শূন্যতা

শনিবার, ১৪ জুলাই ২০১৮

** রুমি নাজমুল **

আলমারির ভেতরে নীরবে ঘুমিয়ে থাকা শাড়িটার আজই ঘুম ভাঙল। অনেক শখ করে কেনা শাড়িটার গায়ে কতদিন গৃহিণীর কোমল হাতের নরম স্পর্শ লাগেনি। হৃদয় কোণে লুকিয়ে থাকা সবটুকু ভালোবাসা হাতের মুঠোয় নিয়ে শাড়িটা বের করে আনে মেঘশ্রী। স্বর্ণলতার মতো দেহে জড়াবে বলে। তুলনামূলক বেশি কুচি দিয়ে শাড়ি পরা মেঘশ্রীর আলাদা নিজস্ব একটা বৈশিষ্ট্য। যদিও কোনো উপলক্ষ ছাড়া সচারচর তার শাড়ি পরা হয় না। নিজের মতো করে আলতো করে শাড়িটা পরে নিল।

ড্রেসিং টেবিলে দণ্ডমান আয়নার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করে মুচকি হাসে মেঘশ্রী। ওয়াশরুম থেকে প্রকাশ পাওয়া চেহারায় মলিনতা বিরাজ করছে। মলিনতা সাময়িকের জন্য মনের ঘরে আঘাত করলেও প্রতিঘাত সৃষ্টি করেনি।

আয়নার সামনে চোখ পড়তেই একে একে হাতে উঠে আসে রূপ-লাবণ্যের রহস্য ঘেরা প্রসাধনীগুলো। ক্ষণিকের জন্য নিজেকে রাঙিয়ে নেয়া। মুখমণ্ডলে হালকা ফেস পাউডার, চোখেতে কাজল, পাপড়িতে কালো মাশকারা, পাপড়ির ওপরে রঙিন আইশ্যাডো, প্রিয়জনের সামনে নিজেকে ভিন্নধারায় হাজির করতে আয়োজনের কমতি নেই মেঘশ্রীর।

চুল বেণী বাঁধার চেয়ে ছেড়ে রাখার মতো আনন্দে তার জুড়ি নেই। তাই সিদ্ধান্ত নিল আজো চুলগুলো ছাড়া থাকবে। চিরুণী দিয়ে ইচ্ছে মতো ফুলিয়ে নিলো চুলগুলো। প্রিয়জনের চাহিদা অনুযায়ী ছোট্ট একটি কালো টিপও কপালে জড়িয়ে দিল। পরিপাটি করে যখন পুনরায় আয়নার নিজেকে আবিষ্কার করল হঠাৎ কিসের যেন অপূর্ণতা লক্ষ করল মেঘশ্রী। দ্বিতীয়বারের মতো সে মুচকি হাসলো। গোপন রহস্যটা ভেদ না করে মুচকি হাসির অন্তরালেই রেখে দিল। বাসায় থাকলে কখনো পারফিউম ব্যবহার করা হয় না কিন্তু আজ তার ব্যত্যয় ঘটল। নিজের প্রিয় পারফিউমের সুগন্ধি দেহের মধ্যে ছড়িয়ে দিল।

হালকা কালোর ওপরে হালকা আকাশি কারুকাজের শাড়িটা মেঘশ্রীর সমস্ত দেহজুড়ে শোভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ঘটা করে ডানে-বামে তাকিয়ে ঠিক করে আর বারবার শাড়িটাকে কোমল হাত দিয়ে কুচির ভাঁজ তোলার চেষ্টা করছে।

ড্রেসিং টেবিলের সামনে কোনো চেয়ার না থাকলেও খানিক দূরে খাটের কার্নিশ। খাটের কার্নিশে বসে দু’পায়ের প্রতিটি আঙুলে রুপার রিং পরেছে; সঙ্গে অতি কারুকাজমণ্ডিত পায়েল। নির্জনতায় পায়েলের শব্দ মেঘশ্রীকে মুগ্ধ করে। তাই প্রায় সে বাসায় পায়েল ব্যবহার করে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাত দুটি লক্ষ্য করে; মুহ‚র্তে ড্র থেকে এক গোছা কাচের চুড়ি বের করে বাম হাতে জড়িয়ে দেয়। অন্য হাতে কোনো এক শুভক্ষণে প্রিয়জনের উপহার দেয়া ব্র্রেসলাইট।

যে মানুষটাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছে তার স্পর্শ পাওয়ার প্রত্যাশায় নিজেকে পরিপাটি করার কোনো কমতি রাখেনি মেঘশ্রী। নিজেকে নিজের মতো উপস্থাপন করে বারান্দার গ্রিল ধরে প্রিয়জনের পথের দিকে তাকিয়ে আছে।

ক্রমশ ক্ষণে ক্ষণে লোকজনের আনাগোনা কমে আসছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বৈদ্যুতিক লাইটগুলোও ক্রমে ক্রমে শ্রী হারাচ্ছে। হঠাৎ সদর দরজায় কারো হাতের আঘাত পড়েছে এমন ভেবেই দরজাটা খুলে দেয় মেঘশ্রী। এক হাতে প্রিয়জনকে জড়িয়ে অন্যহাতে দরজাটা বন্ধ করে সমতালে দুজনে ওই বারান্দার গ্রিলের কাছে গিয়ে দূর আকাশে দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয়।

ভালোবাসার আভায় রঙিন হতে লাগে দূর আকাশ; চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে প্রেমের সুভাস। মেঘশ্রীর পেছন দিকটা গ্রিলের সঙ্গে লাগানো। মেঘশ্রীর দুগালে দুহাত বুলিয়ে আদর করছে আর আলতোভাবে মুখমণ্ডলে চুমু খাচ্ছে। একে অপরকে বুকে জড়িয়ে একজনের দেহটা অন্যজনকে উপহার দেয়ার প্রাণবন্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে।

দক্ষিণের হিমশীলত বাতাসে মেঘশ্রীর দেহখানা মাতাল সমীরণে দোল খেয়ে যায়।

স্বামীর প্রতি ভালোবাসার উন্মাদনা বেড়ে যায়, প্রচণ্ড আবেগ কাজ করে মেঘশ্রীর ভেতরে কিন্তু বাইরের প্রকৃতি যে বড় নির্দয় বড় নির্মম। হঠাৎ বজ্রপাতে চৈতন্য ফিরে আসে মেঘশ্রীর। দূর আকাশজুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা, দক্ষিণের কালো গুচ্ছ গুচ্ছ বেদনাগুলো উত্তরে পাগলা ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্ছে।

চারদিকের মানব সৃষ্টির রঙিন বাতিগুলো কমে গেলেও শখ করে একটি টাওয়ারের ওপরে লাগানো লাল ঘড়িটা জানিয়ে দিচ্ছে রাত দেড়টা বেজে গেছে। ঘড়িটাতে চোখ পড়তে মেঘশ্রীর শরীরে শিহরণ জেগে ওঠে। নিজেকে একা আবিষ্কারের পর মেঘশ্রীর দুফোঁটা চোখের জল জানালার গ্রিলকে ভেদ করে শূন্যে মিশে যায়। রুমের দরজা বন্ধ করে ভালোবাসার হতাশায় বুক বেঁধে মেঘশ্রী একাই বিছানায় দেহখানা হেলে দেয়।

:: কড়িকান্দি বাজার, তিতাস

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj