স্কুটিতেই যখন ভরসা…

সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮

অন্যপক্ষ প্রতিবেদক : কলেজ পড়–য়া, চাকরিজীবী কিংবা ব্যবসায়ী- নারীদের পছন্দের বাহনের তালিকায় বেশ আগেই জায়গা করে নিয়েছে দুই চাকার বাহন স্কুটি। আজকাল নগরজুড়ে প্রায়ই চোখে পড়ে নারীদের স্কুটি চালিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার দৃশ্য। শখে নয়, প্রয়োজনের তাগিদেই নারীরা বেছে নিচ্ছেন এ বাহন।

যানজট সমস্যা, গণপরিবহনের অপর্যাপ্ততা তো আছেই। তার ওপর দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাসে উঠতে পারলেও সেখানে নেই পর্যাপ্ত সিট। লোকাল বাসে নারীদের বিড়ম্বনায় শিকার হওয়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। গবেষণা বলছে, গণপরিবহনে ৮৪ ভাগ নারী যৌন হেনস্তার শিকার হন। এসব সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ না থাকায় নিজেরাই বেছে নিয়েছেন পথ। আতিকা রোমা, আমবারিন খান, জয়ীতা রায় ও স্বপ্না ইসলাম তেমনই চার নারী।

১৯৯০ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় আতিকা রোমার বাইক চালানো শুরু। তবে মাঝে ছিল বিশাল একটা ব্যবধান। শিক্ষাজীবনের গণ্ডি পেরিয়ে ২০০৪ সালে রোমার কর্মজীবন শুরু। তখন বাস, সিএনজি ছিল ভরসা। তবে তা বেশি দিন ভালো লাগেনি তার। ২০০৯ সালে ব্যাটারিচালিত মোটরসাইকেল দিয়ে শুরু করলেন যাতায়াত। ওই শুরু। রোমা এখন চাকরি ছেড়ে নিজের উদ্যোগে নারীদের জন্য গড়ে তুলেছেন ‘যাব বহুদূর’ নামে একটি স্কুটি ড্রাইভিং প্রতিষ্ঠান। রোমার বিশ্বাস, যাত্রাপথে নারীরা স্বাবলম্বী হলে নারী স্বাধীনতার পথে তারা এগিয়ে যাবে আরো একধাপ।

আমবারিন কাজ করেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে। চার বছর ধরে স্কুটি চালাচ্ছেন। তখনো তার গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন হয়নি। আমবারিন জানান, বাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত রিকশা ও সিএনজি ভাড়া আর যানজটের নিত্য ভোগান্তি তাকে অতিষ্ঠই করে তুলেছিল। তবে তার ভয় লাগত বাসের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিগুলোকে। বেশ কয়েকবার সেই পরিস্থিতিতে পড়তেও হয়েছে তাকে। অনেকটা জেদের বশেই স্কুটি চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। তবে ছোটবেলা থেকেই বাইক চালানোর প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তার। বাবার বাইক চালানোর বিষয়টাই তাকে আরো বেশি আগ্রহী করে তোলে। বাসা থেকে খুব একটা আপত্তি না থাকলেও প্রথম প্রথম তারা বিষয়টি সহজভাবে নেয়নি। তিনি বলেন, স্কুটি ছাড়া একটা দিনও এখন আমি ভাবতে পারি না। স্কুটি আমার জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।

জাতীয় দৈনিক একটি পত্রিকায় ফটো সাংবাদিকতা করেন জয়ীতা রায়। ২০১২ সাল থেকে স্কুটি চালাচ্ছেন। জয়ীতা বলেন, আমার কাজের ধরনটা একেবারেই ভিন্ন। অফিসের নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে যেতে হয়। বাস, সিএনজি, রিকশার জন্য অপেক্ষা করে থাকলে কাজ করা সম্ভব হতো না। কাজের প্রয়োজনেই আমি স্কুটি চালাই। এখন তো স্কুটি ছাড়া চলার কথা ভাবতেই পারি না।

বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা স্বপ্না ইসলাম। অফিসে যাতায়াত এবং দুই সন্তানকে স্কুলে আনা নেয়ার কাজটা তিনি স্কুটিতেই করেন। বলেন, বর্তমানে ঢাকায় নারী বাইক চালকের সংখ্যা ঠিক কত তার সঠিক তথ্য নেই। তবে নারী বাইকারদের নিয়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা বর্তমানে পাঁচ-ছয়শর কাছাকাছি। যাদের বেশির ভাগই চাকরিজীবী কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে বিশেষ করে ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরার মতো এলাকায় মেয়েদের স্কুটি চালাতে বেশি দেখা যায়।

নারীদের বাইক চালানোর ব্যাপারে প্রধান প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে নারী বাইক চালকরা জানান, পরিবারের সম্মতি অর্জন করতে পারাটাই এ ক্ষেত্রে মুখ্য বিষয়। কারণ আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ এখনো কোনো নারীকে দুই চাকার যানের চালকের আসনে ভাবতে অভ্যস্ত নন। এ কারণে পরিবারের সম্মতি অর্জনই বড় কথা। পরিবারের সম্মতিটা প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে বড় সাহসের ব্যাপার হিসেবে কাজ করে। তা ছাড়া রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় অনেকেই কট‚ক্তি করেন, আড়চোখে তাকান। এসব প্রতিবন্ধকতাকে সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারলে স্কুটি হবে নারীর জন্য নিজের বৈশিষ্ট্য প্রকাশের বড় মাধ্যম।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj