কিছু না পাওয়ার গল্প

শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮

** সাধন সরকার **

আশা-নিরাশার দোলাচলে জীবন নামের রেলগাড়ি ছুটে চলে। সংগ্রাম থেকে যখন কাক্সিক্ষত সাফল্য না মিলে তখন সবই মনে হয় গরল ভেল। জীবনের চিত্রনাট্য বদলায় ক্ষণে ক্ষণে। জীবন নামের রঙ্গমঞ্চে বড় অভিনয়টা এখন করতে হচ্ছে নিজের সঙ্গে। সাম্প্রতিককালে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া দিক পরিবর্তনকারী বড় বড় বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে বারবার উল্টোটা ঘটছে। এ যেন অমোঘ নিয়তি! আনন্দ-বেদনার জীবনে মাঝে মাঝে কোনো কোনো বিষয় শিহরণ জাগায় বটে!

রুম্পার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল আরো অনেক আগে। আমলে নিইনি। কিন্তু এবার আর না করলাম না। অত সব আগে-পিছে না ভেবে বিয়ের জন্য জীবনে প্রথম কোনো মেয়ে দেখতে রাজি হই। রুম্পা ঢাকায় থাকে। সদ্য চাকরি পেয়েছে। পেশায় নার্স। ঢাকায় নিজেরও চাকরির সুবাদে দেখা করতে অসুবিধা হবে না বিধায় দ্রুত এ পর্বটার ইতি টানতে চাই। রুম্পার ব্যাপারে তার আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ভাসাভাসা কিছু তথ্য জানলাম বটে, কিন্তু মনঃপূত হলো না। দেখা করতে যাওয়ার আগে ফোন নাম্বার জোগাড় করে ফোন করলাম এই ভেবে যে, কথা বললে অন্তত অচেনা-অদেখা মেয়েটার সম্পর্কে কিছুটা আন্দাজ করা যাবে। দুজনের কথোপকথন চলতে থাকে। কথাবার্তার এক পর্যায়ে খোলা মনে বললাম, ‘সত্য বললে খুশি হবো; আপনার কি কারো সঙ্গে কোথাও সম্পর্ক আছে?’ উত্তরের সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘না, তবে আপনার কি কারো সঙ্গে সম্পর্ক আছে?’ তার বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমেও জানতে চেষ্টা করলাম ওর কোনো সম্পর্ক আছে কিনা। কার না প্রেম-ভালোবাসা থাকে! সম্পর্ক না থাকাটাই বরং অস্বাভাবিক! কিন্তু রহস্যময় বনে যাওয়া রুম্পার সম্পর্কের ব্যাপারে তেমন তথ্য পেলাম না। তবে জানতে পারলাম, প্রায় অর্ধযুগ যাবৎ তার একটা সম্পর্ক ছিল। এক বছর হলো সে সম্পর্কের ইতি ঘটেছে!

রুম্পা যেহেতু ঢাকায় চাকরি করে সেহেতু সেখানকার চাকরিজীবী কোনো ছেলের সঙ্গে তার বিয়েটা হবে, এটাই চাওয়া। তাই পারিবারিকভাবে এখন বিয়ের চেষ্টা চলছে।

অতঃপর দুজনে কোনো এক বিকেলে প্রকৃতির সান্নিধ্যে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। দেখা হলো, কথা হলো। হলো ভাব বিনিময়! দুজন দুজনের সম্পর্কে নিজেদের কর্মস্থলসহ বিভিন্ন বিষয়ে জানার চেষ্টা করলাম। যতটা ভেবেছিলাম ও শুনেছিলাম তার চেয়ে রুম্পাকে আরো ভালো ও অন্যরকম মনে হলো! অজান্তেই অদৃশ্য টান অনুভব করলাম। সৃষ্টি হলো আবেগের (যদিও এটাই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল)! ফিরে এসে রাতে ফোনে কথা প্রসঙ্গে বললাম, ‘আমরা কি এগোতে পারি? আপনার পছন্দ…।’ ও বলল, ‘হ্যাঁ, তবে সবকিছু আমার পরিবার জানে।’ বুঝলাম, পারিবারিক মূল্যবোধ অনেক শক্তিশালী! লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে রুম্পার পরিবারের সঙ্গে নিজেই যোগাযোগ করলাম। সময় প্রার্থনা করলাম। রুম্পার পরিবার আমার পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেয়।

সবকিছু ঠিকঠাক মতো চলছে। প্রতিদিনই রুম্পার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ছে। একই শহরে থাকার সুবাদে আবার দুজনে দেখা করতে মনস্থির করি। বললাম, ‘কালকে তো আমরা আবার দেখা করতে যাচ্ছি, তো কালকে আপনি শাড়ি পরে আসেন।’ ও যুক্তি দিয়ে বলল, ‘আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে, এই উৎসবহীন সময়ে ভরদুপুরে একা একা একটি মেয়ে শাড়ি পরলে রাস্তার মানুষ কী ভাববে? অন্য একসময় পরব—-।’

ভাবলাম, সত্যিই তো তাই! কিছুটা আবেগতাড়িত হয়ে বলে ফেললাম, ‘তাহলে অন্তত এখন আমরা ‘আপনি’ থেকে ‘তুমিতে’ আসতে পারি।’ ও খোলা মনেই বলল, ‘এখন না আরো পরে, সময় আসবে।’ এবারো জেদ করলাম না, ওর যুক্তি মেনে নিলাম। এরই মধ্যে রুম্পা বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। ওর অসংলগ্ন কথাবার্তায় আমার কাছে সবকিছু এলোমেলো মনে হতে লাগল। ফেসবুকের ম্যাসেজে কথা চলতে থাকে।

অতঃপর রুম্পার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। শহীদ মিনার ও টিএসসিতে রুম্পার একজন বান্ধবী ও আমার আরো দুজন বন্ধুসহ অনেকক্ষণ সময় কাটালাম। এরই মধ্যে আবিষ্কার করে ফেললাম, রুম্পা কোনো একটা বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। ইতোমধ্যে একই সঙ্গে থাকা রুম্পার সবচেয়ে কাছের বান্ধবীর বিয়ে হয়ে যায়। কেন জানি রুম্পা নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে থাকে। রুম্পা প্রায়ই একই ধরনের কথা বলে যাচ্ছে। ওর ঢাকার কোনো এলাকায় থাকতে পছন্দ, কোথায় রুম নিলে দুজনের সুবিধা হয়, কেমন রুম পছন্দ, দ্রুত বিয়ে করলে ভালো হয় ইত্যাদি নানা বিষয়াদি নিয়ে নিয়মিতই কথা হয় ওর সঙ্গে। ইতোমধ্যে বান্ধবীর বিয়ে হয়ে যাওয়ায় আগের রুম ছাড়ার পর রুম্পা থাকার সমস্যায় পড়ে যায়।

এ সময়ে এসে নতুন রুম নেয়া, নতুনভাবে থাকা ওর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়! এর থেকে বরং একেবারে বিয়েই ভালো!

পরের দিন হঠাৎ করেই ও বলল, ‘আপনি কি এখন বিয়ে করতে তৈরি আছেন, রমনা কালীমন্দিরে কালকেই বিয়ে করলে কেমন হয়! আপনার কিছু বলার আছে—-।’ আমি অকালকুষ্মাণ্ড বনে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম, এ মেয়ে ঠিক কোনো পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে আমাকে এমন কথা বলতে পারল!

উত্তরে বললাম, ‘এমনভাবে কেন বলছেন? পারিবারিকভাবে বিয়ে করতে সমস্যা কোথায়? সবকিছুর একটা প্রস্তুতিও তো দরকার। এক মাস পরে বিয়ে হবে বলে আপনার পরিবারকে বলেছি। আপনার পরিবার সম্মতি দিয়েছে। আমার একটি পারিবারিক সমস্যা আছে! তাছাড়া নতুন রুম নেয়া, বিয়ের খরচ, ইত্যাদি…। এক মাস সময় দরকার।’ ও কিছুটা বিরক্তির সুরে বলল, ‘সমস্যা নেই, টাকা লাগলে আমি দিচ্ছি!’ বুঝতে পারছি আমার যুক্তি ওর মনঃপূত হলো না।

রুম্পা কয়েকদিন পর তার বিয়েতে আমাকে নিমন্ত্রণ দেয়। সে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে জানালো, সে অন্য এক ছেলেকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জানতে পারলাম, সে ছেলে রুম্পার পুরনো প্রেমিক। রুম্পার পরিবারও আমাকে এ ব্যাপারে আর কিছুই জানায়নি।

অনেক চেষ্টা করেও তাকে ফেরাতে পারলাম না। বুঝতে পারলাম, সবই ছিল মিছে! অন্তরাত্মার ডাক শুনতে পেলাম। যা চাইলাম এবারো তার উল্টোটা ঘটল। রুম্পা কোনো কথা না বলেও অব্যক্ত অনেক কথা বলে গেল। যার ভাষা বোঝা সত্যিই কঠিন! এখন রুম্পা শুধুই আমার ফেসবুক বন্ধু। রুম্পার সঙ্গে এখন মাঝেমাঝে ফেসবুক লাইভে থাকা হয়। দুজনেই নীরব ভূমিকার অভিনয় করে যাই। দুজনের মধ্যে এখন যোজন যোজন ফারাক! এত কাছে তবু এত দূর!

:: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj