সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ও রাজনীতিতে সমঅংশীদারত্ব

সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮

সেবিকা দেবনাথ : সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ আরো ২৫ বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে। চলতি বছরের ৮ জুলাই সবার সম্মতিতে জাতীয় সংসদে তা পাস হয়। এ নিয়ে সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদের মধ্যেও রয়েছে মতপার্থক্য। আর বিশিষ্ট নারী নেত্রীসহ স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সময়ে দেয়া প্রতিশ্রæতির সঙ্গেই শুধু সাংঘর্ষিকই নয়, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এই সরকারের দেয়া বিভিন্ন বক্তব্য, গৃহীত নীতি (জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি) এবং জাতিসংঘ ঘোষিত সিডও সনদ ও এসডিজির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। রাজনৈতিক দলগুলোর ইচ্ছানুযায়ী সরকারের এমন সিদ্ধান্ত নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কোনো ভূমিকা রাখছে না।

আর সরকার মনে করছে, সংসদে নারীদের আসন সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখনো হয়নি। পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। এরপরও নারীদের সরাসরি নির্বাচন করতে যেসব সমস্যা আছে, সেগুলো এখনো সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব হয়নি। সে কারণেই এ ব্যবস্থা আরো ২৫ বছর থাকলে ভালো।

আওয়ামী লীগের নারী সংসদ সদস্য এডভোকেট ফজিলাতুননেছা বাপ্পি মনে করেন, নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ বাড়ায়, নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে, রাজনীতিতে সমঅংশীদারত্বও নিশ্চিত হয়েছে।

জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য শিরিন আক্তার মনে করেন, তৃণমূল পর্যায়ের নারীরা যাতে সাধারণ আসনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করতে পারেন, সে জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে আরো উদার হতে হবে।

বিশিষ্ট নারী নেত্রী মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ না করে শুধু সংরক্ষিত আসন বাড়িয়ে নারীর সত্যিকারের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, প্রধান দুই দলের নেতা নারী হলেও রাজনীতি এখনো পুরুষতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর সে কারণেই সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ বারবার বাড়ানো হচ্ছে। অনুগত কিছু নারীকে বা প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক পরিবারের কিছু নারীকে এই কোটা সিস্টেমে আনা হচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে না।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদের মতে, সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা, কোটার সংসদ সদস্য। নির্বাচনের মাধ্যমেই এর প্রতিনিধিত্ব ঠিক করা উচিত। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য সাধারণ আসনে নারীদের আরো বেশি প্রতিদ্ব›িদ্বতার সুযোগ দেয়া উচিত।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও ব্রতীর নির্বাহী পরিচালক শারমীন মুরশিদ মনে করেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য নয় রাজনৈতিক দলের রাজনীতির জন্য নারীদের সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা। সমান প্রতিযোগিতায় না এলে নারীর ক্ষমতায়ন কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।

অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ মনে করেন নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে এ সংরক্ষিত আসন কোনো ভূমিকাই রাখছে না। আর বিষয়টি কোনো গৌরবেরও নয়। সংসদীয় কমিটিতে স্থান পাওয়া ছাড়া আর কোনো কার্যপরিধিতে তারা থাকছে না।

প্রসঙ্গত, ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ১২.২নং অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা হবে এবং সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে বলে প্রতিশ্রæতি ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন এই আসন সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করা হবে; তারা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১তেও ৩২.৭নং অনুচ্ছেদে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংসদে এই আসন সংখ্যা ৩৩ শতাংশ বাড়ানো এবং ওই আসনে সরাসরি নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছিল।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj