গণপরিবহনে সংরক্ষিত নারী আসন : ভোগান্তির আরেক নাম

সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮

অন্যপক্ষ প্রতিবেদক : সমবায় ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় কর্মরত শ্যামলির বাসিন্দা খালেদা আক্তার। প্রতিদিনই শ্যামলি ওভারব্রিজের নিচে গাড়ির জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়। কিছুক্ষণ পরপর বাসও আসে। কিন্তু ভিড় ঠেলে উঠতে উঠতে বাস আবার ছেড়ে দেয়। অফিসে দেরি হওয়ায় শঙ্কায় অনেক সময় চলন্ত বাসেও দৌড়ে ওঠার চেষ্টা করেন। সব সময় যে সফল হন তেমনটি নয়। দীর্ঘ সময় পর ভিড় ঠেলে কোনো রকমে একটি বাসে উঠতে পারলেও বাসে বসার জন্য সিট পান না। সিট পাওয়া তো দূরের কথা ভালোমতো দাঁড়ানোরও জায়গা হয় না অনেক সময়।

বাসা থেকে অফিস এবং অফিস থেকে তার বাসায় ফেরার সময়টাকে তিনি আখ্যা দেন ‘যুদ্ধ’ হিসেবে। প্রতিদিন সকাল-বিকেল অফিস টাইমে গাড়িতে উঠতে সবাইকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। পুরুষরা কোনোভাবে সেই যুদ্ধে পার পেলেও আমাদের শিকার হতে হয় সীমাহীন ভোগান্তি। এ ভোগান্তি আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

গোপীবাগে বসবাসরত সিটি কলেজের শিক্ষার্থী অন্তরা দত্ত। তিনি বলেন, বাসে মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত সিটে পুরুষ যাত্রী বসে থাকেন। ওই সিটে বসে থেকেও সিট না থাকার অজুহাতে নারী যাত্রীদের তুলতে বাসের হেলপারদের তারা মানা করেন। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে অন্য পুরুষ যাত্রীরা বলেন, আপনারা না কথায় কথায় সমঅধিকারের কথা বলেন। তাহলে বাসের সিটের বেলায় কেন সংরক্ষিত আসন খোঁজেন? প্রতিক‚ল পরিবেশ কিংবা রাতে ফাঁকা সিটের আশায় নারীদের রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকাটাকে তারা নিরাপদ বলে মনে করেন। প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ লোকদের তো বাসে তুলতেই চায় না।

গণপরিবহন নিয়ে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা খালেদা ও অন্তরার মতো অসংখ্য নারীর। গণপরিবহনে নারী-শিশু-প্রতিবন্ধীদের জন্য ৯টি সিট বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিন থেকে চার সিটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ ছাড়া সংরক্ষিত ওই আসন অনেক সময়ই পুরুষ যাত্রীদের দখলে থাকে। এ নিয়ে কথা বললেই শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক। এ ছাড়া যানবাহন স্বল্পতাও রয়েছে। যানবাহনে ওঠার ক্ষেত্রে নারী শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা খুব বেশি একটা নজরে পড়ে না। পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যানবাহনে উঠতে গিয়ে প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানিসহ নানা রকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে নারীরা।

মেশকাত পরিবহনের (চিটাগাং রোড টু মোহাম্মদপুর) একজন হেল্পার রুবেল বলেন, ‘সব যাত্রীই আমাদের কাছে সমান। সবাই ভাড়া দিয়া যায়। কিন্তু সিট না থাকলে মহিলা তুললে অনেক পুরুষ যাত্রী চিল্লায়। কিছু পুরুষ পেছনে সিট থাকলেও মহিলা সিটে বসে। মহিলা উঠার পর তাগরে সিট ছাড়ার কথা কইলে তারা ঝগড়া বাধায়ে দেয়। মারতেও আসে। আবার অনেক মহিলা বাসে উঠার পর গায়ে একটু ধাক্কা লাগলে পুরা বাস তুইলা বসায়। আমরা কি করমু বলেন?’

নারী ও শিশুদের ভোগান্তি কমাতে ২০০৮ সালে ঢাকায় মিনিবাসে ৬টি, বড় বাসে ৯টি এবং বিআরটিসি বাসে ১৪টি আসন ‘নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণের’ শর্ত দেয় ঢাকা মহানগর পরিবহন কমিটি। এরপর থেকে বাসের নির্দিষ্ট সিটের ওপরে লেখা হয় ‘নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত’। রাজধানীতে চলাচল করা মিনিবাসগুলোয় অলিখিতভাবে চালকের বাঁ পাশের লম্বা আসন নারীদের জন্য বরাদ্দ। সেখানে চারজনের আসনে গাদাগাদি করে বসানো হয় পাঁচজন। নারীদের সংখ্যা আরো বেশি হলে তাদের বসতে হয় ইঞ্জিনের ওপর তপ্ত বনেটে। অথচ রুট পারমিটে শর্ত হিসেবে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষিত রাখতে বলা হয়েছে চালকের পেছনে।

নারীদের ভোগান্তির কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার (বিআরটিসি) ১৯৯০ সালে প্রথম ঢাকা শহরে দুটি রুটে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক হওয়ায় মাত্র ৮ মাস পরেই তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে তা চালু হয়। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নারীদের জন্য নিরাপদ যানবাহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বর্তমানে বিআরটিএ কর্র্তৃক ১৫টি রুটে ১৮টি বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো দুটি বাস। চট্টগ্রামে দুটি রুটে দুটি বাস চালু রয়েছে। সর্বমোট ২২টি মহিলা বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হলে সেই গাড়ির রুট পারমিট বাতিল করার মতো শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

গণপরিবহনে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে পুরুষ যাত্রী বসলে জেল ও জরিমানার বিধান রেখে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৭’-এর নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ওই আইন অনুযায়ী নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়োজ্যেষ্ঠ যাত্রীর জন্য সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনো যাত্রী বসবেন না বা বসার অনুমতি দেয়া যাবে না। এটা লঙ্ঘন করলে এক মাসের কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়।

সংসদ সদস্য ও কর্মজীবী নারীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শিরীন আখতার বলেন, যে দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারী; সেই দেশে নারীদের জন্য ৬/৯টা সিট বাসে সংরক্ষণের বিষয়টিও বৈসাদৃশ্য ব্যাপার। তারপরও নারীদের জন্য বাসে সংরক্ষিত সিট থাকাটা দরকার। সিট সংরক্ষণ থাকার মানে এই নয় যে, অনান্য সিটে নারীরা বসতে পারবেন না বা সিট খালি না থাকলে বাসে নারীরা উঠতে পারবেন না।

ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশের ন্যাশনাল এডভোকেসি অফিসার মারুফ রহমান বলেন, গণপরিবহনে সংরক্ষিত সিট কিন্তু শুধুমাত্র নারীর জন্য নয়। ওই ৯টি সিট নারীর পাশাপাশি শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্যও। নারীদের জন্য আলাদা করে সিট বরাদ্দের চেয়ে গণপরিবহন উন্নত করা দরকার। গণপরিবহনকে নারীবান্ধব করা দরকার।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj