অনন্য উচ্চতায় ফখর জামান

মঙ্গলবার, ২৪ জুলাই ২০১৮

দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য অকাতরে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন! তবে কি এখন দেশ সেবা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন? না, এখনো দেশ সেবাতেই ব্যস্ত। তবে দেশ সেবার পন্থাটা একটু ভিন্ন। দেশের হয়ে কাজ করার জন্য নৌবাহিনীতে যোগ দেন দিয়েছিলেন ২০০৭ সালে। সেখানে ছয় বছর কাজ করার পর চাকরি ছেড়ে দিয়ে ক্রিকেটে মনোনিবেশ দেন। আর সাফল্যও অভাবনীয়। পাকিস্তান ক্রিকেট দলের পক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করার গৌরব অর্জন করেন। বলছি পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ওপেনার ফখর জামানের কথা। সদ্য শেষ হওয়া জিম্বাবুয়ে-পাকিস্তান ওয়ানডে সিরিজে চতুর্থ ম্যাচে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ষষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি করার গৌরব অর্জন করেন। অপরাজিত ২১০ রান করে পাকিস্তানের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান এবং ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারীও এখন তিনি। সেইসঙ্গে আইসিসির ইতিহাসে দ্রুত হাজার রান সংগ্রহকারী ব্যাটসম্যানও এ পাকিস্তানি ক্রিকেটার। পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ওপেনার ফখর জামানের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের গল্পটা সত্যিই মনোমুগ্ধকর একটি কাহিনী! তার ক্রিকেটে আসার গল্পটা দিয়ে সিনেমা বানানো হলে তা যে ব্যবসা সফল হবে এ কথা হলফ করে বলা যায়! হয়তো তিনি নিজেও জানতেন শেষ পর্যন্ত দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলতে পারবেন। পাকিস্তানের কাটলং প্রদেশের মারদন জেলায় ১৯৯০ সালের ১০ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বাবা তা পছন্দ করতেন না। দেশপ্রেমিক বাবা চাইতেন তার ছেলে দেশের জন্য কাজ করুক, দেশবাসীর সেবা করুক। বাবার বাধ্য ছেলে না করতে পারেননি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে জন্মভূমি ছেড়ে করাচিতে পাড়ি জমান। করাচিতে অবস্থিত পাকিস্তান নেভি স্কুলে নৌবাহিনীর প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করেন। ২০০৭ সালে যোগ দেন পাকিস্তানের নৌবাহিনীতে। সেখানে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে থাকেন। কঠোর পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করায় খুব শিগগিরই সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হন। সেখানে তিনি সৈনিক পদ লাভ করেন। কিন্তু সৈনিক ফখর জামান বাবার ইচ্ছায় নৌবাহিনীতে যোগ দিলেও ক্রিকেট নিয়েই ভাবতেন সব সময়। ভাবনা থেকেই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন ২৮ বছর বয়সী এ ক্রিকেটার। জায়গা করে নেন পাকিস্তান নৌবাহিনীর ক্রিকেট দলে। ক্রিকেটে দুর্দান্ত খেলতে থাকেন পাকিস্তানের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান। ফখর জামানের ক্রিকেট প্রতিভা কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন পাকিস্তান নৌবাহিনীর কোচ আজম খান। ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে পরামর্শ এবং অনুপ্রেরণা দুটিই দেন। বাবার অনেকটা অবাধ্য হয়ে ২০১৩ সালে কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। ছেড়ে দেন নৌবাহিনীর চাকরি। সে সময় বাবা-ছেলের সম্পর্ক দা-কুমড়ার মতোই ছিল। দীর্ঘ তিন বছর অনুশীলন চালানোর পর ২০১৬ সালে পাকিস্তান কাপ ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশ নেন। সেবার পাকিস্তান লিগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান করার গৌরব অর্জন করেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত পারফরমেন্স করায় ২০১৭ সালের পাকিস্তান সুপার লিগে লাহোর কালান্দার্স ফখর জামানকে দলে ভিড়ায়। সেখানে প্রত্যাশী অনুয়ায়ী সাফল্য লাভ করেন তিনি। সুপার লিগে দুর্দান্ত ব্যাট করায় অনেকে ফখর জামানকে নিউজিল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার বেন্ডন ম্যাককালামের উত্তরসূরি মনে করেন। এ সময় পাকিস্তানি কোচ মিকি আর্থারের নজরে পড়েন ফখর। টুর্নামেন্ট শেষে পাকিস্তানি কোচ তাকে অনুশীলনে ডাকেন এবং পাকিস্তান জাতীয় দলের সঙ্গে প্র্যাকটিস করান। ২০১৭ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি গ্লোবাল লিগে দুরবান কালান্দার্সের পক্ষে খেলার গৌরব অর্জন করেন। যদিও টুর্নামেন্টটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে ব্যর্থ হয়। এর আগে সে বছরের মার্চ মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের স্কোয়াডে জায়গা করে নেন। ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ উইন্ডিজের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তার অভিষেক হয়। সে বছর আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্যতাও অর্জন করে নেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে মাঠে নামেন। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি করে একটি রেকর্ডও গড়ে ফেলেন। আইসিসি কর্তৃক অনুষ্ঠিত যে কোনো ফাইনাল ম্যাচে পাকিস্তানের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরি করেন ফখর। এদিন ভারতকে ১৮০ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়ে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শিরোপা জেতে পাকিস্তানিরা। সদ্য শেষ হওয়া পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান ২৮ বছর বয়সী এ ক্রিকেটার। সিরিজের চতুর্থ ওয়ানডে ম্যাচে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে ষষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি করার গৌরব অর্জন করেন। আর পাকিস্তানের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ানও তিনি। পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার সাঈদ আনোয়ারের করা ১৮৮ রানের ব্যক্তিগত ইনিংসকেও টপকাতে সক্ষম হয়েছেন ফখর জমান। হয়েছেন আইসিসির ওয়ানডেতে দ্রুত হাজার রান সংগ্রহকারী ব্যাটসম্যান। এখন পর্যন্ত ১৮টি ওয়ানডে ম্যাচে ১০৬৫ রান করতে সক্ষম হন বিশ^ ক্রিকেটার এ বিস্ময়কর ব্যাটসম্যান। আর সেঞ্চুরি করেছেন তিনটি। ২০টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে চারটি হাফসেঞ্চুরি করার পাশাপাশি সংগ্রহ করেছেন ৬৪৬ রান।

::মকুল মুর্শেদ

গ্যালারি'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj