খেলাতে বিজয়টাই বড় কথা নয়!

শুক্রবার, ১৩ জুলাই ২০১৮

** আন্দালিব রাশদী **

কী আশ্চর্য! বিজয়টা বড় কথা নয়?

ভিন্স লোমবার্দি তো ঠিকই বলেছেন, ‘খেলাতে বিজয়টা যদি বড় কথা না হয়, তাহলে কে ক’টা গোল দিল সে হিসাব রাখে কেন?’

ফুটবল খেলাটা কেমন?

হেউড ব্রাউন বেশ বলেছেন, ‘জেলে যাবে না কিন্তু তোমার আগ্রাসী আচরণ প্রকাশ করবে, তোমার জন্য ফুটবল খেলাটাই ভালো মাধ্যম।’

একজন অজ্ঞাত লেখক ফুটবলের স্পিরিট নিয়ে বলছেন : তোমার মাকে কেউ খুন করলে তোমার মনে যে ক্রোধ ও জিঘাংসার সৃষ্টি হবে, তা দিয়েই তোমার ফুটবলের প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করতে হবে।

আরো একজন অজ্ঞাত লেখকের উদ্ধৃতি : যেহেতু বিশ্বকাপ ফুটবলে মেয়েরা খেলছে না। স্বামীরা ফুটবল নিয়ে মেতে থাকলেও স্ত্রীরা তাতে কিছু মনে করবে না।

আশার কথা শোনাচ্ছেন স্ট্যানলে রুজ : হাইড্রোজেন ও নাপাম বোমা যেখানে পৃথিবীকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেখানে ফুটবল মাঠ হচ্ছে এমন একটি স্থান যেখানে মানসিক সুস্থতা ও আশা এখনো ধর্ষণের শিকার হয়নি।

ফুটবলের জন্য পৃথিবী যখন ভেঙে পড়ে এদোয়ার্দো গালিয়ানোর মতো লেখক দরজায় খিল এঁটে খেলা দেখার জন্য টেলিভিশনের সামনে বসে থাকেন, অ্যালান ওয়েস্টন কবিতায় তুলোধুনো করেন ফুটবল খেলোয়াড় ম্যানেজার, রেফারি আর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে।

ফুটবল খেলোয়াড় আর ম্যানেজার সবার

লজ্জায় গলায় ফাঁস দেওয়া দরকার

তারা আমাদের ফুটবল ঐতিহ্যের বারটা বাজিয়েছে

খেলাতে খেলোয়াড় যখন বিলুপ্ত প্রজাতি প্রায়

তাদের টাকার লোভ আর ধনের বৃদ্ধি

এখন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনেরও উচিত

ফাঁসিতে লটকানো

টাকা ও লোভ বাড়িয়ে তারা

ফুটবলের সর্বনাশ করেছে

সুতরাং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি- এই শেষ।

আমার কঠিন পরিশ্রমের টাকায় আর ফুটবল নয়।

এই নিবন্ধটিতে ফুটবলকে উপলক্ষ করে বিদেশি ও বাংলাভাষার লেখকদের ফুটবল-সাহিত্য চর্চার খানিকটা চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

ফুটবল নিয়ে ওরহান পামুক

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী তুর্কি কথাসাহিত্যিক ওরহান পামুককে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে বলা হলো : আলবেয়র কামু গোলরক্ষক হিসেবে তার আলজেরিয়ার দিনগুলোর কথা মনে করতে গিয়ে বলেছেন, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ যা শিখেছেন সে জন্য তিনি ফুটবলের কাছে ঋণী ।

ওরহান পামুক অপর নোবেল বিজয়ী আলবেয়র কামুকে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘রাখুন আপনার কামুর কথা। এটা হয়তো ১৯৩০-এর দশকের আলজেরিয়ার জন্য সত্য ছিল। আজকের ফুটবল থেকে আর যাই হোক, নৈতিকতা কেউ শেখে না।’

পামুক বলেছেন : শৈশবে ফুটবলভক্ত ছিলাম। সে সময় আমাদের বাড়িতে যা ঘটত তা একালের উন্মত্ততা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। আমার এক চাচা ছিলেন ‘গালাসতামারি ইস্তাম্বুল’ ফুটবল দলের জোরদার সমর্থক অপর চাচা ‘বেকিসতাস’ দলের জন্য পাগল আর আমার বাবা ‘ফেরেনবাচে ইস্তাম্বুল’-এর পক্ষে। বাবা তাকে স্টেডিয়ামে নিয়ে যেতেন। কিন্তু খেলার মাঠে গোল করার মুহূর্তটি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নয়।

‘আমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছে- কিক-অফের আগে ফেরেনবাচের খেলোয়াড়দের ঝড়ের মতো স্টেডিয়ামে প্রবেশ করা। হলুদ জার্সির জন্য তারা ক্যানারি হিসেবে পরিচিত ছিল। ঠিক যেন ক্যানারি পাখির মতোই একটি গর্ত থেকে বেরিয়ে স্টেডিয়ামে ডানা ঝাপটাচ্ছে। দৃশ্যটি আমার প্রিয়। ১৯৫৯ সালের ফেনেরবাচে দলের খেলোয়াড়দের নাম লাইনে দাঁড়ানোর সিরিয়াল অনুযায়ী এখনো কবিতার মতো আবৃত্তি করে যেতে পারি। আমার সমর্থনকে বাবার সমর্থনের সাথে এক করে দেখা যায়। আমরা ভিআইপিদের ঠিক পাশের জায়গাটিতে বসতাম। ব্রেখটের নাটকের পুঁজিপতিদের মতোই আমাদের দেখাত। গোটা ম্যাচ ধরে তারা সবাই সিগার ফুঁকত। সে আমলে সিগার ফুঁকাই ছিল বিত্ত প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। বসফরাস প্রণালী থেকে সারাক্ষণ স্টেডিয়ামের দিকে বাতাস বইত। সিগারের ধোঁয়ায় আমার চোখে পানি এসে যেত। খেলার সময় এসব ধনী মানুষ খেলোয়াড়দের অপমান করত, যেমন করে মালিকরা তাদের শ্রমিকদের অপমান করে। এটা বড্ডো ভয়াবহ ব্যাপার।

হতাশ ভক্ত যেভাবে খেলোয়াড়দের অপমান করে থাকে তাদের বেলায় অপমানের ধরনটা ভিন্ন। তাদের কেউই আমার মতো নায়ক-পূজারি ছিল না। যখন খেলা চলছে এরই মধ্যে তারা নিজেদের মধ্যে ব্যবসায়িক আলাপও চালিয়ে যাচ্ছে- আমার মনে হতো এতে আমার ফুটবল নায়করা অপমান বোধ করতেন।

…তুরস্ক হেরে গেলে এ হারাটা সামলে নিতে আমার সমস্যা হতো। হার আমাদের বড় বেশি হীনবল করে দেয়। চ্যাম্পিয়নস লিগে ইস্তাম্বুল যখন চেলসির বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলছিল, আমি দ্বিতীয়ার্ধে টেলিভিশন বন্ধ করে দিই, কারণ ইস্তাম্বুল তখন পিছিয়ে। আমাদের ছেলেরা যখন বল ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে তা দেখে আমার কষ্ট লাগছে- এরা যেন আমারই সন্তান।

ওরহান পামুক কোনো ক্লাবের হয়ে কখনো খেলেননি। খেলেছেন স্কুল ছুটির আগে পরে ইস্তাম্বুলের রাস্তায়। কিন্তু তিনি কি ভালো খেলতেন?

ওরহান পামুক বলেন : এ প্রশ্নে আমি বেশি বিনয়ী হতে চাই না। খেলায় আমার মেধা ছিল, কিন্তু আমি পেশিবহুল মানুষ ছিলাম না। খেলার চেয়ে খেলা নিয়ে ফ্যান্টাসাইজ করাটাই ছিল আমার কাছে বেশি জরুরি। ছোটবেলার এসব ফ্যান্টাসিই জীবনের ধরনটা ঠিক করে দেয় এবং আমার সব ফ্যান্টাসিতে আমি ছিলাম একজন ফুটবল হিরো। আমার দিবাস্বপ্নের মধ্যে একটি দৃশ্য কল্পনা করতাম। আমাদের দল ফেরেনবাচে ইউরোপিয়ান কাপে খেলছে এবং আমার মতো একটি শিশুকে ৮৯তম মিনিটে মাঠে নামানো হয়েছে, আর জয়সূচক গোলটা আমিই দিয়েছি।

এদোয়ার্দো গালিয়ানোর ফুটবল

উরুগুয়ের কথাসাহিত্যিক এদোয়ার্দো গালিয়ানো (১৯৪০-২০১৫) ফুটবল সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক হিসেবে বিবেচিত। তাঁর বহুলালোচিত ফুটবল গ্রন্থটির নাম ঝড়পপবৎ রহ ঃযব ঝঁহ ধহফ ঝযধফড়.ি

তিনি পরিণত বয়সে মেনে নিতে শিখেছেন যে তিনি একজন ‘ফুটবল ভিক্ষুক’। শৈশবে উরুগুয়ের সব শিশুর মতো তিনিও একজন ফুটবল খেলোয়াড় হতে চেয়েছেন। তিনি দারুণ একজন ফুটবলার ছিলেন- কিন্তু তা কেবল রাতের বেলায় ঘুমের ঘোরে। তার মানে তিনিও ওরহান পামুকের মতোই ফুটবল নিয়ে ফ্যান্টাসাইজ করতেন।

বাস্তবে তিনি ফুটবল মাঠে নামেননি। কোনো দল বা দেশের তেমন সমর্থকও ছিলেন না- সমর্থক ছিলেন কেবল ফুটবল খেলার।

ফুটবল আইকন এবং আইডলদের নিয়ে তিনি লিখছেন :

‘এবং এক উজ্জ্বল দিনে বাতাসের দেবী মানুষের পায়ের পাতায় চুমো খেয়ে যায়- সেই দুর্ব্যবহারের শিকার পা, গালাগাল খাওয়া পা- আর সেখান থেকে জন্ম নেয় ফুটবল আইডল। টিনের ছাদ, খড়ের বেড়া চারদিকে এমনই বসতি থেকে বেরিয়ে ফুটবল আঁকড়ে ধরে তিনি প্রবেশ করেন পৃথিবীতে।’

জার্মান ফুটবলার গের্ড মুলারকে নিয়ে লিখছেন :

‘ফুটবলের মাঠে কেউ একটি বুনো নেকড়ে দেখেনি। ছদ্মবেশ বুড়ির বিষদাঁত এবং নখর লুকোনো। তিনি এগোতে থাকেন। সাধারণ কয়েকটা পাস এবং কোনো রকম করুণার কয়েকটি শট খেলেন। এর মধ্যেই সকলের অগোচরে তিনি পেনাল্টি বক্সের ভেতর। জালটা যেন দুর্দমনীয় এক বালিকা কনের ঘোমটা। খোলা জালের সামনে তিনি তার খাবারটা চেখে দেখলেন। তারপর তিনি নির্বসন। ছোঁ মেরে কামড় বসিয়ে দিলেন।’

এটা বলা প্রাসঙ্গিক হবে যে আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন স্বীকৃত প্রথম খেলাটি হয় ১৮৭২ সালে। ১৮৭৫ সালে গোলপোস্টের ওপর ক্রসবার প্রথম লাগানো হয় আর ১৮৯০ সালে গোলপোস্টে প্রথম জাল ব্যবহার করা হয়।

এদোয়ার্দো গালিয়ানো এই জালকে কিশোরীর মুখ আড়াল করা হিজাব এবং সতীচ্ছেদ হিসেবে দেখেছেন।

শেক্সপিয়রের ফুটবল

‘কমেডি অব এরর্স’ নাটকে উদ্ধৃত : আমাকে লাথি মারতে হলে চামড়ায় মুড়ে নিয়ো :

অস ও ংড় ৎড়ঁহফ রিঃয ধং ুড়ঁ রিঃয সব

ঞযধঃ’ং ষরশব ধ ভড়ড়ঃনধষষ ুড়ঁ ফড় ংঢ়ঁৎহ সব ঃযঁং

ণড়ঁ ংঢ়ঁৎহ সব যবহপব, ধহফ যব রিষষ ংঢ়ঁৎহ সব যরঃযবৎ

ওভ ও ষধংঃ ঃযব ংবৎারপব, ুড়ঁ সঁংঃ পধংব সব রহ ষবধঃযবৎ.

শেক্সপিয়রের আমলেও ফুটবল ছিল, চামড়ায় ঢাকা গোলাকার একটা কিছু। অবশ্য এখনো তাই, তবে নিয়মকানুন ও প্রমিতকরণ ফুটবলকে যান্ত্রিক করে তুলেছে।

একালের কবিতায় ফুটবল

ফ্রান্সিস ডুগান ফুটবল খেলোয়াড়দের স্ত্রীদের বলেছেন, ফুটবল উইডো বা ফুটি উইডো, ফুটবল বিধবা :

এখন ফুটবল মৌসুম

বছরের এটাই সময়

বিয়ার চুমুক দিয়ে পার্কে বসা মানুষ

ফুটবলের কথাই বলে

আর তাকিয়ে থাকে সেপ্টেম্বরের দিকে

যখন ক্লাব বিজয়ী পতাকা উড়াবে

যেদল প্রিমিয়ারশিপ জিতবে

তাদের তো অধিকার থাকবেই

স্বামীরা ফুটবল ক্লাবে

আর তাদের স্ত্রীদের বলে ফুটি উইডো-

ফুটবল বিধবা

কাজের শেষে ইয়ার-দোস্তদের সাথে স্থানীয়

শুঁড়িখানায়

তারা ফুটবলের কথাই বলে

তারা ফুটবলকে আপন করে নেয়

ফুটবলকে তারা আপন করে নেয়

ফুটবলই জীবনের আবেগ

ফুটি-ভক্তরা ক্লাবকে তাদের সন্তান কিংবা

স্ত্রীর চেয়ে কম ভালোবাসে না।

এডউইন আলব্লুাস ম্যারাডোনাকে নিয়ে লিখেছেন:

সব সময়ই আমরাতো জানিই

তার পায়ের পাতা মাটিতে নেই

কিন্তু সে যখন মাটিতে ছিল

কেমন করে যেএকটি অলোকিক ঘটনার

জন্ম হয় তার বিবরণ দেবার শব্দ মেলে না

দিয়েগোর মতো একজনও মেলে না।

ফুটবলার আলবেয়র কামু

ফরাসি কথাসাহিত্যিক, দার্শনিক এবং নোবেল বিজয়ী আলবেয়র কামু কেবল ফুটবল ভক্তই ছিলেন না, আলজেরিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে তিনি নর্থ আফ্রিতাক চ্যাম্পিয়নশিপ কাপে অংশ নিয়েছেন, তার দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

আলবেয়র কামুর একটি বহুল উদ্ধৃত বচন : আমি নিশ্চিত জানি, আমার নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের জন্য আমি ফুটবলের কাছে ঋণী।

ফুটবল আরো যাদের লেখায় উঠে এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন : মেক্সিকোর লেখক হুয়ান ভিলোরো (তার বিখ্যাত বইটির নাম ‘গড ইজ রাউন্ড’- ঈশ্বর গোলাকার), জ্যা পল সার্ত্রে, জুলিয়ান বার্নস, সালমান রুশদী। আর্থার কোনান ডয়েলের লেখাতেও ফুটবল ঠাঁই পেয়েছে। তিনি ফুটবলের গোলকিপারও ছিলেন। বিখ্যাত শিশুতোষ ঔপন্যাসিক রোয়াল্ড ডাল ফুটবল খেলতেন, হেভিওয়েট বক্সার ছিলেন এবং স্কোয়াশ টিমেরও ক্যাপ্টেন ছিলেন। খেলাভক্ত ছিলেন চার্লস ডিকেন্সও।

মার্কিন কবি জ্যাক কেরুয়াক এতটাই ভালো ফুটবল খেলতেন যে ফুটবল বৃত্তি নিয়ে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেছেন। ফুটবল মাঠে মার খেয়েছেন, পায়ের হাড় ভেঙে খেলা থেকে বিদায় নিয়েছেন।

জে কে রাউলিং ইংলিশ লিগে ওয়েস্ট হাম ইউনাইটেডের ভক্ত; জুলিয়ান বার্নস লিস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবের আজীবন সমর্থক।

একালের হারুকি মুরাকামির পছন্দ ফুটবল নয়। তিনি কেবল দৌড়াতে পছন্দ করেন- ম্যারাথন।

তিনি বলেছেন : ১৯৮২-র শরতে সেই যে আমি প্রথম দৌড়াতে শুরু করি তখন থেকেই আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করে আসছি- কেন আমি ফুটবল খেলছি না?

বাংলা সাহিত্যে ফুটবল

এত বড় পণ্ডিত বুদ্ধদেব বসু বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ইডেন গার্ডেনে ফুটবল দেখতে গিয়ে খেলার মাঝখানে শুনলেন রেফারির বাঁশির আওয়াজ। তাঁর আশপাশের কেউ একজন বললেন, অফসাইড।

বুদ্ধদেব বসু চিন্তায় পড়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কোন লোকটাকে অফসাইড বলে রে?

কবি জসীমউদ্দীন পল্লীকবি হলে হবে কি ফুটবলের ড্রিবলিং কি তাও জানেন। জসীমউদ্দীনের ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ নামের কবিতার পুরোটাই উদ্ধৃত হবার দাবি রাখে :

আমাদের মেসে ইমদাদ হক ফুটবল খেলোয়াড়,

হাতে পায়ে মুখে শত আঘাতের ক্ষতে খ্যাতি লেখা তার।

সন্ধ্যাবেলায় দেখিবে তাহারে পটিবাঁধি পায়ে হাতে,

মালিশ মাখিছে প্রতি গিঠে গিঠে কাত হয়ে বিছানাতে।

মেসের চাকর হয় লবেজান সেঁক দিতে ভাঙ্গা হাড়ে,

সারারাত শুধু ছটফট করে কেঁদে কেঁদে ডাক ছাড়ে।

আমরা তো ভাবি ছমাসের তরে পঙ্গু সে হল হায়,

ফুটবল-টিমে বল লয়ে কভু দেখিতে পাব না তায়।

প্রভাত বেলায় খবর লইতে ছুটে যাই তার ঘরে,

বিছানা তাহার শূন্য পড়িয়া ভাঙ্গা খাটিয়ার পরে।

টেবিলের পরে ছোটবড় যত মালিশের শিশিগুলি

উপহাস যেন করিতেছে মোরে ছিপি-পরা দাঁত তুলি,

সন্ধ্যাবেলায় খেলার মাঠেতে চেয়ে দেখি বিস্ময়ে

মোদের মেসের ইমদাদ হক আগে ছোটে বল লয়ে!

বাম পায়ে বল ড্রিবলিং করে ডান পায়ে মারে ঠেলা

ভাঙা কয়খানা হাতেপায়ে বজ্র করি যে খেলা।

চালাও চালাও আরও যাও বাতাসের মত ধাও,

মারো জোরে মারো- গোলের ভেতরে বলেরে ছুড়িয়া দাও।

গোল-গোল-গোল চারিদিক হতে ওঠে কোলাহলকল

জীবনের পণ, মরণের পণ, সব বাঁধা পায়ে দল।

গোল-গোল-গোল মোদের মেসের ইমদাদ হক কাজি,

ভাঙা দুটি পায়ে জয়ের ভাগ্য লুটিয়া আনিল আজি।

দর্শক দল ফিরিয়া চলেছে মহা-কলরব করে,

ইমদাদ হক খোঁড়াতে আসে যে মেসের ঘরে।

মেসের চাকর হয়রান হয় পায়েতে মালিশ মাখি,

বেঘুম রাত্র কেটে যায় তার চিৎকার করি ডাকি

সকালে সকালে দৈনিক খুলি মহা-আনন্দে পড়ে

ইমদাদ হক কাল যা খেলেছে কমই তা নজরে পড়ে।

ফুটবলকে মোটেও উপেক্ষা করেননি কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ একটানা কলিকাতা ফুটবল লীগ বিজয়ী মোহামেডান ক্লাবের উত্থানকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছেন ‘মোবারকবাদ’।

যে চরণ দিয়ে ফুটবল নিয়ে জাগাইলে বিস্ময়,

সেই চরণের শক্তি জাগুক আঁধার ভারতময়।

এমনি চরণ-আঘাতে মোদের বন্ধন ভয়-ডর

লাথি মারি মোরা দূর করি যেন, আল্লাহু-আকবর।

ফুটবল আছে শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’-এর চিত্তহরা এপিসোড শ্র্রীকান্ত ও ইন্দ্রের পরিচয় পর্বে। পরিচয়টা হয় কখন? ফুটবল ম্যাচের পর।

ফুটবল রবীন্দ্রনাথেও আছে। ‘দুই বোন’-এ ‘শশাঙ্ক আসে মোহনবাগান ফুটবল ম্যাচের প্রলোভন নিয়ে, ব্যর্থ হয়।’

বিখ্যাত গায়ক মান্না দে ফুটবল নিয়ে গেয়েছেন: সব খেলার সেরা তুমি বাঙ্গালির ফুটবল।

অঁরি রুশোর আঁকা বিখ্যাত চিত্র ফুটবল খেলোয়াড়।

খেলোয়াড় যদি সাহিত্যিকের মতো করে বলতে পারেন তাহলে খানিকটা সাহিত্যিক তো তাকেও বলা যাবে। যদি হৃদয় নিয়ে কাজ করেন, যদি জীবনকে তুলে ধরেন, যদি দেশ ও মানুষের কথা বলেন- তিনিও গ্রাহ্য হবেন সাহিত্যে। পেলের কিছু কথা উদ্ধৃত হচ্ছে :

* আমি মনে করি না আমি একজন ভালো ব্যবসায়ী, হৃদয় নিয়েই আমি বড্ড বেশি সাড়া দিই।

* পেনাল্টি হচ্ছে গোল দেবার একটি কাপুরুষোচিত পন্থা।

* আমি সারা পৃথিবীজুড়ে ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করি। আমি যেখানেই যাই আমাকে আমার সর্বোচ্চটাই দিতে হবে, ব্রাজিলের মানুষকে হতাশ করা যাবে না- আমি তাই করেছি।

* ব্রাজিল ফুটবল খায়, ফুটবল নিয়ে ঘুমায়, ব্রাজিল ফুটবল পান করে। ব্রাজিল ফুটবল নিয়ে বেঁচে থাকে।

* পৃথিবীতে সবকিছুই খেলা। আসে চলে যায়। মৃত্যুতেই আমাদের সবার সমাপ্তি। আমাদের সবার একই রকম পরিণতি- তাই নয়কি?

দিয়েগো ম্যারাডোনাও কম বলেননি :

* যখন মানুষের সাফল্য আসে, তা কঠোর পরিশ্রমের কারণেই হয়। সাফল্য নিয়ে ভাগ্যের কিছুই করার নেই।

* মেসি গোল করে এবং তা উদযাপন করে আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো গোল করে আর শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনের পোজ দেয়।

* আমি সাদা হতে পারি, কালো হতে পারি- কখনো ধূসর হবো না।

* আমার বৈধ সন্তান ডালমা ও জিয়ানিনা আর বাকি সবাই আমার অর্থ ও ভুলের খেসারত।

* পেলের জাদুঘরে চলে যাওয়া উচিত।

লায়োনেল মেসি বলেছেন, খেলায় হারা কিংবা জেতার চেয়েও জীবনে অনেক বড় কিছু রয়েছে।

জীবন অনেক বড়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj