ফুটবলারদের বিভিন্ন সংস্কার

মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮

খেলাধুলা আর সংস্কার দুটি ভিন্নধর্মী বিষয় হলেও একটি অপরটির সঙ্গে খুব নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। এগুলো যেমন অন্ধ বিশ্বাস, ঠিক তেমনই অযৌক্তিকও। তবে মাঝে মাঝে এসব অযৌক্তিকতাই হয়ে ওঠে দারুণ সব সফলতার কারণ। একজন খেলোয়াড় জেতার জন্য কিংবা নিজের পারফরমেন্সকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করতে প্রস্তুত থাকেন। এ জন্য নিজের দক্ষতার ওপর আস্থা রাখার পাশাপাশি বহু পেশাদার ফুটবলারসহ অনেক খেলোয়াড়ই বিচিত্র সব বাতিক ও কুসংস্কার নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে থাকেন। এর মধ্যে কিছু যেমন থাকে ব্যক্তিগত পুরনো অভ্যাস জাতীয়, কিছু আবার থাকে খুব অদ্ভুতুড়ে এবং বিরল। নিজ নিজ জায়গায় বিশ্বসেরা তারকারাও এর ব্যতিক্রম নন। বিখ্যাত খেলোয়াড়দের তেমনই কিছু অদ্ভুত কুসংস্কারাচ্ছন্ন আজব সব বাতিকসমূহের কথা জানাচ্ছেন : আ ত ম মাসুদুল বারী

মাঠে প্রস্রাব করা

১৯৯০সালের ইতালি বিশ্বকাপে যুগো¯øাভিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে পেনাল্টির আগে বাথরুমে যাওয়ার দরকার হয়েছিল আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক সেরজিও গয়কোচিয়ার। খেলার আগে তিনি প্রচুর পরিমাণে পানি খেয়েছিলেন। কিন্তু পেনাল্টির আগে তার টয়লেটে যাওয়ার সময় ছিল না। ফলে সে সময় তিনি মাঠের মধ্যেই প্র¯্রাব করেছিলেন। সে ম্যাচটিতে আর্জেন্টিনা পেনাল্টিতে জিতে যায়। এরপর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার খেলা পরে ইতালির বিরুদ্ধে এবং সে খেলাও পেনাল্টিতে গড়ায়। তখন গয়কোচিয়া ঠিক সেটাই করলেন, যা তিনি আগের ম্যাচে করেছিলেন। গয়কোচিয়ার এমন সংস্কারে অবশ্য পেনাল্টিতে আবার আর্জেন্টিনাই জিতেছিল। আর এ বিষয়ে গয়কোচিয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি এমনভাবে কাজটা করতেন যে, কেউ তা বুঝতে পারত না।

একই গান শোনা

১৯৯৮ সালে নিজেদের মাঠে ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিতেছিল। ওই দলে ছিলেন লরাঁ ব্লুাঁ, জিনেদিন জিদান, ফ্যাবিয়ান বার্থেজের মতো তারকারা। সে দলের সৌভাগ্যের পেছনেও ভূমিকা ছিল সংস্কারের, এমনই মনে করেন তাদের অনেকে। তাদের সংস্কারের মধ্যে ছিল চেঞ্জিং রুমে দলের খেলোয়াড়রা একটি মাত্র গান যা ১৯৭৮ সালের হিটকরা গ্লোরিয়া গেইনরের ‘আই উইল সারভাইভ’ গানটি বাজাতেন। ২০ বছর পর এটা বাজাতে বাধ্য করেছিলেন ডিফেন্ডার ভিনসেন্ট কানডেলা। পরে গানটি বিশ্বকাপজয়ী ফরাসি দলের প্রতীকী গানে পরিণত হয়। আর শুধু ফ্রেন্স ড্রেসিংরুম নয়, টিম বাসে এবং ট্রেনিংয়ের সময়ও এটা বাজানো হতো।

আগে ডান পা

ব্রাজিলের অনন্য ফুটবল তারকা রোনালদোর সংস্কার ছিল মাঠে ঢোকার সময় প্রথমে ডান পা ফেলা। তারই অনুসরণ করতেন আরেকজন ব্রাজিলিয়ান রবার্টো কার্লোসও। পর্তুগিজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, তিনিও এটা মেনে চলেন।

তিনি বলেন, আমি আরো কিছু রুটিন অনুসরণ করি। বিশেষ করে আগের ম্যাচে যেসব মানায় ভালো ফল হয়েছে, সেগুলো মেনে চলার চেষ্টা করি।

খেলার আগে ব্যাগ গোছানো

২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে ইতালির শিরোপা জয়ের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল ইতালির দুর্দান্ত মিডফিল্ডার গেন্নারো গাত্তুসোর। তিনি ফিফাকে বলেছিলেন, আমার মনে ছিল কুসংস্কারের বাসা।

যেমন, চেক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে খেলার আগে আমি দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যাগ গুছিয়েছিলাম। আর এরপর থেকে প্রতিটি খেলার আগেই আমি এ কাজ করতে শুরু করলাম। কিছুতেই নিজেকে থামাতে পারছিলাম না। এটা চলেছিল টুর্নামেন্ট শেষ হওয়া পর্যন্ত। তিনি আরো বলেছেন, নিজে খেলার সময় যেসব সংস্কার মেনে চলতেন- বিশ্বকাপে সেগুলো করা কঠিন।

প্রতিদিন আমি সেই একই সোয়েটার পরে থাকতাম- যা আমি প্রথম দিন পরেছিলাম। আমি দরদর করে ঘামতাম, কিন্তু ওটা আমি গা থেকে খুলতেও পারতাম না। তাই আমার মেজাজ সব সময় খিঁচড়ে থাকতো।

পাশাপাশি ম্যাচ শুরুর আগে গাত্তুসো রুশ লেখক ফিওদর দস্তয়েভস্কির বই পড়তেন। দস্তয়েভস্কির ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট, দি ব্রাদার্স কারামাজভ এবং দি ইডিয়ট। তিনি মনে করতেন, এটা তার জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে।

মাঠে চিহ্ন দেয়া

২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে শিরোপা জেতা স্পেনের গোলকিপার ইকার ক্যাসিয়াসও নানা রকমের কুসংস্কার মেনে চলেন। তিনি তার জার্সির হাত কেটে বাদ দেন, মোজা উল্টো করে পরেন আর প্রতি খেলার আগে তিনি গোল লাইন পর্যন্ত তার এলাকায় বাঁ পা দিয়ে দাগ টেনে চিহ্নিত করে রাখেন।

তা ছাড়া তার দল যখনই গোল করে, তখন তিনি গোল মুখে ফিরে এসে ছোট একটা লাফ দেন এবং বাঁ হাত দিয়ে গোল পোস্ট স্পর্শ করেন। তার নানা রকমের বাতিক এতই বেশি যে মারকা নামে একটি স্প্যানিশ ওয়েবসাইট একবার মন্তব্য করে, কাসিয়াস হচ্ছেন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি কুসংস্কারাচ্ছন্ন খেলোয়াড়দের অন্যতম।

ব্যান্ডেজ বেঁধে মাঠে নামা

চিলির ফুটবলার হুয়ান কার্লোস পেরাল্টার সংস্কার হচ্ছে ডান পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে রাখা। তার আরেক সতীর্থ ইভান জামোরানোও ব্যান্ডেজ বেঁধে খেলতে নামতেন। তবে তিনি ব্যান্ডেজ বাঁধতেন ডান হাতের কব্জিতে। জামোরানো হাতে চোট পাওয়ার কারণে একদিন ব্যান্ডেজ বেঁধে মাঠে নেমেছিলেন। আর সেদিনই সে দলের হয়ে করেছিল তিনটি গোল। এরপর থেকেই এটা তার স্থায়ী কুসংস্কারে পরিণত হয়। এ ব্যাপারে কার্লোস বলেছিলেন, এটা এ জন্য নয় যে আমি আহত হয়েছি। কিন্তু প্রথম যেদিন আমি পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে খেলতে নেমেছিলাম, সেদিন জিতেছিলাম। তারপর থেকে আমি এটা করে আসছি।

নীল রংয়ের অন্তর্বাস

এটা একটা খুবই সাধারণ সংস্কার। কলম্বিয়ার গোলকিপার ছিলেন রেনে হিগুইতা প্রত্যেক খেলায় নীল রঙের আন্ডারওয়্যার পরতেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, আশির দশকের শেষ দিকে তাদের দল এটলেটিকো নাসিওনাল যাতে মিলোনারিওসের বিরুদ্ধে জিততে পারে, সে জন্য আমরা এক মহিলা গনকের কাছে গিয়েছিলাম। সেই গনক বলেছিলেন, আমাদের ওপর অভিশাপ লেগেছে। তাই একটি বেল্ট এবং সব খেলোয়াড়ের জন্য নীল আন্ডারওয়্যার পাঠালেন তিনি। এরপরই সব ঠিক হয়ে গেল। আর আমরা কাপও জিতেছিলাম।

শটের অপচয়

ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার। অথচ ওয়ার্ম-আপের সময় গোলে শট নিতেন না এ খেলোয়াড়। তার ধারণা ছিল, এতে আসল খেলার সময় তার গোল করার সম্ভাবনা কমে যাবে। একই সংস্কার ছিল মেক্সিকো আর রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি হুগো সানচেজের।

টয়লেট বাঁ দিকে

মারিও গোমেজ ছিলেন দারুণ গোলস্কোরার। তিনি স্টুটগার্ট, বায়ার্ন মিউনিখ, ফিওরেন্টিনা, আর বেসিকটাসের হয়ে খেলেছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগও জিতেছেন। তাকে বলা হয় জার্মান ফুটবলের সুপার মারিও। তার অভ্যাস যে শুধু গোল করার ক্ষেত্রেই তা নয়। ফিফার ওয়েবসাইট অনুযায়ী, খেলোয়াড়দের চেঞ্জিং রুমে তিনি সবসময়ই প্র¯্রাব করার জন্য বাঁ দিকের একেবারে শেষ ইউরিনালটি ব্যবহার করেন।

টেপ প্যাঁচানো মোজা

ইংলিশ ডিফেন্ডার জন টেরি ইংল্যান্ডের হয়ে কোনো ট্রফি জেতেননি। তবে তার ক্লাব চেলসির হয়ে তিনি প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইউরোপা লিগ সবই জিতেছেন। চেলসিতে খেলার সময় একবার টেরি বলেছিলেন, তিনি খুবই কুসংস্কারপ্রবণ।

আমি সব সময়ই টিম বাসে নির্দিষ্ট একটি সিটে বসি। আমার প্রতিটি মোজার চারদিকে তিনটি পাক দিয়ে টেপ লাগাই। আমি স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে একটি নির্দিষ্ট সিডিই বাজিয়ে গান শুনি।

খেলার আগে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে এসে একই জায়গায় আমার গাড়ি পার্ক করি। আরো আছে, টেরিও খেলার দিন চেলসির চেঞ্জিং রুমে একই ইউরিনাল ব্যবহার করতেন। তবে সেটা মারিও গোমেজের মতো বাঁ দিকেরটা নয়, ডান দিকে একেবার শেষ মাথার ইউরিনাল।

সবার শেষে বের হওয়া

ইংলিশ ফুটবল কিংবদন্তি ববি মুর চাইতেন সবার শেষে চেঞ্জিং রুম থেকে বেরুতে। কারণ তিনি তার শর্টস পরতেন সবার শেষে- যাতে ভাঁজ পড়ে না যায়। আরেক ইংলিশ খেলোয়াড় পল ইন্সও ড্রেসিংরুম থেকে বেরুতেন সবার শেষে।

তিনি বেরিয়েই মাঠের দিকে দৌড় দিতেন এবং তার মধ্যেই তিনি গায়ে জার্সিটি পরতেন। আইভরি কোস্টের কোলো তুরেও সবার শেষে মাঠে নামতেন। একবার ২০০৯ সালে আর্সেনালের হয়ে লিগে খেলার সময় তাকে উইলিয়াম গালাসের বদলি হিসেবে নামানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি মাঠে ঢোকেন দুমিনিট পর। তার ফলে দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম দুই মিনিট আর্সেনালকে ৯ জন নিয়ে খেলতে হয়েছিল। তারপর তিনি যখন মাঠে নামলেন তুরেকে সতর্ক করে দেয়া হলো অনুমতি ছাড়া মাঠে ঢোকার জন্য।

গ্যালারি'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj