অপরাহ্নের ডাক

শনিবার, ১৪ জুলাই ২০১৮

** সোহেল রানা **

সব বন্ধুদের বান্ধবী আছে, রাসেলের নেই। এই কথাটা মনে হলেই নিজেকে খাপছাড়া তলোয়ারের মতো মনে হতো তার। বন্ধুদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে হেসে উড়িয়ে দিত তারা এবং বলত চেষ্টা করলেই যে কোনো অসাধ্যকে সাধন করা যায়, আর এটা তো বান্ধবী। কীভাবে তাদের বোঝাবে রাসেল? যে অসাধ্যকে সাধন করা আর বান্ধবী জোগাড় করা এক কথা নয়।

জানা নাই, শোনা নেই, যে কোনো মেয়েকে গিয়ে বললেই হবে যে তুমি আমার বান্ধবী হবে, আর হয়ে যাবে। কাজটা যদি এতই সহজ হতো তাহলে কোনো ছেলেকে মেয়েদের পেছনে ঘুরঘুর করতে হতো না।

রাসেলের মনের অবস্থা খারাপ দেখে তার জন্য বান্ধবী জোগাড় করার দায়িত্ব নিল বন্ধুরা। একদিন ব্যাটেবলে মিলে যাওয়ায় রাসেলকে ডেকে পাঠালো তারা। বান্ধবী জোগাড় হওয়ার খুশিতে সে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথায় বান্ধবী?’ ইশারা দিয়ে দেখাতেই মেয়েটি তাদের কাণ্ড দেখে হাসতে হাসতে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।

প্রথম দেখাতেই মেয়েটিকে এতটাই পছন্দ হয়েছিল রাসেলের যে দিন নেই রাত নেই যখনই সময় পেত তখনই ওই মেয়ের বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করত সে, কিন্তু মেয়েটি তাকে মোটেও পাত্তা দিত না। এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর মেয়েটির বান্ধবীর মাধ্যমে রাসেলের মোবাইল নম্বর মেয়েটির কাছে পৌঁছানোসহ তার পছন্দের কথাটিও জানানোর ব্যবস্থা করে সে। ওই মেয়ের বান্ধবী রাসেলের পরিচিত হওয়ায় কাজটি সমাধা করতে খুব বেশি সময় লাগে না তার।

একদিন রাতে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে রাসেলের নম্বরে। তাদের মধ্যে কথোপকথনের এক পর্যায়ে দুজন দুজনাকে চিনে ফেলে। মেয়েটি বুঝতে পারে এই ছেলেই সময়-অসময়ে তার পেছনে ঘুরঘুর করে। সে রাখঢাক না রেখে তার নাম জোনাকি এবং দুই বছর আগ থেকেই তার ছেলে-বন্ধু আছে বলে রাসেলকে জানিয়ে দেয়। রাসেল এটা জেনে প্রাথমিকভাবে মনে কষ্ট পেলেও মেয়েটির সঙ্গে বন্ধুর মতো কথা বলার জন্য অনুমতি চায়। মেয়েটি তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাওয়ায় একজন বান্ধবীর সন্ধান পায় রাসেল।

দুজনের সম্পর্ক দিন দিন এতই গভীর হতে থাকে যে, জোনাকি কথায় কথায় রাসেলকে বলতে থাকে, ‘যদি আমার ছেলে-বন্ধু না থাকত তাহলে তোমাকে বিয়ে করে সংসারী হতাম’। রাসেলও এটা চাইত বলে সে মনে মনে খুব আনন্দিত হতো এবং জোনাকিকে ইমপ্রেস করার জন্য তার যে কোনো সমস্যার সমাধানে ঝাঁপিয়ে পড়ত।

এমনকি রাসেল জোনাকির খোঁজখবর রাখার জন্য নিজের ছোট বোনকেও জোনাকির স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল এবং সেই ছোট বোনের সাহায্যে সময়-অসময়ে জোনাকি রাসেলদের বাড়িতে বেড়াতে আসত।

বন্ধুত্বের বছরখানেকের মধ্যে জোনাকির সঙ্গে তার ছেলে-বন্ধুর ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ায় জোনাকির দুঃসময়ে আঠার মতো লেগে থাকল রাসেল। ভেঙে পড়া জোনাকিকে উজ্জীবিত করতে এতটাই মরিয়া উঠল যে একপর্যায়ে জোনাকি রাসেলকে প্রোপজ করে বসল। রাসেল এই অসাধ্যকে সাধন করতে পেরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে জোনাকিকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে এই পৃথিবীর আকাশ-বাতাসকে তার ভালোবাসার কথা জানান দিতেও দ্বিধাবোধ করল না।

দীর্ঘ দুই বছর সম্পর্কের পর রাসেল জানতে পারে জোনাকির লেখাপড়ার খরচ চালানো তার পরিবারের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। কথাটি শুনে পড়াশুনার খরচ চালানোর জন্য সে তার ব্যাংকে গচ্ছিত কষ্টার্জিত টাকাটা জোনাকিকে দিতে চাইল। কিন্তু জোনাকি তা নিতে অপারগতা জানিয়ে যে কোনো একটা চাকরি জোগাড় করার জন্য তাকে অনুরোধ করে বসে।

রাসেল কখনই চাইত না যে তার বান্ধবী চাকরি করুক। তার ইচ্ছে ছিল সে নিজে যে ধরনের চাকরি করুক না কেন, তার এই ইনকামে যেন জীবনসঙ্গিনী খুশি থাকে। তারপরও জোনাকির পীড়াপীড়িতে একজন বড়ভাইয়ের সহযোগিতায় একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বিপণন সহকারীর পদে চাকরির ব্যবস্থা করে দিল সে।

চাকরির প্রথম প্রথম জোনাকি একাকী অফিসে যেতে আসতে পারত না বলে রাসেল তাকে নিজ খরচে রিকশায় করে এগিয়ে দিয়ে আসত আবার নিজের অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে তাকে সঙ্গে করে বাড়িতে দিয়ে আসত। এলাকার মানুষজনের কাছে তাদের সম্পর্কের কথা জানাজানি হয়ে যাবে বলে সে অনেক সময় জোনাকিকে রিকশায় তুলে দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়িতে আসত।

মাসখানেক অতিবাহিত হওয়ার পর জোনাকির ভেতরে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করল রাসেল। এখন ফোন করলে সে আর আগের মতো কথা বলতে চায় না। কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা বললে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। অফিসে আনতে গেলে প্রায়ই একটা ছেলেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাদের খেয়াল করতে দেখে সে। ছেলের বিষয়ে জোনাকির কাছে জানতে চাইলে ছেলেটি তার অফিসের বড়ভাই বলে জানায় এবং এও বলে যে তারা একই ফ্লোরে কাজ করে।

রাসেলের মনে সন্দেহের জন্ম নিলেও সে জোনাকি কিছুই খুলে বলতে পারে না। কিন্তু নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে জোনাকির আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে জোনাকির সম্মুখে মোবাইল ফোনটি আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলে সে। কিন্তু এতেও যেন জোনাকির কোনো যায় আসে না। রাসেল নিজের ভুল বুঝতে পেরে পুনরায় জোনাকির সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করে এবং নিজের ভুল স্বীকার করে। কিন্তু জোনাকি এর প্রতিত্তুরে তার পেছনে কেন কুকুরের মতো ঘুরঘুর করে তা জানতে চায়। রাসেল নিজেকে না সামলাতে পেরে জোনাকির গালে চড় মেরে বসে। কিন্তু পরক্ষণে সে তার ভুল বুঝতে পেরে জোনাকিকে ফেরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।

রাসেলকে বিপর্যস্ত দেখে তার ছোটবোন বাবা-মাকে জোনাকির সঙ্গে সম্পর্কের কথা জানায়। বাবা-মা ছেলের মঙ্গলের জন্য জোনাকিদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়। সেই বিয়েতে জোনাকির বাবা-মা রাজি হলেও জোনাকি সরাসরি না করে বসে। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথাও অকপটে অস্বীকার করতে দ্বিধাবোধ করে না সে।

রাসেলের হৃদয়ে রক্তক্ষরণের পরিমাণটা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। সে কোনোক্রমেই জোনাকিকে ভুলতে পারে না। একদিন হঠাৎ করে এক বড়ভাইয়ের মাধ্যমে জানতে পারে যে, জোনাকি বাড়ির কাউকে না জানিয়ে কয়েক মাস আগে অফিসের সেই ছেলেটিকে বিয়ে করে সংসার করছে। রাসেল অনেক শক্ত হওয়ার চেষ্টা করে এবং একপর্যায়ে সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সক্ষম হয়।

সম্পর্ক ছাড়াছাড়ির বেশ কয়েক বছর পর রাসেলের ফেসবুক আইডিতে একটি ছদ্মনামের মেয়ে নক করে জোনাকির বিষয়ে বিভিন্ন কথা বলতে থাকে।

রাসেল আস্তে আস্তে বুঝতে পারে এই মেয়েটি জোনাকি ছাড়া অন্য কেউ নয়। সে তাকে চাপ সৃষ্টি করলে আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে এসে নিজের পরিচয় উন্মোচন করে। নিজের ভুলের জন্য রাসেলের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে থাকে। রাসেলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে আজ সে নিজ সংসারে প্রতিনিয়ত অশান্তির আগুনে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে বলে জানায়। এক পর্যায়ে সে সব ছেড়ে রাসেলের জীবনে ফিরে আসার জন্য অনুনয়-বিনয় করতে থাকে। রাসেল হাসিমুখে জোনাকিকে শুধু একটা কথাই বলে, ‘অপরাহ্নের ডাকে সাড়া দেয়ার মন মানসিকতা বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার নেই’।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj