ঘুরে ফিরে আলোচনায় নেইমার

মঙ্গলবার, ২৪ জুলাই ২০১৮

হেক্সা মিশন- অর্থাৎ ষষ্ঠবারের মতো বিশ^কাপ জয়ের লক্ষ্যে ফেভারিটের তালিকায় থেকে রাশিয়া গিয়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু সমর্থকদের হতাশ করে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিতে হয় সেলেকাওদের। দলের এমন বিদায়ে মারাত্মক মর্মাহত হয়েছিলেন ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্নের সারথী নেইমার। এরপর তিনি বিশ^কাপের আর কোনো ম্যাচই দেখেননি। এমনকি বলের দিকেও তাকাতে ইচ্ছে হতো না তার। তবে এখন সেই শোক কাটিয়ে উঠেছেন বলে জানিয়েছেন পিএসজির এই তারকা।

সেইসঙ্গে পিএসজি ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে হওয়া গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড নেইমার জানিয়েছেন, ফরাসি ক্লাবটির হয়ে আরো শিরোপা জিততে চান তিনি। ইতোমধ্যে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে জুভেন্টাসে পাড়ি জমানো রোনালদোর জায়গায় স্পেনের সফলতম ক্লাবটি নেইমারকে দলে টানতে পারে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। রিয়াল অবশ্য নেইমারকে কিনতে কোনো প্রস্তাব দেয়ার কথা স্বীকার করেনি। নিজের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে নেইমার বলেন, আমি থাকব। পিএসজির সঙ্গে আমার একটা চুক্তি আছে। চ্যালেঞ্জ, নতুন কিছু অর্জন এবং আরো বড় লক্ষ্যের জন্য আমি এখানে থাকাটা বেছে নিয়েছি। এ ব্যাপারে আমি আমার মত পরিবর্তন করব না। আমি আশা করি, আমরা সফল একটা মৌসুম কাটাতে পারব, জিততে পারব নতুন শিরোপাও।

সংবাদ মাধ্যম গুজব সৃষ্টি করাটা মাঝে মাঝে নেইমার উপভোগও করেন। তবে সবাই জানে, পিএসজিকে আমি কতটা পছন্দ করি। সদ্য সমাপ্ত রাশিয়া বিশ^কাপের এবারের আসরে নেইমার মোট ৫টি ম্যাচ খেলেছেন। যেখানে গোল আদায় করতে পেরেছেন ২টি। তবে শেষ আটে বেলজিয়ামের বিপক্ষে হেরে কষ্টটা টের পেয়েছেন ভালোভাবেই। এক সাক্ষাৎকারে নেইমার বলেন, ব্যাপারটা এমন না যে, আমি আর খেলতে চাইনি। তবে বলের দিকে আমার আর তাকাতে ইচ্ছে হয়নি, এমনকি বিশ^কাপের আর কোনো ম্যাচ আমি দেখিনি।

অন্যতম ফেভারিট হিসেবে রাশিয়া বিশ^কাপ শুরু করা ব্রাজিল শেষ আটে বেলজিয়ামের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায়। বিশ^কাপে দলের এমন বিদায়ে মনে খুব দাগ কেটেছিল বলে জানান নেইমার। ছয় বছরের ছেলে ডেভি লুক্কাকে সঙ্গে নিয়ে নেইমার আরো বলেন, আমি শোকের মধ্যে ছিলাম। আমার মন খুব খারাপ ছিল। তবে তা এখন কেটে গেছে। আমার ছেলে আছে; পরিবার ও বন্ধুরা আছে। তারা আমাকে বিষণœ দেখতে চায় না। কষ্ট থেকে আমার ভালো থাকার অন্য অনেক কারণ রয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া বিশ^কাপে নেইমার অবশ্য পারফরমেন্স প্রদর্শনের চেয়ে সমালোচনার শিকারই বেশি হয়েছেন। ট্যাকেলের শিকার হয়ে মাঠে তার পড়ে যাওয়া বিরোধী সমর্থকরা ভালো চোখে দেখেননি। তবে দলের প্রয়োজনে তার অবদান ছিল অসামান্য।

বিশ^কাপে ফাউলের শিকার হয়ে রেফারির সহানুভূতি পেতে অভিনয় করতে দেখা গেছে নেইমারকে। এ জন্য সমালোচিতও হয়েছেন। তবে নেইমার মনে করেন, তাকে রেফারিদের আরো বেশি সুরক্ষা দেয়া উচিত ছিল। আমি খেলতে, প্রতিপক্ষকে হারাতে বিশ^কাপে গিয়েছিলাম; লাথি খেতে নয়। আমার সমালোচনাগুলো ছিল অতিরঞ্জিত। তবে আমি পরিণত, এসব সামলে নেয়ায় আমি অভ্যস্ত।

ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্নের সারথী নেইমার মাঠের পারফরমেন্সে অনেক তারকার চেয়ে এগিয়েও ছিলেন। কিন্তু টুর্নামেন্টে তার খেলা নিয়ে যতটা না কথা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি কথা হয়েছে মাঠে গড়াগড়ি নিয়ে। একটু ছোঁয়াতেই পড়ে যাচ্ছেন নেইমার, করছেন অভিনয়- এমন হাজারো অভিযোগ ছিল ব্রাজিল সুপারস্টারের বিরুদ্ধে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কত যে ট্রল হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই! বিষয়গুলো যে নেইমারের নজরে আসেনি এমন নয়। পিএসজি ফরোয়ার্ড এসব সমালোচনা আর ব্যঙ্গতে বেশ কষ্টও পেয়েছেন।

রাশিয়া বিশ^কাপের অন্যতম ফেবারিট ছিল ব্রাজিল। কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়ে বেলজিয়ামের কাছে অপ্রত্যাশিত এক হারে ভেঙেছে স্বপ্ন। নেইমার পারেননি, পারেননি দলকে ট্রফি এনে দিতে। সেই কষ্ট তো আছেই, এর মধ্যে টুর্নামেন্টে বারবার ফাউল হওয়া নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ, ব্রাজিল ফরোয়ার্ডের মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক।

মনের দুঃখটা গোপন করেননি নেইমার। বারবার ফাউল হয়েছেন। এর মধ্যে সমালোচনায় কতটা কষ্ট পেয়েছেন, জানিয়ে তিনি বলেন, আমার ছেলে আছে, আছে পরিবার-বন্ধুবান্ধব। তারা কেউ আমাকে এমন অবস্থায় দেখতে চায়নি। যে ফাউলের শিকার হয় তাকে নিয়ে মানুষজন ব্যঙ্গ করতে ওস্তাদ, কিন্তু যে ফাউল করে তাকে নিয়ে নয়। আমি বিশ^কাপে খেলতে গিয়েছিলাম, গিয়েছিলাম প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলতে, লাথি খেতে নয়। আমাকে নিয়ে যে সমালোচনা, সেটা অতিরঞ্জিত। তবে আমি এমন একটা ছেলে, যে কিনা এ সবের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত।

রাশিয়া বিশ^কাপে সবচেয়ে বেশি ফাউলের শিকার হয়েছেন নেইমার। মাঝেমধ্যে নাকি এমনো মনে হয়েছে, কেন যে রেফারি হলেন না নেইমার। পিএসজি তারকা বলেন, আমি তো একইসঙ্গে রেফারি আর খেলোয়াড়ের ভূমিকা পালন করতে পারি না। তবে মাঝেমধ্যে এমন মনে হয়েছে, যদি সেটা হতে পারতাম!

রাশিয়ার বিশ^কাপে বড় তারকা হিসেবেই গিয়েছিলেন নেইমার। তার দল ব্রাজিলও ছিল টুর্নামেন্টের হট ফেভারিট। কিন্তু ব্রাজিল ও নেইমার দুই-ই হতাশ করেছে ভক্তদের। ‘হেক্সা’ জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল তাদের। আর নেইমার পায়ের জাদুর চেয়ে আলোচনায় ছিলেন বেশি ‘অভিনয়ের’ জন্য। আলোচনা বলতে সমালোচনা, মানে নেতিবাচক আলোচনায় ছিলেন তিনি। মাঠে ফাউলের শিকার হওয়ার ‘অভিনয়’ করে। এতদিন বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকলেও অবশেষে মুখ খুলেছেন ব্রাজিলের এই পোস্টার বয়। কষ্টের পাশাপাশি তাকে নিয়ে অন লাইনে ট্রল করাকে মজা হিসেবেই নিয়েছেন তিনি। বিশে^র সবচেয়ে দামি এই ফুটবলার জানিয়েছেন, তাকে নিয়ে অন লাইনে যে ট্রল হয়েছে, তা তিনি উপভোগ করছেন। এটাকে মজা হিসেবেই নিয়েছেন, আমি ওই কৌতুকগুলো দেখেছি। কিন্তু আমি এগুলোকে মজা হিসেবেই নিয়েছি।

ফরোয়ার্ড হিসেবে প্রতিপক্ষের ফাউলের শিকার সবসময় হন নেইমার। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে বিশ^কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ফাউলের শিকার হয়ে তাকে হাসপাতালেও যেতে হয়েছিল। এমনকি রাশিয়ার বিশ^কাপেও তিনি ইনজুরি থেকে উঠেই খেলতে গিয়েছিলেন। পুরোপুরি সেরে ওঠার আগে। টুর্নামেন্টে ফাউলের শিকারও তিনি হয়েছেন অনেক বেশি। নেইমার জানান প্রতিপক্ষের দিকে আক্রমণ নিয়ে গেলে ফাউলের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ২৬ বয়সী এই তারকা বলেছেন, আমার কাজ হচ্ছে ড্রিবল করা ও প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়া। আমি প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারি না, প্রিয় বন্ধু, মাফ করবেন, আমি একটি গোল করতে চাই। আমি এটা করতে পারি না। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে অতিক্রম করতে হবে। আমাকে কিছু একটা করতে হবে এবং সেও আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে দেবে না। সে আমাকে ফাউল করার চেষ্টা করবে। এ পরিস্থিতিতে ট্যাকেলের শিকার হওয়া থেকে বাঁচতে কৌশলের আশ্রয় নিতেই হয় নেইমারকে। কারণ ফাউলের শিকার হয়ে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়েছে বহুবার। নেইমারের কথায়, অনেক সময়ই আমি অন্য খেলোয়াড়ের চেয়ে দ্রুত ও হালকা ছিলাম, তারা আমাকে ট্যাকেল করেছে। আপনি কি মনে করেন, আমি সবসময় ট্যাকেলের শিকার হব? না, এটা খুবই যন্ত্রণার, আঘাতের। খেলার পর ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা আমাকে বরফে পা ডুবিয়ে রাখতে হয়।

:: আ ত ম মাসুদুল বারী

গ্যালারি'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj