নারীদের মুখে পূর্ণ হাসি ফোটাতে চাই : একান্ত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম

সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮

সেবিকা দেবনাথ

তিন যুগেরও বেশি সময় আর্ত-মানবতার সেবায় বিরামহীন কাজ করে চলছেন অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম। তার জীবনের একটাই ব্রত প্রতিটি নারীর মুখে তিনি হাসি ফোটাতে চান। নির্যাতিত ও নিগৃহীত নারীরা একদিন সাবলম্বী হবে, পরিবার-পরিজনদের নিয়ে সুখে থাকবেন।

হোসনে আরা বেগম ঠেঙ্গামারা মহিলা যুবসংঘের (টিএমএসএস) প্রধান। ১৯৮০ সালে এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন তিনি। তবে ভিক্ষুকদের মুষ্ঠি চালের মধ্য দিয়ে সমবায়ী কায়দায় ১৯৬৪ সালে টিএমএসএস আত্মপ্রকাশ করে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত করতে থাকে। সেই সময় এ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ হিসেবে দেয়া হতো চাল। একাত্তর সালে দেশজুড়ে যখন ধ্বংসযজ্ঞ চলে তা থেকে টিএমএসএসও রেহাই পায়নি। প্রতিষ্ঠানের যেটুকু সম্বল ছিল সেগুলো ভস্মীভূত হয়। ১৯৮০ সালে ২০৬ মণ চাল এবং ১২৬ জন নারী ভিক্ষুক সদস্য নিয়ে কাজ শুরু করেন হোসনে আরা। নিজের প্রজ্ঞা ও একাগ্রতা দিয়ে গ্রামের তৃণমূল পর্যায়ের এই প্রতিষ্ঠানকে তিনি গড়ে তুলেছেন দেশের একটি অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন হিসেবে।

যাত্রা শুরুর কথা বলতে গিয়ে অধ্যাপক হোসনে আরা বলেন, আমি ১৯৮০ সালে টিএমএসএস-এর দায়িত্ব নেই। তখন সর্বনি¤œ ১০ কেজি থেকে সর্বোচ্চ এক মণ চাল ঋণ দেয়া হতো। সংগঠনের শক্তি বাড়াতে সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। এরই পরিপ্রেক্ষিতেই ওই বছর সেপ্টেম্বর মাসে ভিক্ষুক সম্মেলন করি। সদস্য সংখ্যা ১২৬ থেকে বেড়ে হলো ৩৭৪। মুষ্ঠিচালের পরিমাণ বাড়লেও তখন চালের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তখন সিদ্ধান্ত হয় ভিক্ষুকরা সংগৃহীত চাল নিজেরাই বিক্রি করবেন তবে সংগঠনে জমা দেবেন ২ টাকা। ১৯৮১ সাল থেকে চালের বদলে টাকা ঋণ দেয়া শুরু হয়। তখন সর্বনি¤œ ২০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা ঋণ দেয়া হতো। বর্তমানে সর্বনি¤œ ৫ হাজার এবং সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়।

ড. হোসনে আরা দায়িত্ব নেয়ার পর টিএমএসএস-এর বিস্তৃতিও বেড়েছে। দেশের ৬৪টি জেলায় টিএমএসএস-এর ১৬০০ অফিসে ৩১ হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মরত রয়েছে। রয়েছে ৬ হাজার বিঘার মতো জমি। ১ লাখ ১২ হাজার সমিতি টিএমএসএসের আওতাভুক্ত। ৩৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছে এই প্রতিষ্ঠান। গড়ে উঠেছে মেডিকেল কলেজ, রাবাতুল্লা হসপিটাল, ফাইভ স্টার মেমো জন হোটেল রিসোর্ট, সিএনজি স্টেশন, পেট্রোল পাম্প, রিয়েল এস্টেট ব্যবসা।

সংগঠনের উদ্দেশ্য ও আদর্শ বা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী কী পরিমাণ উপকৃত হচ্ছে বা হয়েছে জানতে চাইলে হোসনে আরা বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বহুবিধ কল্যাণের স্বার্থেই সংগঠনটির জন্ম। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, মাইক্রো ফাইন্যান্সের মাধ্যমে ৫০ লাখেরও বেশি পরিবার উপকৃত হয়েছে। আমি চাই প্রতিটি নারীর মুখে পূর্ণ হাসি ফোটাতে। কিন্তু নারীরা একা একা হাসতে পারে না। তার পরিবার-পরিজন না হাসলে নারী হাসতে পারে না। তাই আমরা পরিবারভিত্তিক কার্যক্রম করে থাকি।

যে কোনো দুর্যোগে ত্রাণসহ বিভিন্ন সহযোগিতার হাত বাড়ায় টিএমএসএস। রোহিঙ্গা সংকটেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ড. হোসনে আরা বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য মেডিকেল টিম, ত্রাণ সরবরাহ, রাস্তাঘাট ও পানির সরবরাহ করা হয়েছে। এখনো তিনটি সাব-ক্লিনিকের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে টিএমএসএস। সরকার-এ জনগোষ্ঠীর জন্য যদি স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করে সেখানে আমরা স্থায়ীভাবে কাজ করবা।

কাজ করতে গিয়ে প্রতি পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, যে কোনো উন্নয়ন ও উদ্যোগে বাধা আসবেই। শুরুর দিকে প্রতি পদে পদে বাধা পেয়েছি। এখনো পাই। তবে বাধার ধরন এখন বদলে গেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমন্বিত, বহুমুখী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখি। মানুষে মানুষে কোনো সংঘাত থাকবে না, দুর্ভাবনামুক্ত সমাজ দেখতে চাই। সবাই সবাইকে ভালোবাসবে, ভালো লাগবে- এ রকম সমাজ দেখতে চাই। সেলক্ষ্যে কাজ করতে চাই। অনেক কাজ এখনো বাকি। ইতোমধ্যে ৬৪ জেলায় নি¤œ খরচে হাউজিং প্রজেক্ট এবং চালক ভবন বানানোর কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। চালক ভবনে বাস ও ট্রাক চালকদের থাকা-খাওয়া ও বিশ্রামের সুযোগ থাকবে। অনেকটা স্বল্প খরচে হোটেলের মতো। এ জন্য বোর্ড আমাদের ৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে। কাজ শুরু করব। গ্রামে গ্রামে নারীদের সংগঠিত করে আরো সংগঠন গড়ে তুলতে চাই। নারীরা সংগঠিত হলেই তাদের শক্তি বাড়বে। নারীদের অর্ধচন্দ্র হাসি পূর্ণ হাসিতে পরিণত হবে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj