ব্যাংকের এমডি নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব

শুক্রবার, ১৩ জুলাই ২০১৮

মরিয়ম সেঁজুতি : গত কয়েক বছর ধরে মন্দাবস্থা বিরাজ করছে ব্যাংকিং খাতে। তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। আগ্রাসী বিনিয়োগের কারণে সীমা ছাড়িয়েছে ঋণ-আমানত অনুপাত (এডি রেশিও)। ব্যাংকিং খাতের এসব সংকট উসকে দিয়েছে ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) উচ্চ বেতনভাতা। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে সরকারের মধ্য থেকেও। কেননা, দেশের কার্যরত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের অধিকাংশই নিয়োগ হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। সরকারি ব্যাংকগুলোতে এমন নিয়োগের হার প্রায় শতভাগ। এ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অন্যান্য কর্মকর্তার মধ্যে ক্ষোভ। কারণ এর ফলে অনেক যোগ্য কর্মকর্তার পদোন্নতি হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, শীর্ষ আমলা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করে এসব ব্যক্তি শীর্ষ নির্বাহী পদে নিয়োগটি বাগিয়ে নিচ্ছেন।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকে এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি লাগে। পরিচালনা পর্ষদ কারো নাম অনুমোদন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানোর পর বাংলাদেশ ব্যাংক যদি অনাপত্তিপত্র দেয় তাহলেই তাকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে ব্যাংকটি। কিন্তু দেশের কার্যরত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের অধিকাংশেরই নিয়োগ হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। নিয়োগ দেয়ার পর তাদের দেয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের বেতনভাতা।

বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের মালিকানাধীন ঢাকা ব্যাংকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় সৈয়দ মাহবুবুর রহমানকে- যিনি বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্সের (বিএবি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া বিএনপির আরেক নেতা মোর্শেদ খানের মালিকানাধানী এবি ব্যাংকের নতুন পর্ষদ গঠনের মধ্য দিয়ে চলতি বছরের শুরুতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান মশিউর রহমান চৌধুরী। এক সময়কার বিএনপির সংসদ সদস্য পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান শিল্পপতি এম এ হাসেম পরিবারের হাতে রয়েছে দি সিটি ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) শেয়ার। যদিও বর্তমানে ইউসিবির নিয়ন্ত্রণ নেই এম এ হাসেমের হাতে। ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর স্ত্রী রুকলীমা জামান। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন এ ই আব্দুল মুহাইমেন।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের একটি শিল্প গ্রুপের অধীনে প্রায় ৭টি বেসরকারি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইসলামী ব্যাংক। এক সময় ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ছিল জামায়াত সমর্থিত দলটির নেতাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হাতে। ২০১৭ সালে ইসলামী বাংকের ১২ ভাগেরও বেশি শেয়ার বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে কিনে নেয় গ্রুপটি। ওই সময় ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় আব্দুল হামিদ মিয়াকে। এরপর নিয়োগ দেয়া হয় ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আলমকে। এ ছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ও আল আরাফা ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার রয়েছে ওই শিল্প গ্রুপটির হাতে। এসব ব্যাংকের মালিকানা বদলের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরও পরিবর্তন ঘটে।

বেসরকারি খাতের বেশ কিছু ব্যাংকের মালিকানায় রয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীরা। যাদের মধ্যে অনেকেরই রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। যিনি বেক্সিমকোর প্রতিষ্ঠাতা ও আইএফআইসি ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান। বর্তমানে ব্যাংকটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শাহ এ সারওয়ার। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ডা. এইচ বি এম ইকবালের মালিকানাধীন প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান অভিজ্ঞ ব্যাংকার রিয়াজুল করিম। আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন কাজী আকরাম উদ্দীন আহমদের মালিকানায় রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। ২০১৬ সাল থেকে ব্যাংকটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন মামুন-উর-রশিদ, যিনি এর আগে ব্যাংকটিতে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের অন্তত ১৫টির মতো ব্যাংক রয়েছে যাদের মালিকানায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি সমর্থিত ব্যবসায়ীরা রয়েছেন। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে বেসরকারি ব্যাংকের মালিকানা খুঁজে পাওয়া কঠিন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দেয় অর্থমন্ত্রণালয়। এ ক্ষেত্রে সৎ, যোগ্য ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে মন্ত্রণালয়। অথচ দেখা যায়, রাজনৈতিকভাবেই এসব পদে পরিবর্তন আসে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাধারণত এসব শীর্ষ পদে নিয়োগ বা পুনঃনিয়োগ বিষয়টিতে যোগ্যতার চেয়ে তদবিরই বেশি কাজ করে। তার পাশাপাশি ‘আর্থিক সংশ্লেষ’ও একটি বিশাল ভূমিকা পালন করে। কারণ এই পদটি অত্যন্ত লোভনীয়। এখানে কেউ এক বা দুই বছর থাকলে তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় না। বড় বড় ঋণ দেয়া ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে এখান থেকে কোটি কোটি টাকা কামানো কোনো ব্যাপারই নয়। তবে এই পদে যারা থাকেন তারা যে সবাই অদক্ষ বা অসৎ তা বলা যাবে না। অনেক সময় নানা চাপে তাদের কাজ করতে সমস্যা হয়।

সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কারো নামে কোনো অভিযোগ উঠলে তিনি যে কোনো ধরনের পদোন্নতির জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের এমডি পদে রয়েছেন আলোচিত একটি বড় ঋণখেলাপি মামলার সঙ্গে যুক্ত থাকা এক ব্যাংকার। এমনকি তার আমলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য আরেকটি ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার থাকাকালীন বিএনপির আমলে বঙ্গবন্ধুর ছবি পুড়িয়ে ফেলা ব্যক্তি বর্তমানে ওই একই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে। এ ছাড়া অনিয়মের অভিযোগে ওই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করেছেন অন্য একটি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা। অভিযুক্ত ব্যক্তি এর আগে ওই ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। সে সময় বিপুল অংকের ঋণ দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধাও নিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাব তো রয়েছেই, এ ছাড়া কোটি কোটি টাকা ছাড়া এমডি নিয়োগ হয় না। এসব এমডির পেছনে যারা টাকা ব্যয় করে তারা মূলত কোটি কোটি টাকার ঋণখেলাপি। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের প্রাক্তন এমডি হুমায়ুন কবিরকে এমডি বানাতে হলমার্কের তানভীর প্রায় ৫০-৬০ কোটি টাকা খরচ করেন বলে জনশ্রæতি রয়েছে। এই এমডির আমলেই হলমার্ক দুর্নীতি হয়। তারা বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ বন্ধ না হলে ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি কমানো সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্ভনর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ভোরের কাগজকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত সবগুলো ব্যাংকেই কম-বেশি রাজনৈতিক বিবেচনায় এমডি নিয়োগ হয়। আর বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা অর্থের বিনিময়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অযোগ্য লোক নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এর ফলে ব্যাংক মালিকরা যা বলেন, এমডি তাই করতে বাধ্য থাকেন। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আর্থিক সম্পর্ক যুক্ত থাকার কারণে ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত হওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা মানে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সূত্র জানায়, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে বিশেষ করে এমডি বা শীর্ষ নির্বাহীদের বেতনভাতার পরিমাণ অনেক বেশি। বিশেষ করে সরকারি বা বেসরকারি যে কোনো খাতের চেয়ে ব্যাংকের এমডিদের বেতন বেশি। এর বাইরেও রয়েছে প্রফিট বোনাস। কোনো কোনো ব্যাংক ৮-১০টি করে প্রফিট বোনাস দিচ্ছে। এ বোনাস বাবদেই কোনো কোনো কর্মকর্তা ৬-৭ লাখ টাকা বা আরো বেশি পাচ্ছেন। এ ছাড়া গাড়ি কেনা, বাড়ি কেনাসহ নানা খাতে ২ থেকে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছেন। কোনো কোনো ব্যাংকের এমডির বেতন ১৮ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় ইসলামী ব্যাংক ছাড়া সব ব্যাংকের এমডির বেতনই ৮ লাখ টাকার ওপরে। এর বাইরে রয়েছে অন্য সুযোগ সুবিধা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অনেক ব্যাংকের এমডি উচ্চ বেতনের কারণে চেয়ারম্যানসহ পরিচালকদের অসন্তুষ্ট করতে চান না। এমডিদের মধ্যে সবসময় পরিচালকদের সন্তুষ্ট রাখার মনোভাব কাজ করে। তাদের মধ্যে চাকরি হারানোর ভয় থাকে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক কেলেঙ্কারির পেছনে এটিও একটি কারণ।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj