেয়ে ঝরছে ফেনা। সেই অলস দুপুরে পুরা পাড়ার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল একটি আর্তচিৎকারে। নীলার আলতা পরা পায়ের একটি নূপুর ছিটকে পড়েছিল রাস্তায়। আজো বিবশ হয়ে যায় নীলা। শুধু বুকের ভেতর তিরতির করে কাঁপে একটি অচিন পাখি।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj